somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ সত্য তাই এ কাব্য---------------------------নয়

৩০ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গপ্ল নয় জীবন কাহিনী।

দিনমজুর হারেছের পর পর দুইটি মেয়ে হবার পর তৃতীয় মেয়েটি যেদিন হল সেদিন ভোর হবার আগে থেকেই আকাশে সূর্যটা পৃথিবীর বুকে আগুন ছড়াচ্ছিল । যেন পৃথিবীর উপরে সে প্রচন্ড বিরক্ত। আকাশে সূর্য দেখেই সকাল সকাল হারাছের মেজাজ গরম হয়ে আছে। তার উপর এখনও খাওয়া হয় নাই। বউ মাগীটার নাকি আবার ব্যথা উঠছে। মরার আর দিন পাইল না শালী ।

এমন সময় হারেছের মায়ের কন্ঠ শোনা যায়।
--------------এই বউ এক্ষুনি তালাক না দিলে তুই নির্বংশ থাকি যাবি ?! এবারও বেটি হইছে?? এই বউ তোকে কি তাবিজ করলো যে তুই এটাকে ছাড়বারই পারিস না। এবার তালাক না দিলে আমি তোর ওই বউএর হাতে আর ভাত খাব না। তোর দুঃখে আকাশ মাটি সব ফাটি যাবে কয়া দিলাম।

মায়ের চিৎকার শুনে হারেছ আঁতুর ঘরে ঢুকে। মাটিতে পরে থাকা বউটাকে দুটো লাত্থি দিয়ে ঘর থেকে বের হবার সময় ত্যানার উপর পরে থাকা নবজাতক শিশুটির দিকে চোখ পরে। শিশুটির একটা ঠ্যাং ধরে চেংদোলা করে ঝুলিয়ে নিয়ে পাশের বাড়ির গোবরের ভিটায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
খবর শুনে বাসা থেকে বেড় হয়ে আসে মমতাজ।
-------পাপ করবিতো তোর বাড়িতে যায়গা নাই ?? আমার গোবরের ভিটায় কেন?

বাচ্চাটাকে কোলে তুলে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে হারেছকে বলে
-----------------এ পাপ করিসনা। জান দেবার পারিস না জান নেবার বেলা খুব বাহাদুর হইছিস না। দুধের বাচ্চাসহ মাকে বাড়ি থাকি বাইর করি দিলে আল্লায় সবার নয়, মনে থুইস।

হারেছের হইছে এক জ্বালা। বউটার মুখ দেখলে ওকে আর তালাক দিতে পারে না। বড় মায়াকারা মুখ বউটার। আর কেমন একটা ভাব আছে বউটার মুখে তাকালেই বুকটা ধুকধুক করে। একটা শান্তি শান্তি ভাব আসে।

হারেছ দুপুর নাগাদ গোসল করে দড়িতে ঝুলানো শার্টটা গায়ে দিয়ে একটা বিড়ি ধরালো। আজ সারাদিন পেটে কিছু পরে নাই। বাচ্চা দুইটা ছোট্ট আঙ্গিনাটায় বসে একবাটি মুড়ি নিয়ে খুব যত্ন করে খাচ্ছে, মমতাজ ভাবী বাচ্চাগুলাকে আজ তার ওখানে ভাত খেতে বলেছে। অকারনেই হারেছের চোখে পানি আসে। এত সুন্দর ওর এই বাচ্চাগুলা। এদের ও খেতে দিতে পারে না তবে কেন যে এই পৃথিবীতে ওদের আনলো? আজ কিভাবে ও ওর সন্তানকে ওই গোবরের ভিটায় ফেলে দিয়ে আসল? ও কি বাপ? ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এখন ও কিভাবে ওর বউএর কাছে মুখ দেখায়? বাচ্চাটাকে যখন ফেলে দিতে নিয়ে গেল ওর বউ শুধু তাকায় তাকায় দেখল একটা কথাও বলে নাই।

সুস্থ্য হলে বউ বোধ হয় ওকে বলবে-----আমি তোমাকে তালাক দিলাম।
এই কথা শোনার চেয়ে মরাও ভাল। বিড়িতে খুব দ্রুত ফুঁ দিতে দিতে হারেছ বাড়ি থেকে বেড় হয়ে গেল।

সেই যে গেল হারেছ আর নাই। একবছর পার হয়ে গেল। হারেছের বউ জৎস্না আর ভাবে না হারেছ ফিরে আসবে। শ্বাশুরীর জন্য খারাপ লাগে। প্রত্যেক দিন একবার না একবার ছেলের শোকে বিলাপ করবে । বিলাপ শেষে জৎস্নার উদ্দ্যেশে বলে------তুই আমাকে ছাড়ি কোথাও যাইস না বউ। আমাকে খেদায় দিস না বউ। তোর এই মেয়েটার জন্যই তো আমার ছেইলেটা চলি গ্যালো। তুই আমারে ছাড়িস না।

হারেছের বউ রাস্তায় মাটি কাটে, কারখানার কলনীর বাসা বাড়িতে কাজ করে। গভীর রাতে ওর দরজায় টোকা পরে। বেড়ার দরজা একটু জোরে ধাক্কা লাগলেই সর সর করে। একশত টাকা খরচ করে একটা রামদা কেনে। এটাই জৎস্নার একমাত্র বিলাস দ্রব্য।

কলনীর ডাক্তারের বড় বোনের বাচ্চা কাচ্চা নাই, ছোট মেয়েটাকে চায়। বুকের দুধ খাওয়া ছেড়ে দিলেই দিয়ে দেবে। কিন্ত বাচ্চাটা এখন আর মায়ের দুধ চুষতে চায় না। শুকনা দুধ চুষতে চুষতে গাল ব্যথা করে। বড় মানুষের মত হাতে ধরে সব খায়।

বড় মেয়েটার বয়স সাত বছর হলো। আর বাসায় রাখা যায় না। কোন দিন যে কি হয়? কারখানার কলনীর পিছনে এতিম খানায় মেয়ে দুইটাকে ভর্তি করে দিয়ে আসে। ওখানে থাকবে লেখাপড়া শিখবে। যদি মাসের বেতন খাওয়ার খরচ দেয়া যায় তবে মেয়ে দুইটার দিকে ওরা ভদ্রলোকের বাচ্চাদের মত নজর দেবে।

ডাক্তারের বোন আসে ঢাকা থেকে বাচ্চাটাকে দেখতে চায়। শক্ত করে বুক বাঁধে জোৎস্না, দেখাদেখির কি আছে ? একবছর এক মাসতো হোল। এর চেয়ে বড় হলে মায়া বেশি পরবে । তার চেয়ে দিয়ে দেয়া ভালো। কপালে টিপ দিয়ে ডাক্তারের দেয়া জামা পরিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে যায় জোৎস্না ডাক্তারের বাড়ি।

শর্ত থাকে দেখতে চাইলে মাঝে মাঝে ঢাকায় এসে দেখে যাবে। কিন্তু কনোদিন পরিচয় দিতে পারবে না বা কোন দাবি করতে পারবে না। তাই সই, তোবুও তো মেয়েটার একটা গতি হল। ডাক্তার বলছে- বেঁচে থাকলে এই মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে। তাই যেন হয়। কত বড় লোকের মেয়ে হইল আমার গ্যাদি। আমাকে কি মানাবে ডাক্তারের মা হিসাবে।?

জোৎস্না বাতাসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে বাড়িতে আসে। ওর পায়ের ভারে ও যেন হাঁটাই ভুলে গেছে। এই এতটুকু পথ কিন্তু শেষ হচ্ছে না। কানে খালি বাজছে ডাক্তারের বউ বলছে---------- আপু তুমি আজ রাতেই ঢাকা চলে যাও, কোন বিশ্বাস নাই। একটু পরেই এসে আবার মেয়ে নিয়ে যেতে চাইবে। না দিতে চাইলে ঝামেলা করবে।

ওর হাত দুটা বুকে জড়ানো দেখে মনে হয় কি যেন আঁকড়ে ধরে আছে বুকে একটু অসতর্ক হলেই বুক থেকে পরে যাবে। শূন্য বুকে শুধুই যে ধন সে হারিয়ে এল তাই হারাবার ভয়। চোখ খটখটে শুকনো কিন্তু সেই চোখে নেই কোন ভাষা । বাড়ি আসে।
---------------মাইয়া টা কই? শ্বাশুরী জিজ্ঞাস করে। জোৎস্না কোন জবাব না দিয়ে ঘরে ঢোকে।
শ্বাশুরী পিছন পিছন এসে ঘরে ঢোকে -----------------ও বউ কোলের ছইলটা কই? কোথায় থুয়া আসলি। জোৎস্না ঘুরে তাকায় তার শ্বাশুরীর দিকে। চোখে চোখ রেখে বলে -------ইবারে আপনার ছাওয়াল ফিরে আসবে।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। কি করছে বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে কি ঘুমায় পড়ছে। আমার কথা কি মনে পড়তেছে? -- না মনে পড়বে না পেট ভরা থাকলে মার কথা মনে পড়বে না। গোসল করায় নতুন কাপড় পরায় যখন আনল কি সুন্দর লাগতেছিল মেয়েটাকে?! মনেই হয় নাই আমার গ্যাদি এটা। একবার আনন্দে একবার কষ্টে বিছানায় বার বার উঠে বসে জোৎস্না।

যাক বড় মেয়ে দুইটার সারা জীবনের পড়ার খরচও ওরাই দেবে। আমি প্রত্যেক মাসে যেয়ে যেয়ে মেয়ে দুইটাকে খালি দেখে আসবো। ছুটি ছাটায় বাড়িতে আনব। বুক ভরা হাহাকার নিয়ে জেগে বসে থাকে।

এই তো ঘরের দরজার পাশে কে যেন এসে দাঁড়াল। শক্ত হয়ে গেল জোৎস্না। আজ আর নিস্তার নাই। আজ তার কোন পিছুটান নাই। খালি দরজাটা ধাক্কা দিক না ? আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে রাম দা টা হাতে নিয়ে খুব সাবধানে দরজার দড়ির বাঁধনটা খুলে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল জোৎস্না।

--------- পরীর মা এই পরীর মা আমি আসছি দরজাটা খোল। হাত থেকে রামদাটা পরে যায়। টং করে একটা শব্দ হয়। শব্দটা এত জোরে হয় যে জোৎস্না আর কোন ডাক শুনতে পায় না।


সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ৯:৫৪
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×