somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যানসাই বিমানবন্দর আধুনিক বিশ্বের এক জীবন্ত মডেল।

২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ষাটের দশকে জাপানের ক্যানসাই প্রদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ছিল খুবই করুন। যাতায়াত সমস্যার করণে প্রতিনিয়ত জাপানের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ হারাচ্ছিল ক্যানসাই। এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে শুধু বড় আকারের কোন বিমানবন্দর। সিদ্ধান্ত হলো, নতুন বিমানবন্দর করা হবে। কিন্তু বিমানবন্দরের জায়গা খুঁজে বের করতে সমস্যায় পড়ে গেল কর্তৃপক্ষ। প্রথমে ঠিক করা হয়েছিল কোবে শহরে বানানো হবে এই বিমানবন্দর। কিন্তু কোবেবাসী জানাল, আপাতত কোন বিমানবন্দর তাদের প্রয়োজন নেই। কোথাও জায়গা না পেয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিল কর্তৃপক্ষ, ঠিক হলো সমূদ্রের ওপরই বানানো হবে বিমানবন্দর। জাপানের একদম দক্ষিণ দিকের ওসানা সমুদ্রতীর থেকে খানিকটা অদুরে জায়গা ঠিক করা হলো। কিন্তু পানি দিতেও নারাজ স্থানীয় জেলেরা। তার যুক্তি দেখাল, এখানে বিমানবন্দর হলে মাছ ধরায় নানা সমস্যা দেখা দিবে। প্রচুর ক্ষতি পূরণ দিয়ে শেষে তাদের রাজি করানো হলো। এ জন্য তিনটি পাহাড় থেকে ২১ মিলিয়ন কিউবিক পাথর সংগ্রহ করা হয়। প্রায় তিন বছর ধরে ১০ হাজার শ্রমিক, এক কোটি কর্মঘন্টা ব্যয় করে ৮০টি জাহাজের সাহায্যে সমুদ্রের তলদেশ থেকে ৩০মিটার উচ্চতায় ভূমি সৃষ্টি করা হয়। আস্তে আস্তে ছোটখাটো একটা দ্বীপের আকৃতি নেয় এই ভূমি। ভূমিতো হলো কিন্তু এর ওপর বিমানবন্দর বানাতে তো বিভিন্ন উপকরণ লাগবে। সেগুলো জাহাজের সাহায্যে আনা-নেওয়াটা ব্যয়বহুল হবে। ফলে মূল ভূখন্ড রিনকুর সঙ্গে দ্বীপটিকে যুক্ত করে তৈরি করা হলো তিন কিলোমিটার লম্বা একটি ব্রিজ। এতে মোটরগাড়ি চলাচলের জন্য রয়েছে ছয়টি লেন এবং রেলগাড়ির জন্য দুটি লেন। এতে খরচ হয় এক কোটি ডলার। এসবের মধ্যেই প্রকৌশলীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, কাজ শুরু হলে নির্মাণসামগ্রীর ভারে দ্বীপটি ক্রমান্বয়ে ডুবতে শুরু করবে। এবং আসলেই কাজ শুরুর পর যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তার থেকেও বেশি প্রায় আট মিটার সমূদ্রে ডুবে যায় ক্যানসাই। ফলে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয় ২০ বছরের পরিকল্পনা, তিন বছরের কর্মযজ্ঞ আর কয়েক কোটি ডলার; আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণকাজ। তবে কর্তৃপক্ষ হাল ছাড়তে নারাজ। তারাতো জাপানি বাংলাদেশী নয়। অনেক হিসাব-নিকাশ করে তারা জানাল, বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার ওজন হালকা করতে পারলে একসময় দ্বীপটির ডুবে যাওয়ার হারও কমে যাবে। ফলে টার্মিনালে পাতলা ধাতব প্লেট ব্যবহার করা হলো। এতে বিমানবন্দরের ওজন অনেকখানি কমে আসে। বিমানবন্দরের কাজ যত এগিয়ে যাচ্ছিল, নির্মাণ ব্যয়ও তত বাড়ছিল। ব্যয় কমাতে দ্বীপের পিরিধি কমানোর জন্য চাপ দেয় জাপান সরকার। কিন্তু প্রকল্পের মূল স্থপতি ইতালির রেনজো পিয়ানো তা মানতে রাজি নন। তাই দ্বীপের মূল আকৃতি রেখেই কাজ এগিয়ে যেতি থাকে। বিমানবন্দরটির টার্মিনাল বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা টার্মিনাল, প্রায় পৌনে দুই কিলোমিটার। টার্মিনালটির ছাদ এমনভাবে করা হয়েছ, যাতে হারিকেনের মতো সামুদ্রিক ঝড় কোন ক্ষতি করতে না পারে। চারতলা টার্মিনালের তৃতীয় তলায় রয়েছে বোর্ডিং লবি, চতুর্থ তলা টিকিটিং হল। আর নিচের তলাগুলো ব্যবহৃত হয় যাত্রীদের ইমিগ্রেশনের জন্য। চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং আড়াই কিলোমিটার প্রস্থের ক্যানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় ১৯৯৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সেই থেকে এ বিমানবন্দরে সপ্তাহে আন্তর্জাতিক যাত্রী বিমান ওঠানামা করে ৬১৪টি, মালবাহী বিমান ২০০টি এবং অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল করে ৪৯৩টি। মহাশূন্য থেকে দেখা যায় এই বিমানবন্দর। বিশ্বের দ্বিতীয় খরুচে বিমানবন্দর হচ্ছে এই ক্যানসাই। এখানে এক কাপ কফির দাম ১০ ডলার। তাহলে ভাবুন, অন্যান্য খরচ কেমন হতে পারে। এ পর্যন্ত দু দুটো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে ক্যানসাই। ৯৫ এর প্রলংকারী ভূমিকম্পে বিমানবন্দরের কোন কাচ পর্যন্ত ভাঙেনি। অথচ এ ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে মাত্র ২০ কিঃমিঃ দূরে ছিল ক্যানসাই। আগে ১৯৯৪ সালে ঘন্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে একটি টাইফুনও বিমানবন্দটির ওপর দিয়ে চলে যায়। এত দুর্যোগের পর প্রমাণিত হয় ক্যানসাই বিমানবন্দর একটি সফল স্থাপনা। যমুনা সেতুর মত ফাটল দেখা দেবার কোন সম্ভবনাই নাই ক্যানসাইয়ে। এর জন্য ২০০১ সালে দ্য আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারস ক্যানসাই বিমানবন্দরকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মনুমেন্ট অব দ্য মিলেনিয়াম ঘোষণা করে। ক্যানসাই বিমানবন্দর নির্মাণকৌশল প্রয়োগ করে পরে কৃত্রিমভাবে দ্বীপ তৈরী করে নির্মাণ করা হয়েছে নিউ কিতাকুসু বিমানবন্দর, কোবে বিমানবন্দর, চুবু বিমানবন্দর এবং হংকং বিমানবন্দর।
ক্যানসাই বিমানবন্দরের ডুবে যাওয়ার মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এটির ডোবার মাত্রা ৫০ সেন্টিমিটার থেকে কমে নয় সেন্টিমিটারে এসে থেমেছে। বিমানবন্দরটির একেবারে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা এখন আর নেই বললেই চলে। ফলে এটিকে আরও বড় করা হয়েছে। ২০০৭ সালে এটির দ্বিতীয় রানওয়ে খোলার কথা থাকলেও তা স্থগিত আছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ধীরে ধীরে ক্যানসাই বিমানবন্দরকে আরও বিস্তৃত করা যাবে। এক সময় হয়তো এটি মুল ভূখন্ডের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে যাবে।
জাপান ভাবে কিভবে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছা যায় আর আমরা ভাবি কি করে চরম অবনতির শিখরে পৌঁছা যায়। কিভাবে দেশের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়া যায়। কি ভাবে টেন্ডার বাজির মাধ্যমে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়।

আমরা কি ওদের অনুসরণ করতে পারি না?
১১টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×