somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন রাজাকারের সাথে কথোপকথন ।

২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ১০:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার প্রথম কাজ হলো হেঁটে হেঁটে পার্কে গিয়ে যোগ ব্যায়াম করা । প্রায়ই আমার পাশের বাসার জমির সাহেব আমার এই কাজের সঙ্ঙ্গী হন ।আমরা দুজন ব্যায়াম শেষে পার্কের পূর্বদিকের বেঞ্চে বসে কিছুক্ষন গল্প করি । সে গল্প আমাদের ব্যক্তিগত পারিবারিক থেকে শুরু করে সামজিক রাজনীতিক অর্থনীতিকও হয়ে থাকে । বেশ কিছুদিন হলো আমি উনাকে দেখছি না - খবর নিয়া জানলাম উনি উনার গ্রামের বাড়িতে গেছেন । তাই আমি একা একাই সকালবেলা পার্কে যাই,যোগ ব্যায়াম করি - তারপর পার্কের পূর্বদিকের বেঞ্চে একাএকা কিছুক্ষণ বসে বাসায় ফিরে আসি ।

ইদানিং একটা জিনিস লক্ষ্য করছি -আমি পার্কের যে বেঞ্চে বসি সে বেঞ্চের ঠিক উল্টোদিকে আরেকটি বেঞ্চে একটা বৃদ্ধ লোক চাদর মোড়ে বসে থাকে । প্রথম দুই একদিন তেমন খেয়াল করিনি - যখন তাকে নিয়মিত এইরকম বসে থাকতে দেখলাম তখন তার প্রতি এক ধরনের কৌতুহল অনুভব করলাম - সেই কৌতুহলের জের ধরেই আমি গতকাল তার পাশে গিয়ে বসলাম । আমি যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ তার পাশে গিয়ে বসলাম তাতে আমার দিকে তার কোন রকম খেয়াল লক্ষ্য করা গেলো না । সে যেরকমভাবে মাঠির তাকিয়ে ছিল সেরকমভাবেই তাকিয়ে রইল । আমি নিজ থেকেই কথা বলা শুরু করলাম -

- চাচা মিয়া কেমন আছেন আপনি ?
- জি ভালো ।
তার উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিমা দেখে মনে হলো আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সে আগ থেকেই প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল ।
- আমি কি আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি ?
- জি পারেন ।
- বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি আপনি এখানে একা একা বসে থাকেন - আপনার বাসা কোথায়?
- আমার কোন বাসা বাড়ি নাই ।
তার উত্তর শুনে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম - আপনার বাসা বাড়ি নাই মানে? আপনে কি রাতেও এখানে থাকেন ?
- বাড়ি আগে ছিল - এখন নাই । জি আমি বেশ কিছুদিন থেকে রাতে এখানে
এই বেঞ্চে ঘুমাচ্ছি ।
এখন আমি একটু নড়েচড়ে তার আরো কাছে গিয়ে বসলাম ।
- চাচা আপনার বাড়ি এখন নাই কেন?কেউ কি দখল করে নিয়েছে?
- আমার বাড়ি ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে ।আর ভিটে কি করেছে তা জানি না ।
- আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম জ্বালিয়ে দিয়েছে মানে - কারা জ্বালিয়ে দিয়েছে - কেন জ্বালিয়ে দিয়েছে ?
- এলাকার নেতারা - কারন আমি নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলাম ।

এখন আমি কিছুটা নিরব হয়ে গেলাম । এতক্ষণ যে ওর প্রতি এক ধরনের সহমর্মিতা অনুভব করছিলাম সেটা বদলে যেতে লাগলো । কিন্তু ওর পুরো ঘটনাটা জানার কৌতুহলের মাত্রাটা আরো বেড়ে গেলো ।
- দেখছেন পাপ বাপকেও ছাড়ে না,একদিন আপনি মানুষের ঘর বাড়ি জ্বালাতে সাহায্য করছেন,এখন দেখলেন আপনার বাড়িও আগুনে পুড়ল ।
- আমি কারো ঘরবাড়ি জ্বালতে সাহায্য করিনি ।
- মানে ! আপনি কি বলতে চান? রাজাকাররতো ৭১এ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে । মানুষদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে পাকিস্হানীদের হাতে তুলে দিয়েছে,মা বোনদের ধর্ষন করে পাকিস্হানীদের হাতে তুলে দিয়েছে । আপনি যেহেতু রাজাকার ছিলেন তাহলে আপনিও এসব করেছেন ।
- না আমি এসবের কিছুই করিনি ।
- তাহলে ১৯৭১এ আপনি এমন কিছু করেছিলেন যার কারনে মুক্তিযুদ্ধাদের ক্ষতি আর পাকিস্হানিদের সাহায্য হয়েছিল ।যার কারনে আজ আপনাকে ওরা রাজাকার বলে এলাকা থেকে বিতাড়িত করেছে ।
- না আমি এমন কিছু করিনি যার কারনে মুক্তিযুদ্ধাদের ক্ষতি আর পাকিস্হানিদের সাহায্য হয়েছিল ।
- তাহলে ১৯৭১এ আপনি কি করেছিলেন, আপনার কি ভুমিকা ছিল ? আপনি কার পক্ষে ছিলেন ?
- ১৯৭১এ আমি আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলাম । যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর থানা থেকে খবর এলো জরুরি মিটিং আমাকে যেতে হবে । আমি যথারীতি মিটিংয়ে গেলাম । গিয়ে দেখি এলাকার বেশ গন্যমান্য ব্যাক্তি আর কিছু পাকিস্হানী আর্মি অফিসার । আমাকে প্রস্তাব দেয়া হলো পশ্চিম পাকিস্হানের পক্ষে কাজ করতে । কাজ না করলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি থেকে শুরু করে এলাকার বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির হুমকি দেয়া হলো ।আমি ওদের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে,উল্টো ওদেরকে একটা শর্ত দিলাম । এই বলে উনি কিছুক্ষণ থামলেন ।

- আমি আরো উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম - তারপর কি হলো,আপনি বলে যান - আপনি কি শর্ত ওদের দিয়েছিলেন?
- আমি শর্ত দিয়েছিলাম,আমি পশ্চিম পাকিস্হানের পতাকা আমার বাড়িতে উড়িয়ে পশ্চিম পাকিস্হানের পক্ষে মৌন সমর্থন জানাবো, তার বিনিময়ে আমার ইউনিয়নের সীমানার ভিতরে পাকিস্হানি সৈন্য ঢুকতে পারবে না । আমার ইউনিয়নের কোন মানুষের কোন রকম ক্ষয়ক্ষতি করতে পারবে না । ওরা শর্তে রাজি হয়ে আমাকে বলল -ঠিক আছে আমরা আপনার এলাকায় ঢুকব না,তবে আপনার এলাকা থেকে কেউ মুক্তিযুদ্ধে না যেতে পারে সেদিকে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে ।আমি সেদিকে খেয়াল রাখব বলে মিটিং থেকে আমি চলে এলাম ।
- আপনি কি খেয়াল রেখেছিলেন?
- জ্বি রেখেছিলাম ।আমি মিটিং থেকে এসে এলাকার মুরব্বীদের সাথে আলাপ করেছিলাম,তাদেরকে বলেছিলাম তারাও যেন এলাকা থেকে কেউ মুক্তিযুদ্ধে না যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখে ।
- মুরব্বীরা কি আপনাকে সমর্থন দিয়েছিল ?
- জি দিয়েছিল । সবাই বলেছিল আমি ঠিক কাজ করেছি ।
- আপনার এলাকা থেকে কেউ কি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল?
- আমার জানা মতে আমার এলাকা থেকে কেউ কি মুক্তিযুদ্ধে যায়নি ।
- আপনি কেন এইরকম করতে গেলেন ? আপনি কি পশ্চিম পাকিস্হানের পতাকা আপনার বাড়িতে উড়িয়েছিলেন? আর ওরা কি আপনার শর্তমত কাজ করেছিল ?
- আমার তখন আর কোন উপায় ছিল না, তা না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলতো, আমার এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতো । তাছাড়া তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল এলাকার চেয়ারম্যান হিসাবে এলাকার নিরাপত্তা,আমার এলাকার মানুষের নিরাপত্তা দেওয়াটা আমার বড় দায়িত্ব । আর হ্যাঁ আমি পশ্চিম পাকিস্হানের পতাকা আমার বাড়িতে টাঙিয়েছিলাম । ওরাও শর্তমত কাজ করেছিল - আমার ইউনিয়নের সীমানায় ঢুকেনি কিংবা আমার এলাকার বা এলাকার মানুষের কোন ক্ষয়ক্ষতি করেনি ।
- তখন এলাকার সাধারন মানুষ আপনার এই উদ্যোগকে কিভাবে নিয়েছিল?
- সবাই বাহবা দিয়েছিল, আমার নামে মিছিল করেছিল ।

- তখন যদি সবাই বাহবা দিয়ে থাকে,তাহলে এখন কেন আপনাকে রাজাকার বলে বিতাড়িত করলো ?
- কারন যখন শুনলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে ,আমি তখন ঠিক করলাম - সেদিন সে মিটিংয়ে কে বা কারা ছিল তা আমি সবার সামনে ফাঁস করে দিবো । তা নিয়ে এলাকার কিছু মানুষের সাথে আলাপ আলোচনাও করলাম ।আমি যাদের সাথে আলাপ করেছিলাম তাদের মাধ্যমেই আমার পরিকল্পনার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো ।
- আপনি এই ধরনের পরিকল্পনা করতে গেলেন কেন? আপনিও তো ঐ মিটিংয়ে ছিলেন । ওদের শাস্তি হলে আপনারও হবে । আমাকে কি একটু বলবেন ঐ দিন ঐ মিটিংয়ে কে বা কারা ছিল?
- আমি এটা কেন করলাম আমি জানিনা কিনবা আমার শাস্তির হওয়ার ব্যাপারেও আমার কোন অসম্মতি নেই - শুধু মনে হয়েছে ওদের আসল চেহারা সবার সামনে তুলে ধরা দরকার । আর ওরা কারা ? ওরা অনেকে এখন আমাদের রাষ্টীয় অভিবাবক, সমাজের হর্তাকর্তা,অনেকে দেশের সংবিধানের সংরক্ষনের দায়ত্ব পালন করে ।
- তাহলে আপনি এখন পুলিশের কাছে যান - গিয়ে ওদের কাছে আপনার সব কথা খুলে বলুন ।
- পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশ আমার কথা শুনে আমাকে নিয়ে উপহাস করেছে, উল্টো বলেছে যদি বেঁচে থাকতে চাই তাহলে জীবনেও যেনো আমি ওদের নাম মুখে না আনি,ওদের নামে কোন অভিযোগ নিয়া থানায় না যাই । এর কিছুদিন পর আমার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হলো সাথেসাথে নির্দিষ্ট সময়ে বেঁধে দেয়া হলো আমার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নোটিশ ।
- এই যে আপনাকে ওরা এলাকা ছাড়া করলো আপনাকে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি ।
- না আসেনি ।

ইচ্ছে ছিল আমি তার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলি,জানি তার পরিবার ছেলে মেয়েদের কথা,আত্নীয়স্বজনদের কথা,অন্যান্য সম্পত্তির বিষয়াদির ব্যাপারে, কিন্তু আমি আর তার সাথে কোন কথা না বাড়িয়ে বাসায় চলে এলাম । চলে আসার সময় পিছন ফিরে একবার সেই চাদরে মোড়া বৃদ্ধের দিকে তাকিয়েছিলাম ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ২:৪৩
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×