১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হবার পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের হুমকি অব্যাহত রয়েছে। কারণ ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং বিশ্বে ইসলামী নব জাগরণের সূচনা হয়। মুসলমানরা নতুন করে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি পদে পদে বাধার শিকার হতে থাকে। মুসলমানদের মাঝে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস দেখে হোয়াইট হাউজ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই তারা ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য উঠেপড়ে লাগে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকিসহ সব ধরনের তৎপরতা শুরু করে। এক পর্যায়ে অন্যান্য ইস্যুর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিকেও অজুহাত হিসেবে দাড় করানো হয়। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরীর চেষ্টা করছে বলে জোর প্রচারণা চালাতে শুরু করে এবং এখনও পরমাণু ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরানের উপর চাপ প্রয়োগের সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে ইরানের উপর এ পর্যন্ত কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পাশাপাশি সামরিক হুমকিও অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের নানা প্রান্তের বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা, যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের সম্ভাব্য আগ্রাসনের মোকাবেলায় ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি সম্পর্কে নানা ধরনের বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ইহুদিবাদীদের ব্যাপক প্রভাব থাকায় এক্ষেত্রে সঠিক বিশ্লেষণ করা হয় না। তারা ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তিকে বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি এ ব্যাপারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারও চেষ্টা করে। সম্প্রতি ইরান সফলভাবে ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর পাশ্চাত্যের বেশির ভাগ গণমাধ্যম ও কর্মকর্তা, এ ব্যাপারে ইরানের সাফল্যের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। ইরানের প্রদর্শিত শক্তি কৃত্রিম ও লোক দেখানো বলেও তারা প্রচার চালাবার চেষ্টা করেছে। ইসলামী ইরান যে জন্মাবধি শান্তিকামী,তা তারা সব সময় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। ইরানের সামরিক শক্তি হুমকিপূর্ণ বলে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যম ও সরকারগুলোর ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন যে কোন সচেতন ব্যক্তিই এটা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, ইরান সব সময় শান্তির পথ অবলম্বন করেছে। ইরান বারবারই বলেছে, আক্রান্ত না হলে কারও বিরুদ্ধে সমর শক্তি ব্যবহার করবে না। এছাড়াও ইরানের সামরিক বাজেট বিশ্বের বহু দেশ বিশেষ করে দক্ষিণ পারস্য উপসাগরীয় এলাকার দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
ইসরাইলের বেন গুরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দারুর যিভি ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ইহুদ ওলমার্টকে লেখা এক চিঠিতে, ইরানে হামলা না করার আহ্বান জানিয়ে এটা স্বীকার করেছেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইরান তার উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত বিস্তারের চেষ্টা করে নি এমনকি সাদ্দামের পতনের পরও ইরান তার দক্ষিণের সীমান্ত বাড়ানোর কোন পদক্ষেপ নেয় নি। ইরানিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে তিনি তার চিঠিতে স্বীকার করেছেন। আসলে বিশ্বের সকল বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল এ ব্যাপারে অবহিত আছেন যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই কোন দেশের উপর হামলা চালায় নি।
শত্রুদের হুমকি মোকাবেলায় ইরানের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারনা পেতে হলে কেবল দেশটির সামরিক শক্তি বিশ্লেষণই যথেষ্ট নয়। কারণ যে কোন আগ্রাসনের মোকাবেলায় সমর শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। ১৯৭৯ সালে সংঘটিত বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গণভোটে প্রায় শত ভাগ ইরানি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। এর পর অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই জনগণ ব্যাপকভাবে অংশ নিয়ে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সম্প্রতি এক সমাবেশে এ সম্পর্কে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য বার ভয়-ভীতি ও আতংক সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সফল হয় নি এবং ভবিষ্যতেও তারা সফলকাম হবে না। কারণ ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে জন সমর্থন।
বিদেশী শত্রুর মোকাবেলায় ইরানি জনগণের ঐক্য ও সংহতি, ইরানের জাতীয় শক্তি ও সামর্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক । ইরানের উপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধে ইরানি জনগণ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে এবং নিজেদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরেছে। এখনও ইরানিরা যে কোন আগ্রাসী ও যুদ্ধকামী শত্রুর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত রয়েছে। আলজেরিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আশ শারুক সম্প্রতি এক প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় ইরানের শক্তি ও সামর্থ্যের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করতে যেয়ে ইরানিদের মধ্যে ঐক্যের বিষয়টিকে তুলে ধরেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, ইরানি জাতি ঐক্যবদ্ধ এবং দেশের নেতৃবৃন্দের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। দৈনিক আশ শারুক আরও লিখেছে, ইরানি জনগণ ও নেতৃবৃন্দের ঐক্য ও সংহতিকে ধ্বংস করার জন্য ওয়াশিংটন ও তেলআবিব ব্যাপক চেষ্টা চালালেও কোন ফল হয় নি।
সরকার জন সমর্থনপুষ্ট ও জনকল্যাণমুখী হলে শত্রুদের মোকাবেলার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে, সংকটময় মুহুর্তে জনগণ, সরকারের আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেয়। জনগণ সরকারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকায় শত্রুরা দেশের অভ্যন্তরে কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ পাবে না। অন্যদিকে, ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় সংকট ও সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইরানের উপর সাদ্দাম বাহিনীর হামলার সময় ইসলামী ইরানের রূপকার ইমাম খোমেনি(রহ -র দিক-নির্দেশনা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি, ইমাম খোমেনি (রহ -র মতোই দেশ ও জাতিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন এবং শত্রুদের মোকাবেলায় জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ নেতার প্রতি ভালোবাসার কারণে ইরানি জনগণ তার আহ্বানে দ্রুত সাড়া দিয়ে থাকেন।
জুলুম ও আগ্রাসন বিরোধী ইরানি জনগণ, ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী বিপ্লব থেকে এ শিক্ষা অর্জন করেছে যে, কারো জুলুম মেনে নেয়া যাবে না এবং আক্রান্ত হলে কাল বিলম্ব না করে দেশ রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়তে হবে। ইরানিদের এই বৈশিষ্ট্যের কারণে সাম্রাজ্যবাদীরা ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরুর আগে এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য হবে। তারা এটা ভালো করেই জানে যে, ইরান আগ্রাসীদের ক্ষমা করবে না এবং যে কোন হঠকারিতার দাত ভাঙ্গা জবাব দেবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি সম্প্রতি এ ব্যাপারে বলেছেন, যে হাত আমাদের প্রিয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে আগ্রাসন চালাবে, ইরানি জাতি ঐ হাত কেটে ফেলবে। ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ় মনোভাব, অন্যান্য দেশ বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর জনগণের উপরও প্রভাব ফেলেছে এবং তারাও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মোকাবেলায় রুখে দাড়াতে উৎসাহিত হচ্ছে। বিশ্বের মুসলমানরা আজ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে ইরানিদের সংগ্রামে, নিজেদেরকে অংশীদার বলে মনে করে এবং ইরানের ঘটনাবলীর উপর তাদের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।
কাজেই ইরানের শক্তি একটি ভৌগলিক গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা মনে করলে ভুল হবে। কারণ ইরানি জনগণের ন্যায় ও যৌক্তিক অবস্থানের প্রতি গোটা বিশ্বের ন্যায়কামী মানুষের সমর্থন রয়েছে। এ কারণে ইরানে হামলা হলে আগ্রাসীদেরকে গোটা বিশ্বেই প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জনমনে ইরানের বিশেষ স্থান রয়েছে।
এছাড়া, ইরানে বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শত্রুদের মোকাবেলায় ইরানের শক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা বিভাগেরই এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ইরানের ভেতর থেকে দেশটির উপর আঘাত হানা, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন বিষয়। কারণ মাহমুদ আহমাদিনেজাদের নেতৃত্বাধীন ইরানের বর্তমান সরকার, রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি স্থিতিশীল বলেই মনে হচ্ছে। এছাড়া, জ্বালানী তেলের মুল্য বৃদ্ধির সুবাদে এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেনীকে অর্থ সাহায্য ও কৃষি ঋণ মওকুফের মতো নীতি গ্রহণের কারণে ইরানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবেশ বিরাজ করছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি যে আগ্রাসীদেরকে দাতভাঙ্গা জবাব দিতে সক্ষম, সে কথা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনেও স্বীকার করা হয়েছে। আজকের আসরে আমরা ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি সম্পর্কে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণামূলক প্রতিবেদন নিয়েও আলোচনার চেষ্টা করব। এখানে বলে রাখছি, পাশ্চাত্যের অব্যাহত হুমকি সত্ত্বেও ইরান সামরিক খাতে কখনোই আকাশচুম্বি বাজেট বরাদ্দ করে নি। কিন্তু এর পরও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, তারা সর্বোত্তম পন্থায় শত্রুদের আগ্রাসন মোকাবেলা করতে সক্ষম এবং এ ব্যাপারে সদা প্রস্তুত রয়েছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটিজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-র গবেষক এন্টনি কুরদাযমেন এক প্রতিবেদনে ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি বিশ্লেষণের পর লিখেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীই হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী। ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজার ও রিজার্ভ ফোর্সের সদস্য তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বলে তিনি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। তবে এই গবেষক ইরানের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল বাহিনী বাসিজের রয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রশিক্ষিত সদস্য। ইরানের উপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে শত্রুদের পরাজিত করার ক্ষেত্রে বাসিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের প্রতিটি শহরে বাসিজের বীর সেনানীর উপস্থিতির কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরানে স্থলপথে হামলার সাহস করবে না।
ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের হুমকি অব্যাহত ছিল। এ কারণে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুদের মোকাবেলার জন্য সদা প্রস্তুত থেকেছে এবং এখনও ঐ একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আলজেরিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আশ শারুক এ সম্পর্কে লিখেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের মিত্র শাহের পতনের পরই দেশটির নেতৃবৃন্দ এটা বুঝতে পেরেছিলেন, যে কোন সময় ইসলামের শত্রুদের মাধ্যমে আক্রান্ত হবার আশংকা রয়েছে। এ কারণে ইরান ৩০ বছর আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মার্কিন দৈনিক ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরও সম্প্রতি লিখেছে, এটা ঠিক যে, ইরানের সামরিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পর্যায়ে নয়,কিন্তু ইরান অপ্রচলিত বিভিন্ন পন্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জবাব দেয়ার ক্ষমতা রাখে। দৈনিক আশ শারুক এ সম্পর্কে আরও লিখেছে, পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইরান ক্ষেপনাস্ত্রের সাহায্যে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন অধিকাংশ মার্কিন রণতরী ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে।
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প বিদেশের উপর নির্ভরশীল নয়। আর এ বিষয়টিই শত্রুদের জন্য ভয়ের সবচেয়ে বড় কারণ। সামরিক শিল্প, নিজস্ব প্রযুক্তি নির্ভর হবার কারণে ইরানকে কারো কাছে হাত পাততে হয় না। প্রয়োজনে যখন তখন অস্ত্র তৈরী করে তা ব্যবহার করার ক্ষমতা রয়েছে ইরানের। ইরানের উন্নত অস্ত্র-শস্ত্রের সিংহ ভাগই তৈরী করেন ইরানি বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ হলো, গত তিন দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখা হয়েছে। পাশ্চাত্যের এই নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য শাপে বর হয়েছে। অস্ত্রের জন্য যাতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে না হয়, সে জন্য ইরানি নেতৃবৃন্দ প্রথমেই এ ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। দৈনিক আশশারুক এ সম্পর্কে লিখেছে, ইরানিরা অতীত থেকে এ শিক্ষা অর্জন করেছে যে, অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল থাকা চলবে না, কারণ অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো চড়া মূল্যে অস্ত্র বিক্রির পাশাপাশি নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে থাকে। এছাড়া, প্রয়োজনের সময় অস্ত্রের যোগান দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা গড়িমসি করতে পারে। এসব নানা কারণে ইরান এক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ বেছে নেয় এবং অস্ত্র শিল্পের আধুনিকায়নে হাত দেয়।
ক্ষেপনাস্ত্র হচ্ছে ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তির উল্লেখযোগ্য একটি দিক। ইরানের উপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরু হবার পর ইরান ক্ষেপনাস্ত্র শিল্প উন্নয়নের দিকে নজর দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইরান আজ স্বল্প, মধ্যম ও দূর পাল্লার উন্নত ক্ষেপনাস্ত্র তৈরী করছে। ওয়াশিংটনের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেসন্স এ সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরানের দূর পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রগুলোই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করবে। ইরানের কাছে বর্তমানে হাজারো ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে শাহাব-এক, দুই ও তিন অন্যতম এবং শাহাব ক্ষেপনাস্ত্রের পাল্লা হচ্ছে দুই হাজার কিলোমিটার। শাহাব ক্ষেপনাস্ত্র, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যে কোন ঘাটি ও অবস্থানে আঘাত হানতে সক্ষম এবং গোটা ইহুদিবাদী ইসরাইল ইরানি ক্ষেপনাস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে। আলজেরিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আশ শারুক, শাহাব, আশুরা ও ক্বাদরসহ ইরানের বিভিন্ন ক্ষেপনাস্ত্রের শক্তি ও ক্ষমতা বিশ্লেষণের পর লিখেছে, ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র শক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রগুলো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরী এবং ইরানি ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যাপারে বিদেশীদের কোন ধারণাই নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও বর্ণবাদী ইসরাইল, কখনো ইরানে হামলা চালালে তা হবে আকাশ পথে এবং এ ক্ষেত্রে মার্কিন জঙ্গী বিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করা হবে। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইরানের কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান, দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট এবং সুসজ্জিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দৈনিক আশ শারুক, ইরানের মিসাক-এক ও দুই ক্ষেপনাস্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছে, এসব ক্ষেপনাস্ত্র অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান ও স্মার্ট বোমা ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। ওয়াশিংটনের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইরান, নিজেদের ক্ষেপনাস্ত্রের পাশাপাশি রাশিয়ার কাছ থেকে এমন অনেক বিমান বিধ্বংসী উন্নত ক্ষেপনাস্ত্র ক্রয় করেছে,যা দিয়ে শত শত বিমান হামলার জবাব দেয়া সম্ভব। এসব কারণে ইরানের উপর আকাশ পথে হামলা হলেও তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর দু:সাহস দেখালে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর যুদ্ধের মুল ক্ষেত্রে পরিণত হবে। কারণ এখানেই মার্কিন রণতরী ও ঘাঁটিগুলোর অবস্থান। ইরানের নৌ-বাহিনীও অত্যন্ত শক্তিশালী।
পারস্য উপসাগরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মহানবী (সা) নামক তৃতীয় মহড়ায় ইরানের নৌ শক্তির কিয়দাংশ প্রদর্শন করা হয়েছে। ঐ মহড়ায় ভুমি থেকে সাগরে এবং সাগর থেকে সাগরে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর পর বিশ্বের সামরিক বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত হয়েছেন। এর বাইরেও পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের সুসজ্জিত বহু রণতরী রয়েছে। ওয়াশিংটনস্থ কাউন্সিল অন ফরেন রিলেসন্স এ সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরানের কাছে রণতরী বিধ্বংসী যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিন ও শত শত গান বোট রয়েছে এবং গান বোটগুলোতে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র বসানো হয়েছে। এছাড়া, ভুমি থেকে সাগরে নিক্ষেপযোগ্য ইরানি ক্ষেপনাস্ত্রগুলো পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের যে কোন লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
গত জানুয়ারি মাসে মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন সামরিক মহড়ার খবর ফাঁস করে দিয়েছে। সেখানে তারা ইরানের দ্রুতগামী গানবোটগুলোর আক্রমন মোকাবেলার মহড়া দিয়েছে। ঐ মহড়ার ফলাফলে দেখা গেছে, যুদ্ধের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই ইরানিদের হামলায় ১৬টি মার্কিন রণতরী ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়াও সম্ভাব্য যুদ্ধে ইরানের আরেকটি প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, হরমুজ প্রণালী। ইন্টারনেট ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল মুহিত এ সম্পর্কে লিখেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দেড় কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়ে থাকে, কাজেই ইরান এই প্রণালী বন্ধ করে দিলে আরব দেশগুলোর অর্থনীতির চাকা স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিও ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানে বিমান হামলা করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো, দেশটির বিশাল আয়তন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অবস্থানগত ভিন্নতা। ওয়াশিংটনের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেসন্স তাদের প্রতিবেদনে আরও লিখেছে, পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই'শটি জঙ্গী বিমান মোতায়েন রয়েছে, প্রশ্ন হলো, এই দুই'শটি বিমান কি করে ১৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশ ইরানের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে? এছাড়া, ইরানের স্থাপনাগুলোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পর্যাপ্ত তথ্যও নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকাশিত দৈনিক আল খালিজ এ সম্পর্কে লিখেছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিভিন্ন দিক এবং পরমাণু স্থাপনাগুলোর সঠিক অবস্থান সম্পর্কে মার্কিন ও ইসরাইলী গোয়েন্দাদের কাছে সঠিক তথ্য না থাকার বিষয়টিও ইরানের উপর আক্রমনের পথে বাধা হয়ে আছে।
এসবের বাইরেও ইরানের স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আভ্যন্তরীণ নাজুক পরিস্থিতি ইরানের উপর হামলার অনুকুলে নয়। কারণ ইরানের প্রধান দুই শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দেশের বাইরের বিভিন্ন সমস্যা ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরেও আর্থ-রাজনৈতিক নানা সংকটের সম্মুখীন। অন্যদিকে, বিশ্বের কোন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাই ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের উপর হামলার দু:সাহস দেখালে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য এক মহা বিপর্যয় ডেকে আনবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

