গত ২৩ জুনের ‘প্রথম আলো’র ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় বাংলাদেশের সমস্যাকবলিত শিক্ষাব্যবস্থার উপর মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়েছে। সাক্ষাৎকারে জাফর ইকবাল স্যার সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে দারুণ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কারণ এখানে মুখস্ত করার সুযোগ কম। আমরাও সৃজনশীল পদ্ধতির উপর চরম আশাবাদী ছিলাম। কেননা সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পেছনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল- শিক্ষার্থীরা যেন মুখস্ত না করে। শুধুমাত্র তার নিজের ভেতরের সৃজনশীলতা দিয়ে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখবে। অথচ, সফল হয়নি গবেষকদের প্রচেষ্টা। আশাহত হলাম সৃজনশীল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম বছরের এস.এস.সি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রতিটি বিষয়ের সৃজনশীল প্রশ্নগুলিই বাজারের প্রচলিত গাইড বই থেকে হুবহু কমন পড়েছে। তাহলে কেন এই সৃজনশীল পদ্ধতি? জাফর ইকবাল স্যার বাজারের গাইড বই না কিনতে অভিভাবকদের আহবান জানিয়েছেন। স্যার হয়তো ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের নামী-দামী কিছু স্কুল-কলেজ সম্পর্কে অবগত আছেন। আপনার ধারণা আর বাস্তবের মধ্যে কতটা অমিল-এটা বুঝতে হলে আপনাকে প্রথমেই মফস্বলের চালচিত্র সম্পর্কে অবগত হতে হবে।
বস্তুত এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণশীল হলেও মফস্বলে শিক্ষার গুণগত মান ক্রমাগত এতটাই অবনতির দিকে যাচ্ছে যে, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ এটা অনুধাবন করতে পারবেন না।
দেশের গ্রামাঞ্চলে বিস্তর সংখ্যক বেসরকারি স্কুল-কলেজ আছে। অথচ, নেই সেখানে উপযুক্ত শিক্ষক। মফস্বলে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ দুটিতেই রয়েছে যোগ্যতার অভাব। শিক্ষাজীবনে দু’চার বার অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীরাই এলাকার মাতব্বর প্রধানদের কাছে ধর্ণা দিয়ে ও মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করতে নেমেছেন। তাছাড়া উচ্চতর প্রশিক্ষণের অভাব তো আছেই।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে প্রবেশ করতে পারছে না মফস্বলের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ঢাকার শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৪ পেয়েও মেডিকেল-বুয়েটসহ দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছে। মূলত ঢাকার শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে চৌকষ শিক্ষকদের সান্নিধ্য। সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল পদ্ধতির ইতিবাচক দিক থাকলেও মফস্বলের প্রশিক্ষণবিহীন ও অযোগ্য শিক্ষকরা কিভাবে তাদের ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করবেন? গাইড বইয়ের বদৌলতে তারা কাসে গিয়ে অন্তত ২০/৩০ মিনিট সময় ছাত্রদের সামনে বসে থাকতে পারেন। গাইড বই বন্ধ হলে এই সমস্ত শিক্ষকরা কী শিক্ষা দান করবেন-তা কিন্তু নীতি নির্ধারকরা ভেবে দেখেন নি। আমি মফস্বলের যে স্কুলে লেখাপড়া করেছি, সেখানকার শিক্ষকরা ‘মসলিন কাপড়’কে সবসময় বলেছেন ‘মুসলিম কাপড়’ এবং ‘গ্রীষ্ম ঋতু’র উচ্চারণ করেছেন ‘গ্রীষমো ঋতু’। এমন আজব আজব মানুষ শিক্ষকতা করেন মফস্বলে, ফলে উপায়হীন হয়েই ছাত্রছাত্রীরা এমন কি অভিভাবকরাও গাইড বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যা কখনও কাম্য নয়। এই পদ্ধতি চালুর পূর্বে নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেই এই পদ্ধতি চালু করেছেন-এটা অবশ্যই ইতিবাচক ও প্রশংসার দাবীদার; কিন্তু তাদের কি উচিৎ ছিল না পদ্ধতিটি চালুর পূর্বে নিজেদের দেশের মফস্বলের শিক্ষার হালচাল সম্পর্কে অবগত হওয়া? আমি অবশ্যই সৃজনশীল পদ্ধতির পক্ষে। তবে আমার মত অনেক সাধারণের অনুরোধ- আপনারা পদ্ধতি চালু করার পূর্বে গাইড বই বন্ধ করুণ ও অযোগ্য-অদক্ষ শিক্ষকের পরিবর্তে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগদানের ব্যবস্থা করলে সৃজনশীল পদ্ধতি অনেক ফলপ্রসূ তবে, নতুবা উল্টো এক কুয়াশাচ্ছন্ন পথ ধরে চলতে থাকবে আমাদের শিক্ষালাভ, মেরুদণ্ড সুগঠনের প্রক্রিয়া।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


