বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন প্রথম ক্লাশে ফিরোজ হাসান স্যার এসে বললেন--“ তোমরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। আমি তোমাদের ছাত্রছাত্রী বলব না । ছাত্রছাত্রী বড় জটিল শব্দ। তোমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। অর্থাৎ তোমরা স্বাধীন। স্বাধিনতা মানে কি?? কেউ কি জান। স্বাধীন মানে স্ব-য়ের অধীন। অর্থাৎ তোমাদের দায়িত্ব আর কারও নয় তোমাদের নিজেদের। স্ব-এর অধীন তোমারা?! খুব কঠিন অবস্থা তোমাদের।!? নিজেকে যদি নিজের অধীনে না রাখতে পার --- থাক সে কথা । আমি স্বাধীনতায় বিশ্বসী। স্ব-এর অধীনদের আমার স্বাধীনতা সম্পর্কে বলার কিছুই নেই।“
আমার জন্ম হয়েছে একজন মানব শিশু হিসেবে। আমি মানব। সমস্ত মানবীয় গুনাবলীর স্বত্তাধিকারী আমার হওয়া উচিত। আমার অধিকার কি তা আগে আমাকে জানতে হবে তার পর তা আমাকে পেতে হবে। কেউ কাউকে তার অধিকার দেয় না। অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয় বা অর্জন করতে হয়।
অধিকার থাকা একজিনিস আর তা পাওয়া অন্য জিনিস এবং তা লালন করতে পারা আর এক জিনিস। কোন কিছুতেই আমার অধিকার থাকলেই যে আমি তার সুষ্ঠ্য ব্যাবহার করতে পারব এমন ভাবা ঠিক নয়।
আমাদের উচিত একজন শিশু জন্মগ্রহনের পর তাকে মানুষ করে গড়ে তোলা। তারপর দেখব সে কতটা মানুষ হল, নাকি পুরুষ হলো বা নারী হলো। স্ব-এর অধীন হতে পেরেছি আমারা কয়জন নারী ও পুরুষ?? স্ব-এর অধীন হতে পারলেই তো আমি মানুষ। সেখানে নারী পুরুষের দ্বন্দ্ব থাকে না।
শারিরিক গঠন ও পেশীশক্তি নারীর পুরুষের চেয়ে কম এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে সব নারীই সব পুরুষের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। কোন কোন পুরুষ কোন কোন নারীর চেয়ে কম দৈহিক শক্তির অধিকারি। দৈহিক শক্তি বৃদ্ধি করা যায় চর্চার মাধ্যমে। আমার পড়শি রহিমার মা দেড় মন ওজনের চালের বস্তা একটানে ঘাড়ে তুলে নিতে পারে। আমাদের অনেক পুরুষের পক্ষে যা অসম্ভব। স্ব স্ব ক্ষেত্রে সকলেই দক্ষ। তাদের বিচরন সেখানে অবাধ হওয়াই উচিত।
অধিকার থাকলেই তা প্রয়োগ করতে হবে --এটা চরম বোকামী। আগে দেখতে হবে আমি সেই কাজ পারি কিনা বা যা চাচ্ছি তা ব্যাবহার করতে পারবো কিনা? সব পুরুষ যেমন সব কাজ পারে না সব নারীও সব কাজ পারে না। নারী যা পারে তা পুরুষের পারতেই হবে আবার পুরুষ যা পারে তা নারীকে পারতেই হবে এমন ভাবার কোন কারন নেই। আমাদের সন্তানদের আমরা স্ব-এর অধীন করে আগে বড় করি। নারী পুরুষ দ্বন্দ্ব তবেই ধীরে ধীরে থেমে যাবে।
কিছু কথা হয়ত প্যাঁচাল তবুও বলি---
১। ১৯ তারিখ বসুন্ধারা সিটি মার্কেটের সামনের রাস্তা, রাত ১২টা । জানু একদিকে গেল আমি অন্য দিকে ট্যাক্সি খুঁজতে। একটি ট্যাক্সি দাঁড়ানো। আমি ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। আমি ট্যাক্সিতে উঠে জানুকে ফোন করে বললাম --“ট্যাক্সি পেয়েছি এদিকে চলে আস।“ ট্যাক্সির পাশে দাঁড়ানো একজন মহিলা তার সাথে আরও দুইজন ছেলেমেয়ে ৭/৮ বছরের। এক লোক এসে ঐ মহিলার সাথে রাগারাগী করতে শুরু করে দিল। কারনটা হলো-- খালি ট্যাক্সি দেখেও মহিলা কেন তা ভাড়া করলো না?! মহিলার মিন মিনে উত্তরে বুঝলাম- এর আগের সিএনজি মহিলা ঠিক করেছিল। সেই সিএনজি ২০০টাকা চেয়ে ছিল এবং মহিলা কেন তার স্বামীর অনুমতি ব্যাতিত ঐ সিএনজি তে চড়ে বসেছিল? তার জন্য বকা খেয়েছে এবং সেই সিএনজি বিদায় করে দেবার পর মহিলা আর অপমানিত হবার ভয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করেননি।
তাতে মহিলার কি লাভ হলো??? মহিলা যে শুধু খেতে পারেন আর কোন কাজ পারেন না--- এই বকুনি জনারন্যে শুনতে হলো।
২।আমার পরিচিত একজন ভদ্রলোক খুব মন খারাপ করে একদিন বিভিন্ন কথার প্রেক্ষিতে বললেন আমার মিসেস আমার বাবা মা আমার বাসায় বেড়াতে এলে তাদের সাথে বেশ বিশ্রি ব্যাবহার করে। আমার বাবা মা গ্রামের মানুষ শহুরে চালচলন অনেক কিছুই জানেন না তাই তারা এই ব্যাবহারের স্বীকার হন। বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে তার বাবা মাকে তার মিসেস গেস্টরুমে তালা বন্ধ করে রাখেন। কারন কেউ যেন না দেখে তার শ্বশুর শাশুরী গেঁয়ো ভুত!!!!???
৩।বসুন্ধরা সিটি মার্কেট সাত তলার ইনফিনিটি দোকানের কাউন্টার। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আমার জিনিস নিয়ে বিল দেবার উদ্দেশ্যে। হঠৎ পাশের কাউন্টারের লাইন থেকে একজন ভদ্রলোকের চিৎকার। তিনি তার স্ত্রীর সাথে রাগারাগী করছেন বেশ কুৎসিত ভাষায়। মহিলা মুখ কালো করে একদিকে তাকিয়ে আছেন। মহিলার অপরাধ তাদের একটা জামা ইনফিনিটির একজন সেলসম্যান আমাদের কাউন্টারে জমা দিয়েছেন। কাউন্টার থেকে তাড়াতাড়ি জামাটা তাদের হাতে দেয়া হয়। কিন্তু ভদ্রলোকের বকুনি থামে না। দোষ যদি হয় তবে তা সেলসম্যানের। পাশাপাশি কাউন্টারে জামা যেতেই পারে????
৪। একজন প্রকৌশলীর বাবার স্টমাকে ক্যান্সার ধরা পরেছে। বাবার তিনজন ছেলে। বড় ছেলে প্রকৌশলী। অন্য দুই ছেলে কোন রকমে গ্রাজুয়েট হয়ে স্বল্প বেতনের চাকুরী করে। প্রকৌশলীর নিজস্ব একটি গাড়ি আছে। আরও আছে অফিসের একটি গাড়ি। প্রকৌশলীর স্ত্রীর কাছ থেকে প্রায়ই অভিযোগ পেতাম তার দেবরদের আচরন এবং শ্বশুর শ্বশুরীর মনভাব নিয়ে-যা আমার কাছে হাস্যকর মনে হত। তিনি আমাকে বলতেন --সব দায় দায়ীত্ব কি একা আমার। ক্যান্সারের চিকিৎসার কি মুখের কথা? ওনারতো আরও দুই ছেলে আছে?---
মহিলার মুখে এই ধরনের কথা শুনলে খুব ভয় পেতাম। আমার সন্তানও কি আমার সাথে এই আচরন করবে???
বলা বাহুল্য বাবার সেই ছেলে দুই জন ঢাকার বাইরে থাকে।
একদিন দেখি বাবাকে নিয়ে পিয়ন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে বললাম --কী ব্যাপার আপনাদের গাড়ি কোথায়? খালু কোথায় যাবেন?
পিয়ন বলল --মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে? থেরাপী দিতে। গাড়ি নাই ? আমরা তো সবসময় বাসেই যাই।
আমি পিয়নকে বললাম-- ট্যাক্সী করে নিয়ে যান? বাড়ি থেকেই তো ট্যাক্সীতে উঠতে পাড়তেন।
পিয়ন বলল --মেম সাহেব বাসে করে নিতে বলেছেন। আর আমাকে বাস ভাড়াই দিয়েছেন?
মনটা খিচরে গেল। গাড়ি থেকে নেমে খালুকে গাড়িতে যেতে বললাম।
আমি চার তলায় থাকি। প্রকৌশলী ভদ্রলোক থাকেন তিন তলায়। বাসায় উঠার আগে তিন তলায় উঁকি দিলাম এবং বললাম --গাড়ি না থাকলে আমাকে একটু বলবেন? সম্ভব হলে আমি গাড়ি অবশ্যই দেব।
বাসায় আসার পর প্রকৌশলী ভদ্রলোক ফোন করে বললেন --ভাবী আমার মিসেস খুব মাইন্ড করেছে আপনি গাড়ি দেয়াতে কিন্তু আমি খুব খুশি হয়েছি। এতে যদি ও কিছু শেখে। আমার দুইটা গাড়ি একটা মেয়েকে নিয়ে যায় তাই ঐ গাড়ি আমি আমার আত্মিয়দের কাউকে দিতে পারি না আর একটা গাড়িতে আমার মিসেসের কাজ থাকবেই?? বাবাকে ট্যাক্সী করে নিয়ে যাবার কথা বলাতে আমার মিসেস আমাকে বলেছে “প্রকৌশলীর বাবার চিকিৎসাতো প্রকৌশলী করাচ্ছেই, পিয়নের বাবা বাসেই যাবে তার কি ট্যাক্সি বা গাড়িতে চড়া পোষায়।“ ভাবী আমি গৃহে অশান্তি চাই না। আমি অশান্তিতে থকলেও বাসায় শান্তি থাক এটাই চাই। আমি বেশি কিছু বললে হয়ত আমার বাবা মাকে বাড়ি থেকে বেড় করে দেবে।----
এখানে কে স্ব-এর অধীন। শিক্ষার অভাব কার মাঝে বিরাজমান? অপমানিত কে হলো? বা হচ্ছে??আমার যেন মনে হলো এত অশিক্ষিত লোকের সাথে তাদের বিয়ে হয়েছে তা জন সম্মুখে প্রকাশ হবার লজ্জায় তারা ম্রিয়মান।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

