ন্যাটোর ফ্যাসিবাদী যুদ্ধ
---ফিদেল ক্যাস্ট্রো
_____________________________
১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। হয়তো অনেকেই এখনো সে ঘটনার কথা স্মরণ করেন। তবে ইতালি ও জার্মানির ফ্যাসিস্ট নেতারাও তখন এতটা নির্লজ্জ ছিল না, এখন লিবিয়ার ক্ষেত্রে ন্যাটো যতটা নির্লজ্জতার পরিচয় দিচ্ছে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের পর কেটে গেছে ৭৫ বছর। তবে এই পৌনে এক শতাব্দীজুড়ে যত ঘটনা ঘটেছে, সে গৃহযুদ্ধের সাথে এর কোনোটার তুলনা চলে না।
মানবজাতিকে প্রতারণা ও বিপুল অজ্ঞতার দিকে টেনে নেয়া হয়েছে। সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। যা হোক, ১৯৩৬ সালের উপরিউক্ত ঘটনায় দু’টি সিস্টেম ও আদর্শের মাঝে চরম সঙ্ঘাত বেধেছিল। দু’পক্ষের সমরশক্তি ছিল কম-বেশি সমান।
আজকের সাথে সে দিনের অস্ত্রশস্ত্রের তুলনা করলে মনে হবে, ওগুলো ছিল খেলনা। তাই ধ্বংসাত্মক শক্তি তখনো মানবজাতির অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। স্খানীয়ভাবে মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং কোনো কোনো নগর, এমনকি বিভিন্ন দেশও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। তবে আজকের মতো গোটা মানবজাতি নির্মূল হওয়ার মতো হুমকি তখন দেখা দেয়নি। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নির্বুদ্ধিতা ও আত্মঘাতী শক্তি বর্তমান পরিস্খিতির জন্য দায়ী।
এই প্রেক্ষাপটে, যদি অব্যাহতভাবে নিউজ রিপোর্টে জানানো হয়, শতভাগ নিখুঁত লেসার নিয়ন্ত্রিত রকেট, আলোর দ্বিগুণ গতির জঙ্গি ও বোমারু বিমান, সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ও তাদের বংশধরদের জন্য বিপজ্জনক বিস্ফোরক (যা ইউরেনিয়ামদৃঢ় ধাতব বস্তুকেও উড়িয়ে দেয়) ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে, তাহলে নিদারুণ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।
জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্খিতির ব্যাপারে কিউবা নিজের অবস্খান জানিয়ে দিয়েছে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই কিউবা লিবিয়া সঙ্কটের রাজনৈতিক সুরাহার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিউবা সে দেশে যেকোনো বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপের সুস্পষ্টভাবেই বিরুদ্ধে।
তবে বিদ্যমান পরিস্খিতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তর আফিন্সকায় এ নিষ্ঠুর যুদ্ধের প্রাক্কালে বিশ্বের আরেক অঞ্চলে পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ৯ ডিগ্রির ভূকম্পনে সৃষ্ট সুনামির পরপরই অত্যধিক জনবহুল একটি এলাকায় এটা ঘটল। ফলে জাপানের মতো কঠিন পরিশ্রমী জাতির ৩০ হাজার মানুষ ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। ৭৫ বছর আগে এমন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল না।
হাইতি একটি দরিদ্র ও অনুন্নত দেশ। সাত ডিগ্রির ভূমিকম্প দেশটিতে তিন লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। তখন অসংখ্য মানুষ আহত ও কয়েক লাখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অপর দিকে এবার জাপানের জন্য যা ভয়াবহ মর্মান্তিক, তা হলো ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার প্লান্টের দুর্ঘটনা। এর কী ফলাফল দাঁড়াচ্ছে, তা এখনো হিসাব করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বার্তা সংস্খা পরিবেশিত কয়েকটি বড় খবর তুলে ধরছি। আনসা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কমিশন (এনআরসি) চেয়ারম্যান গ্রেগরি জ্যাকজকো বলেছেন, ফুকুশিমা প্লান্ট থেকে যে বিকিরণ ঘটছে, তা চরম উচ্চমাত্রার মারাত্মক বিকিরণ। আরেক বার্তা সংস্খার খবর জাপানের পরিস্খিতি যে পরমাণু হুমকির জন্ম দিয়েছে, এতে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক প্লান্টগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্খা পর্যালোচনার জোর তাগিদ এসেছে। কয়েকটি দেশ এ অবস্খায় পারমাণবিক বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বìধ করে দিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জাপানের বিধ্বংসী ভূমিকম্প এবং ক্রমেই মারাত্মক হয়ে ওঠা পারমাণবিক সঙ্কট জাপানি অর্থনীতির ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি করতে পারে। আর এ ঘটনায় সারা বিশ্বের যে ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার হিসাব করা কঠিন। এএফপি’র বার্তা : ভূকম্পন ও সুনামিতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং পাঁচ লাখ মানুষ গৃহহীন হওয়ার সাথে এখন যে পারমাণবিক সঙ্কট, এর গতি-প্রকৃতির কোনো পূর্বাভাস দেয়া যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে সম্রাট আকিহিতো উদ্বিগ্ন। অন্য একটি খবর ফুকুশিমার পরমাণু কেন্দ্রে একটার পর একটা চুল্লিতে বিপদ দেখা দেয়ায় পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বেড়ে চলেছে। সেখানে দুর্ঘটনার প্রতিকারের প্রাণান্ত প্রয়াসও মানুষকে সামান্য আশাবাদী করতে পারছে না। খবর আছে আরো ভয়াবহ। কেউ কেউ বলেছেন, টোকিও খাবার পানিতে বিষাক্ত রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন দূষণ ঘটেছে। এ নগরীতে পানির বোতলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মোট কথা, আমাদের দুনিয়ায় বিরাজ করছে নাটকীয় পরিস্খিতি।
আবার লিবিয়া প্রসঙ্গ। লিবিয়ার যুদ্ধ নিয়ে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারি। লিবিয়ার নেতার সাথে রাজনীতি কিংবা ধর্ম, কোনো দিকেই আমার মিল নেই। আমি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং জননেতা মার্তির অনুসারী। কথাটা বলেছি বহুবার। আমি লিবিয়াকে দেখি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হিসেবে। লিবিয়া জাতিসঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।
এর জনসংখ্যা মাত্র ৫ মিলিয়ন। কখনো কোনো বড় বা ছোট দেশ লিবিয়ার মতো নৃশংস হামলার শিকার হয়নি। এমন একটি সামরিক জোট সেখানে বিমান হামলা করেছে যার আছে হাজার হাজার ফাইটার বোমারু বিমান, শতাধিক সাবমেরিন, পারমাণবিক বিমানবাহী কয়েকটি জাহাজ এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র। এসব দিয়ে পৃথিবীটাকে বহুবার ধ্বংস করা যায়। মানবজাতি আজকের মতো সঙ্কটে পড়েনি অতীতে। ৭৫ বছর আগে নাৎসি বোমারু বিমান স্পেনে হামলার সময়ও এমন অবস্খা হয়নি।
কুখ্যাত অপরাধী সংস্খা ন্যাটো তার ‘মানবিক’ বোমা নিক্ষেপ নিয়ে ‘সুন্দর’ গল্প বানাবে। গাদ্দাফি যদি লিবিয়ার জনগণের ঐতিহ্যমোতাবেক শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, আর লিবিয়ানরাও যদি যুদ্ধ করে যায় তার সাথে, তাহলে ন্যাটো নিজের অপরাধমূলক প্রকল্পগুলোসহ লজ্জার জলাভূমিতে ডুবে মরবে। যারা নিজেদের দায়িত্ব সমাধা করেন, জনগণ তাদের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করে।
৫০ বছরেরও বেশি আগে বাণিজ্যিক জাহাজ ‘লা কুব্রে’তে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার একশ’র বেশি মানুষ খুন করেছিল। তখন আমাদের জনগণ ঘোষণা করেছিল, ‘পাত্রিয়া ও মুয়ের্তে’, অর্থাৎ হয় জন্মভূমি, না হয় মৃত্যু। তারা এই অঙ্গীকার পূরণ করেছে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সদাপ্রস্তুত। আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক যোদ্ধা বলে গেছেন, ‘যে কেউ কিউবা দখলের চেষ্টা করবে, সে শুধু কিউবার রক্তভেজা মাটির ধুলোই পাবে।’
২৮ মার্চ, ২০১১
ভাষান্তর : মীযানুল করীম
লিঙ্কঃ
__________________________
আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কপি+পেস্টের মহোৎসবে আমিও শামিল হলাম। রঙ্গের দুনিয়া। আজকাল চামচামি করেও শান্তির দূত হওয়া যায়, বেয়াড়া রাষ্ট্রকে বুড়াআঙ্গুল দেখিয়েও শান্তিপদক পাওয়া যায়, বর্ণচোরা শিকরহীন এতিম গিরগিটি মার্কা আফ্রিকান ব্ল্যাক শোয়ানও ফাঁকে দিয়ে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পেয়ে যায়।
অথচ শান্তির জন্য, সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে যিনি সমগ্র জীবন লড়াই করে গেলেন, সেই মহান অবিসংবাদিত নেতা কখনোই তথাকথিত শান্তির স্বীকৃতির জন্য বিবেচিত হননি। দুইন্যা বড়ই আচানাক যায়গা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



