প্রথম পর্বটি এখানে
২.
একটু পিছনে গেলে কেমন হয়? আমার বর্নিল অথবা সাদাকালো জীবনটা কিছুটা ঘাটালে নিশ্চই আপনাদের আমার সম্পর্কে একটি ধারনা জন্মাবে। চিন্তা ধারনার বিকাশ মানবজাতির একবিশেষ অর্জন।
সেই বিকাশই আমার নাম হয়ে গেল যখন আমি এই পৃথিবীতে এলাম। কারন বিকাশ নাকি প্রগতির অন্য নাম। মানুষ তার জন্মের ৪ বছর পর্যন্ত কিছুই মনে রাখতে পারে না। না আমিও মনে করতে পারি না। তবে ৪ বছরের পরে ঘটনাটা বলতেই হবে।
কালোবর্নের একজন মানুষ হওয়ার সুবাদে আমার প্রিয় রং কাল।“রঙ কালো তো মন ভাল” বাংলা প্রবাদের মত নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যয় ছিল। আর যদি তা না করি তবে তো নিজের সত্তাকেই অপমান করা হয়। তবে সমস্যা তৈরী হয় যখন আমার জেনেটিক কোড গুলো কাল থেকে লাল রং এর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পরে। (তাই লাল দেখলেই আমার উচ্চব্যাচ্চ শুরু হয়ে যেত)। সে যাই হোক পৃথিবীর উজ্জল সবুজ রংও আমাকে যথেষ্ট আকর্ষন করত। অতি শীঘ্রই আমার প্রিয় রং হয়ে গেল সবুজ। এটা অবশ্য ক্লাশ ফোরে পড়ি যখন আমার প্রিয় রং টা পরিবর্তন হয়েছে।
আমি খুব ভাল ছাএ ছিলাম। ভাবুক শ্রেনীর এক ছাএ যে, প্রচুর পরিমানে বই পড়ত। আমি প্রবন্ধই বেশি ভালবাসতাম। ভাবুক বিকাশ একসময় খুব বেশিই ভাবুক হয়ে উঠল। আর তখন বসে অপেক্ষায় থাকতাম স্কুলে যাওয়ার জন্য। সারাদিন বাসায় বই পড়তাম আর স্কুলের ক্লাশরুমে তা নিয়ে চিন্তা করতাম। তাই স্কুল আমার একটি প্রিয় জায়গা হয়ে গেল। আমার প্রিয় হলে কি হবে? আমার শিক্ষকদের কাছে বিষয়টা ভাল লাগত না। একটি ছাএ ক্লাশের সারাক্ষন বাইরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকবে তাতো হতে পারে না।
শিক্ষকরা সবাই মিলে বাবা আর মাকে খবর দিয়ে বলল যে আমার চিকিৎসা প্রয়োজন। ক্লাসে সেরা ছেলেটি আজ ধ্বংশের মুখে তাতো যে কোন সচেতন শিক্ষকেরই মাথাব্যাথ্যার কারন হবে। সত্য বলতে বাবা আর মা এইধরনে কিছুই করে নি। তবে তারা আমার ব্যাপারে যথেষ্ট সর্তক। তাই তারা দেখতে চাচ্ছিলেন আমি আসলে কি করি?
ভাবুক এই ছাএকে শিক্ষকরা কিন্তু বেধরক পেটাতো। আমি তবুও ভাবতাম। একদিন ক্লাশে ঢুকেই আমি আমার ভাবনায় ডুবে গেলাম। হঠ্যাৎ সেই ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে আমার পেছনের ছাএ বন্ধুটি বলল “আজ তো ফাইনাল পরিক্ষা, কিরে কিছু লিখবি না খাতায়। নাকি বসে বসেই চিন্তা করে সময় পার দিবি।” তার কথায় আমার সম্বি ফিরে পেলাম তবে জবাব হিসেবে বললাম “কেন আমাকে খাতায় লিখতে হবে? না লিখলে কি হবে। আমি না লিখলে তো চন্দ্র আর পৃথিবী ঘুনর্ণ বন্ধ করে দেবে না। অথবা পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোন শিলার স্থানচ্যুত হবে না। অথবা নাসা থেকে আমার নামে চিঠি আসবে না।”
সে আর কিছু বলেনি, একেবারে চুপ হয়ে গেল। তবে ক্লাশ থেকে বের হয়ে সে আমাকে জিগ্সেস করল
-তুই কি এত ভাবিস বিকাশ?
-(আমার জবাব) আমি আজ যে টপিক নিয়ে ভাবছি তা হল বিভিন্ন কারনে বিজ্ঞান রাজনৈতিক আর সামাজিক কারনে পরিবর্তন করা হয়েছে তবে আইনস্টাইন কেন তার E=mc2 সূএের প্রমান হাতে নাতে পেলেও তা একটু পরিবর্তন করে সমাজ আর রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন কি আনতে পারতেন না।
-(একটু হাসি দিয়ে) দোস্তরে আইনস্টাইন একজন রোগাক্রান্ত মানুষ তা ছাড়া বিজ্ঞান তো দ্রুব সত্য তা কেন পরিবর্তন হবে? সবচেয়ে বড় কথা হল এর রকম চিন্তা ভাবনা আর তোর হলে কথা গুলো জবাব হো একরকম ,কেন আমাকে এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে হবে? চিন্তা করলে কি হবে? চিন্তা না করলে তো চন্দ্র আর পৃথিবী ঘুনর্ণ বন্ধ করে দেবে না। অথবা পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোন শিলার স্থানচ্যুত হবে না। তাহলে এরকম চিন্তা করে কি লাভ?
আকট্য যুক্তি। সবাই যখন লাভ নিয়ে ব্যস্ত তবে আমি কেন অন্য চিন্তা করব? চিন্তার পরাধীনতার জন্যই কি তাহলে সমাজের সৃষ্টি?
আমি ফিরে এলাম ভাল ছাএ রুপে। বাবা খুশি, মা খুশি আর খুশি স্কুলের শিক্ষকরা। কারন আমি সমাজে তথাকথিত ভাল ছাএ হিসেবে ফিরে এসেছি।
রাস্তাটি অনেক বড় আর মৃত্যুর জন্যও বেশ ভাল হবে। মানুষ সামজিক জীব তাই মৃত্যুকে ভয় পায়। কিন্তু আমি আর সামাজিক নই। দীর্ঘ দশ বছর ধরে আমি সমাজের বাইরে থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নিজে একা একা একজন বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। দেখতে চাই ডারউইন সাহেবের দেওয়া মিউটেশন তত্বটি কতটুকু সত্য? তবে একটা মজার কথা হল আমার পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে আমি মুছে দিতে পারিনি। যেমন জঙ্গলে থাকার সময়েও আমি ঠিকই আগুন ধরাতে পেরিছি, নতুন কিছু শিখতে হয়নি। আমার জেনেটিক কোড অনেক আগেই সেই তথ্য ধরে রেখেছে। তাই আমার কিছুই আবিষ্কার করতে হয়নি। তারই জীবনের এই পর্যায়ে আমার মনে হচ্ছে আমার পক্ষে আর নতুন কোন আবেগ বা কোন বিশেষ কিছু সৃষ্টি সম্বব নয়। কারন সামাজিকতা ছাড়ার আসলেই মানুষ অনেক অসহায়। বড় নাম্বারের বাসটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। এই বাসটি বড় বড় চাকাটি আমার মাথাটি থেতলে দিতে পারবে বেশ ভালভাবেই। এটি আমার কোন সিদ্ধান্ত নয় এটিই আমার ভবিষ্যত। যদি আপনার কোন বিষয়ে কোন চয়েজ না থাকে তবে যা ঘটে তাই হল আসল সত্য কারন এখানে কেউ বা কোন প্রভাবক থাকে না। আর যেহেতু আমি অসামাজিক জীবনটিকে রপ্ত করতে চাই তবে আমার মৃত্যই এর শেষ সমাধান। বাসটি ঠিক আমার মাথায়টিকে থেতলে দিল। আমি আবার মারা গেলাম।
(এই উপন্যাসটির একটি সুন্দর ইংরেজি নাম দিয়েছি: Journey to the Death By Life । এটি দ্বিতীয় অংশ। আর প্রকাশ করতে আপনাদের সাহায্য চাই।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

