বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষাবাহিনী বিএসএফ-এর রক্তাক্ত সন্ত্রাস দুঃসহ পর্যায়ে পেঁৗছেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'হিউম্যান রাইটসওয়াচ' এক যৌথ প্রকাশনায় বলেছে : ভারতের বিএসএফ প্রতি চারদিনে একজন বাংলাদেশিকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করছে। সীমান্ত এলাকায় লাখ লাখ বাংলাদেশির প্রতিটি দিন কাটে আতঙ্কে। একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীর মন্তব্য : 'ইসরায়েলের গাজা সীমান্তের চেয়ে ভয়ঙ্কর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। গাজায় যুদ্ধের সময়ও সাধারণ মানুষকে এভাবে গুলি করে হত্যার নজির নেই।' ওই হিসাব ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সম্প্রচারিত 'ট্রিগার হ্যাপি : এক্সেসিভ ইউজ অব ফোর্স বাই ইন্ডিয়ান ট্রুপস এট দি বাংলাদেশ বর্ডার' তথা 'বন্দুকবাজিতে মাতোয়ারা : ভারতীয় সেনাদলের বাংলাদেশ সীমান্তে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভ্যাস' এই শিরোনামে বিলেতের চ্যানেল ফোরের একটি প্রামাণ্য টেলিভিশন চিত্রের তথ্য। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সংকলিত ১১ মাস ৭ দিনের পরিসংখ্যান।
এরপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের প্রতিহিংসামূলক সন্ত্রাসী তৎপরতা যেন আরও বেড়ে গেছে। ২০১০ সালে ইংরেজি বর্ষশেষের শেষ দুই সপ্তাহে সিলেট, সাতক্ষীরা, যশোর, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়_ এসব সীমান্তে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন জন করে নির্বিবাদে সাধারণ মানুষের লাশ পড়েছে বিএসএফের গুলিতে। বিএসএফ ধরে নিয়ে যাচ্ছে যাকে খুশি তাকে কাঁটাতারের বেড়ার এপার থেকে। তাদের বেধড়ক মারধর করেছে নানা ধরনের 'সংবাদ' সংগ্রহের অজুহাতে, আহত আধমরাদের ফেরত পাঠিয়েছে। কেউ কেউ এখনো নিখোঁজ। শুধু উত্তরাঞ্চলেই গত এক বছরে গুলিতে নিহত ছত্রিশ, আহত শতাধিক। নির্যাতনে জিজ্ঞাসাবাদে আহতদের সংখ্যা এই হিসাবের বাইরে। 'উত্তরের সীমান্তে কান্নার শব্দ বাড়ছে'_ এই শিরোনামে প্রতিবেদক নজরুল মৃধা লিখেছেন : বিএসএফের নির্যাতন ও গুলির শিকার সীমান্তবাসী বাংলাদেশি মৃত্যুর ৫০ শতাংশই ঘটেছে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন ১শ'র ওপরে। অপহরণ, পুশইনের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। একটি স্থানীয় বেসরকারি এনজিও সংস্থার সূত্রমতে, উত্তরের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলার সীমান্তে এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত ১৭ ডিসেম্বর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই সীমান্তে আবদুর রশিদ (৩০) নামে এক দিনমজুর জমিতে কাজ করতে গেলে বিনা উস্কানিতে বিএসএফ গুলিবর্ষণ করলে তার মৃত্যু হয়। ১৯ ডিসেম্বর একই জেলার উত্তর গোমতী সীমান্তে বিএসএফের গুলিবর্ষণে নিহত হন আবদুর রশিদ নামে অপর এক গ্রামবাসী। ২৪ ডিসেম্বর লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার দইখাওয়া সীমান্তে খর্প নদীতে বেড়াতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন সাইফুর (২২) নামের এক যুবক। ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর খানপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন এক বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ী। পরদিন ২৬ ডিসেম্বর লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তে এক বাংলাদেশি যুবক বিএসএফের গুলিতে মারা যান। এ সময় বাবু নামে অপর এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। ২৮ ডিসেম্বর দিনাজপুরের বিরামপুর খিয়ার মাহমুদপুর এলাকার জিরো পয়েন্টে অজ্ঞাতনামা এক বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার করে বিজিবির সদস্যরা। বিএসএফের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে। এভাবে প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত বছরের শুরুর দিকে পঞ্চগড়ে বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এক গৃহবধূর শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালালে স্থানীয় জনগণ প্রতিরোধ করে। এ সময় বিএসএফ গুলি চালালে তিন গ্রামবাসী নিহত হন।
গত দুই বছরে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ২০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। বিএসএফের গুলিতে গত ১০ বছরে এই সংখ্যা প্রায় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৯২৩ জন, অপহৃত ৯৩৩ জন, নিখোঁজ ১৮৬ জন, পুশইনের ঘটনা ২৩৫টি বলে জানায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। অধিকাংশ ঘটনায় প্রথমে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা চিঠি পাঠায়। এরপর পতাকা বৈঠক হয় এবং বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করে। লাশ ফেরত পেতে লেগে যায় কয়েকদিন। এছাড়া বিনা উস্কানিতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ঢুকে লুটপাট, অগি্নসংযোগ, অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে বিএসএফ সদস্যরা প্রায় নিয়মিত।
সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং মৃত্যুর ঘটনা ব্যাখ্যায় চোরাচালান, সীমান্ত অতিক্রম ইত্যাদি অজুহাত দাঁড় করালেও অপহরণ, লুটপাট প্রভৃতি অপরাধের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না বিএসএফ। নিয়ম অনুযায়ী সীমান্তে কোনো সন্দেহভাজন অপরাধী পাওয়া গেলে তাদের আটক করে দুই দেশের কর্মকর্তা পর্যায়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে সমাধান না হলে উচ্চতর আইনি ব্যবস্থার কথাও বলা আছে। গত বছর মার্চ ও সেপ্টেম্বর মাসে বিএসএফ ও বিডিআর (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও সিদ্ধান্ত হয়েছিল সীমান্তে দুই পক্ষে প্রথমে গুলি চালাবে না। কিন্তু সীমান্তবাসী এখন বিএসএফের গুলিবর্ষণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলার দাবি তুলেছে উত্তরাঞ্চল থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসওয়াচের তরফে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, এভাবে বিনাবিচারে নিরস্ত্র যাত্রী বা সন্দেহভাজনকেও হত্যা করা মৌলিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের খেলাফ। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক আইন বা বিধি মোতাবেক বিএসএফ সশস্ত্র সীমাবল ইত্যাদি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য বাংলাদেশ সীমান্তে কর্মরত, তাদের দায়মুক্তি বিধি প্রত্যাহার এবং আইন মোতাবেক সীমান্তে প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য দায়ী বিএসএফ বা অন্য নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যকে আদালতে ন্যায়বিচারের আওতায় আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটসওয়াচ। এই সংগঠনের হিসাব মোতাবেক ২০০০ সালের জানুয়ারির শুরু থেকে ২০১০ সালের আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত ৮৭৫ জন বাংলাদেশি এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে। আহতের সংখ্যা ৯২৩ জন, অপহৃতের সংখ্যা ৯৩৩ জন।
২০১১ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, সীমান্তমৃত্যুহার আরও বেড়ে গেছে। বছরের প্রথম সপ্তাহে চারজনের লাশ পড়েছে। বছরের প্রথম দিনেই খুঁজে পাওয়া গেল যশোরের বেনাপোল সীমান্তে একটি লাশ। বিগত বছরের শেষ রাতে সে বাড়ি ফিরছিল। তারপর সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে আরও দুই গুলিবিদ্ধ গরু ব্যবসায়ীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল রাজশাহীর খানপুর সীমান্তে। তাদের একজনের বয়স মাত্র বিশ বছর। সবচেয়ে করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটল সপ্তাহান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য দেশে ফেরার পথে কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে গুলিতে নিহত এক কিশোরীর। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতের চৌধুরীহাট সীমান্ত ফাঁড়ির বিএসএফ গুলি করে ফেলানী (১৫) নামে বাংলাদেশি এক কিশোরীকে হত্যা করে পরে লাশ নিয়ে যায়। ৭ জানুয়ারি সকাল সোয়া ৬টার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোরী নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা বানারভিটা গ্রামের নুরু মিয়ার কন্যা। এ সময় কিশোরীর সঙ্গে তার পিতা নুরু মিয়া, মা, ১ বোন ও ১ ভাই ছিল। তাদের মধ্যে নুরু মিয়াসহ ৩ জন পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারলেও মই দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হতে গিয়ে ফেলানির জামা-কাপড় আটকে যায়। এ সময় সে ভয়ে চিৎকার শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিএসএফের বুলেট তার বুক ঝাঁজরা করে দেয়। বাবার পিছে পিছে ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তের ৯৪৭ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ৩ ও ৪ সাবপিলারের কাছ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিএসএফের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের টহল দল অতর্কিত গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই ফেলানীর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় ফেলানীর লাশ সীমান্তে কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলতে থাকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে সীমান্তের মানুষ। বেলা সাড়ে ১১টায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ সরিয়ে নেয় বিএসএফ। গুলি করে হত্যার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে চিঠি দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। দুই দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৫ জানুয়ারি লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে এ সম্পর্কে রাহিদ এজাজের একটি মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন : 'হামরা গরিব মানুষ, প্যাটের ভোকোত ভারত গেছিলাম, আর কোনো দিন যাবার নই। বাবা গো, তোমরা হামার বেটির লাশ আনি দেও, নিজ হাত মাটি দেমো।' এ কথাগুলো বলে বিলাপ করছিলেন নুরুল ইসলাম। মৃত্যুর দুই দিন পর সন্তানের লাশের মতো ভারী বোঝা কাঁধে নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের বানারভিটা গ্রামের এই হতদরিদ্র দিনমজুর।
নুরুলের বিলাপ শাসনযন্ত্রের কানে পেঁৗছে না। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত মৃতদেহের ছবিও হৃদয় স্পর্শ করে না! বিএসএফের নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পরও সরকার কোনো প্রতিবাদ করে না। কেন? গরিব বলে? আর কি বলেইবা বর্বরোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষাবাহিনী? তারা কি বলবে, ১৫ বছরের ফেলানী দুষ্কৃতকারী, হামলা করেছিল বিএসএফের ওপর?
একটা তুলনামূলক বৈদেশিক ঘটনা তুলে ধরছি। গত সপ্তাহে শ্রীলঙ্কার সমুদ্রসীমার মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর গুলিতে একজন ভারতীয় জেলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সমুদ্রে পড়ে মারা যায়। আরেকজন গুলির আঁচড় লেগে সামান্য আহত হয়। সেই সামান্য আহত জেলের জবানবন্দী নিয়ে ভারতীয় সংবাদ ও টেলিভিশন মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে চিঠি দিয়ে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শ্রীলঙ্কার দিলি্লস্থ হাইকমিশনারকে তলব করে সরকারিভাবে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে বারবার বলা হতে থাকে : ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় শ্রীলঙ্কার সমুদ্রসীমা লক্সঘনকারী জেলে বা অন্য কাউকে আটক অবশ্যই করতে পারে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী, কিন্তু গুলি করতে পারে না। সেটা মৌলিক মানবাধিকার লক্সঘন।
একই কথা বাংলাদেশে বিএসএফের নিত্যনিয়মিত সীমান্ত সন্ত্রাসের বিষয়ে ভারতীয় সুশীল সমাজ বা সংবাদমাধ্যম কেন তুলে ধরে না (ফেলানীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে কলকাতার আনন্দবাজারের মন্তব্য একটা ব্যতিক্রম) কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিটি ঘটনায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে কেন প্রতিবাদ জানায় না, সেটা এদেশবাসীর প্রশ্ন।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

