সবাই মিলে গেলে আমাদের যে সমস্যাটা হয় সেটা হচ্ছে-- শোবার সমস্যা। গ্রামের অন্যান্য চাচাদের বাড়ির লোকজন এসে বলে-- “তোমাদের এত মানুষের জায়গা হবে না আমাদের বাড়িতে চল রাতে থেকে সকালে চলে এসো।“ কিন্তু আমরা কেউ যাই না। সবার মধ্যেই একটা ভাবনা আমি বাড়িতেই থাকবো। অন্য কেউ যাক। তাই কারোরই যাওয়া হয় না। এখানে একসাথে থাকাটাই আনন্দ।
হই চই করে রাতে শুতে শুতে প্রায়ই দুইটা তিনটা বেজে যায়। বিছানায় শুয়ে এই ঘর ও ঘর থেকে এর ওর সাথে টীক্কা টিপ্পনি করতে করতে কখন যে কে ঘুমায় তার কোন ঠিক নাই। শোবার ব্যাপারে আর কি বলব ? যে যেখানে পারছে শুচ্ছে। কেউ বিছানায় তো কেউ মেঝেতে। কেউ আবার ছোটবেলার মত খড় নিয়ে এসে মেঝেতে বিছিয়ে তার উপরে কাঁথা-চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। মেঝেতে শোয় সাধারনত বুবুরা। সব বোন একসাথে শুয়ে গল্প করা যায়। আমি সব সময় খাট পাই হয়ত শহরের মেয়ে বলে অথবা বাচ্চা ছোট ছোট বলে। কিন্তু আমার বাচ্চাগুলি মেঝেতে শুতেই বেশি পছন্দ করে । দেখা যায় আমিই বিছানায় আর বাচ্চারা ওদের ফুপীদের সাথে মেঝেতে। আগেই বলেছি আমাদের গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি নাই।
শেলী আপার স্বামীর নাম জামান তাকে আমরা জামান দুলাভাই বলে ডাকি। আর আমার ভাশুরের নাম ও জামান ওনাকে আমরা দাদা বলে ডাকি। দাদার বউকে ভাবী বলে ডাকা হয়।
যাই হোক এবার আর কি শোবার ব্যাবস্থা করা উচিত। আমার পিচ্চিরা যখন দেখলো আলো নেই হারিকেনের আলোই ভরসা তখন তারা সুবোধ ছেলেমেয়ের মত আমার কাছে এসে --ঘুমাবো ঘুমাবো --বলে ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলো আমিও সুযোগ বুঝে দুই পিচ্চিকে নিয়ে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
বুবুরা বলল --আজ রাতে মেঝেতে বিছানা করি শুধু তোশত দিয়ে আর বাকিরা যেভাবে হয় ব্যাবস্থা হবে।
আমি বাচ্চাদের নিয়ে শুয়ে ঘুম পারাচ্ছি এবং সবার গল্পে আংশগ্রহন করছি। সবাই বাড়ীর ভিতরে উঠানে গোল হয়ে বসে গল্প করছে আর হাসা হাসি করছে। সবাই সবার পিছনে লেগে আছে। কে কবে কি করেছে না করেছে এই সব নিয়েই ভাই বোনদের গল্প খুনটুশি । ভাইবোনদের কারো কারো সাথে বছরে হয়তো এই একবারই দেখা হয়। একে একে ধীরে ধীরে সবাই শুতে চলে যাচ্ছে । যে ঘুমাবার সে ঘুমাবে আর যে আড্ডা মারার সে বিছানা থেকেই চিৎকার করছে।
ভাবী শেলী আপাকে বললেন “জায়গাতো নাই, এই রুমে মামুন আর তোর দাদা শুয়েছে তুই জামানের পাশে শুয়ে পড় যা-- জামান ওই ঘরে আছে।“
আমি বললাম “কে বলল জামান দুলাভাই ওই ঘরে !ঐ ঘরে তো দাদা ।”
ভাবী বলল “আমি তো নিজে দেখে এলাম। হারিকেন নিয়ে নিজের চোখে !! ”
এখানে তো আর কিছু বলা যায় না । যার স্বামী সেই ভাল চিনবে আমি কেন তর্ক করি। এরমাঝে যে একটা ঘটনা আছে তা আর ভাঙ্গালাম না ভাবীর কাছে। আমার শোনা কথা ঠিক নাও হতে পারে। তবে আমার মনে হল আমি যেন শুনলাম ---বড় ভাই বলছে মামুনকে “তুই আর আমি তো মোটা মানুষ, এই খাটে জায়গা হবে না তার চেয়ে আমি ওই ঘরে যাই। আর জামান শুকনা ও তোর সাথে থাক।“
শেলী আপা তো চললেন অন্ধকারে তার বর জামানের কাছে শুতে। বড়ভাবী এলেন আমার পাশে। হঠাৎ শুনি মামুন হো হো করে হাসছে। সঙ্গে জামান ভাই শেলীআপা বড়ভাই সবাই। ব্যাপার কি ভাই বাপার কি? খোঁজ নিয়ে জানলাম ------
শেলী আপা সব সময় জামান দুলাভাইক এর সাথে ধমকের সুরে কথা বলে। সেই সুরে সে বিছানায় যেয়ে দুলাভাইকে বলল “সরো তো! বাপের বাড়ী এসেও তোমার যন্ত্রনা? তুমি জানো যে আমি সামনের দিক ছাড়া শুই না ? সরো সরো ।“
তখন দাদা বলে উঠলেন “তুই নানী দাদী দুইটাই হয়েছিস তারপরও জামানের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলা শিখলি না।“
আর যায় কোথায়? মামুন আর জামান দুলাভাই এই ঘর থেকে উঠলো হেসে। ওই ঘরে দাদা। আর শেলী আপা তার জিহ্বায় একটা কামড় দিয়ে বলে উঠলেন “হায় হায় দাদা তুই এখানে।“
আর কি সারা রাত ঘুম হয়। হা হা হি হি করতে করতে রাত ভোর হয়ে গেল। আজান পরল । সবাই নামাজে গেল। চা চলে এল।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



