আমার প্রিয় পোস্ট

বাঙ্গালীর ব্যাংক ব্যবসা ও বাংলাদেশের আর্থিক খাত-২

২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২০

শেয়ার করুন:                   Facebook

ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব

বাঙালীর ব্যাংক ব্যবসা

বাঙালীরা ব্যাংক ব্যবসা শেখে মুলত এজেন্সীগুলোতে কাজ করে। ভারতের প্রথম ব্যাংক ছিল হিন্দুস্তান ব্যাংক। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৭০ সালে। ৬২ বছর চলার পর এই ব্যাংকটি উঠে যায়। ১৭৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল ব্যাংক। সুখময় রায় নামে এক ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ী ছিল এসময় একমাত্র বাঙালী ব্যাংক পরিচালক। ১৮১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কমার্শিয়াল ব্যাংকের একজন বাঙালী অংশীদার ছিল সূর্যমোহন ঠাকুর। ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্যালক্যাটা ব্যাংকের বাঙালী অংশীদার ছিল রঘুরাম গোস্বামী। এই ব্যাংকগুলোর মূল অংশীদার ছিল ইংরেজরা। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ১৮২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়ন ব্যাংক। ইংরেজ ও বাঙালীদের সমান প্রাধান্যে এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ম্যাকিনটস কোম্পানী ছিল ইংরেজ উদ্যোক্তা আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিল বাঙালীদের মধ্যে প্রধান উদ্যোক্তা। শুরু ভাল চললেও ১৮৫০ সালে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবস্থাপনার অনভিজ্ঞতা, ইংরেজ-বাঙালী দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকটি সফল হতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে যৌথ উদ্যোগে ক্যালকাটা ব্যাংকিং কর্পোরেশন নামে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এক বছর পর ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাখা হয়। ১৮২৩ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গল নোট ইস্যুর মতা পায়। এই ব্যাংকটি ছাড়াও প্রেসিডেন্সী ব্যাংক হিসেবে আরও আত্মপ্রকাশ করেছিল ব্যাংক অব বোম্বে ও ব্যাংক অব মাদ্রাজ। ১৮৬২ সালে অবশ্য এই ব্যাংকগুলোর নোট ইস্যুর মতা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ১৯২১ সালে এই ৩টি ব্যাংক মিলে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক করা হয় যা ১৯৩৪ সালে এই আইন বলে ষ্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অবিভক্ত বাংলা পর্ব

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই অবিভক্ত বাংলায় বাঙালীদের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি ব্যাংক গড়ে উঠে। এর অনেকগুলোই ছিল কুমিল্লা কেন্দ্রীক। যেমন, কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন, বে১/২ল সেন্ট্রাল ব্যাংক, কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংক, পাইওনিয়ার ব্যাংক, নিউ ষ্টান্ডার্ড ব্যাংক, হুগলী ব্যাংক, নাথ ব্যাংক ইত্যাদি। কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৪ সালে। চার হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে এই ব্যাংকের ব্যবসা শুরু করেছিলেন কুমিল্লার বিশিষ্ট আইনজীবী নরেন দত্ত। চার হাজার টাকার মধ্যে তার অংশ ছিল দেড় হাজার টাকা। নরেন দত্তের ছেলে বটকৃষ্ণ দত্ত কলকাতা থেকে বানিজ্যে গ্রাজুয়েশন করে দেশে ফিরে মাত্র ২১ বছর বয়সে নিউ ষ্টান্ডার্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাংকের প্রথম অফিস ছিল সে সময়ের বিখ্যাত ঔষধ ব্যবসায়ী মহেষ ভট্টাচার্যের একটি খালি গ্যারেজ। বটকৃষ্ণ দত্ত ভ্রাম্যমান বা মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে মধ্য ও নিু বিত্তদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতেন। এই ব্যাংকের শাখা আসামে শিলচরেও স্থাপন করা হয়েছিল। জমিদারি ছেড়ে ইন্দুভূষণ দত্ত ও তার ভাই ব্যারিষ্টার ড. শান্তিভূষণ দত্ত ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংক। একই সময় অখিল দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন পাইওনিয়ার ব্যাংক। ১৯১৮ সালে বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন নামী অডিট ফার্মের মালিক জ্যোতিষ চন্দ্র দাশ। কুমিল্লার উত্তর পাড়ার রাজা প্যারীমোহনের বংশধর ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন হুগলী ব্যাংক। এসময়েই নোয়াখালীর কে এল দালাল প্রতিষ্ঠা করেন নাথ ব্যাংক। ময়মনসিংহের রবি রায় দালালের মেয়েকে বিয়ে করে এই ব্যাংকের পরিচালক হন। আরও পরে চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজের অধ্য কামালউদ্দীন প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামাবাদ টাউন ব্যাংক অব চিটাগাং। এছাড়াও চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ইসলাম পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন কমরেড ব্যাংক। ফরিদপুরের এ.টি.এম শহিদুল ইসলাম ও কলকাতা কর্পোরেশনের এককালীন মেয়র জাকারিয়া প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ার ক্রিসেন্ট ব্যাংক।

দেশ বিভাগঃ ব্যাংক একীভূত ও একত্রীকরণের উদাহরণ

দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলো ভালই চলছিল। ১৯৮৭ সালের পর থেকে বাঙালীর ব্যবসায় নেমে আসে দুর্যোগ। ১৯৫০ সালের দিকে নাথ ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। ছোট ছোট ব্যাংকগুলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একীভূত হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে নিউ ষ্টান্ডার্ড ব্যাংক কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশনের সাথে একত্রিত হয়। ১৯৫০ সালের পর কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন, কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংক, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংক ও হুগলী ব্যাংক একত্রিত হয়ে ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় রূপান্তরিত হয়। সার্বিকভাবে বলা যায় দেশবিভাগের আগে প্রতিষ্ঠিত বেশীরভাগ ব্যাংকই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বেশীরভাগ একত্রীত হয়ে ভারতেই রয়ে যায়, বাকীগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়।
দেশ বিভাগের পর নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসে ব্যাংক প্রতিষ্ঠায়। ১৯৪১ সালে বোম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হাবিব ব্যাংক দেশ বিভাগের পর তার প্রধান কার্যালয় নিয়ে আসে করাচীতে। এর আগ থেকেই পাকিস্তানে ছিল অষ্ট্রেলিশিয়া ব্যাংক। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর। ধীরে ধীরে পাকিস্তানে আরও অনেক ব্যাংক গড়ে উঠলেও এর মালিকানায় ছিল পাকিস্তানীরাই।
পাকিস্তানে আংশিক মালিকানায় প্রথম বাঙালীদের উদ্যোগে গড়ে উঠা প্রথম ব্যাংক ছিল ইষ্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার তারিখ ছিল ১৯৫৯ সালের ১১ মে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ছিল চট্টগ্রামে। এই ব্যাংকই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম তফসিলী ব্যাংক। সরকারী সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন এ. কে. খান এন্ড কোম্পানীর পে শিল্পপতি এম.আর. সিদ্দিকী, চা ব্যবসায়ী খান বাহাদুর মুজিবুর রহমান, ব্যবসায়ী মির্জা মোহাম্মদ আলী ইস্পাহানী, বগুড়া কটন স্পিনিং কোম্পানী লিমিটেডের হাবিবুর রহমান এবং পাবনার এডর"ক ল্যাবরেটরীর এ. এইচ খান। ১৯৭০ সালে ব্যাংকটির মোট শাখা ছিল ১০৫টি ও মোট আমানত ছিল ৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ বাঙালী মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম ব্যাংক ছিল ইষ্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশন। ১৯৬৫ সালের ২৮ জানুয়ারী ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাংকটি নাথ ব্যাংকের শাখা ও দায়দায়িত্ব অধিগ্রহণ করেছিল। ব্যাংকের প্রধান প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার আবদুর জব্বার এবং গফরগাঁও-এর ক্যাপ্টেন জগদীশ দেবনাথ। ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদে আরও ছিলেন, এন হামিদুল্লাহ, আহমেদুল কবির, নূরুল আমিন, মুক্তিযুদ্ধে নিহত ব্যবসায়ী সাঈদুল হাসান প্রমুখ। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ব্যাংকের শাখা ছিল ৫৭টি ও আমানত ২৮ কোটি টাকা। এই ব্যাংকদুটো ছিল মূলত অনেক ছোট। সে সময় মোট ব্যাংক ব্যবসার বেশীর ভাগই নিয়ন্ত্রণ করতো পাকিস্তানি ৪৩টি পরিবার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো।
স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ ছিল খুব সামান্যই। তবে এসময় প্রয়োজনীয়তা যে দেখা যায়নি তা নয়। বিশেষ করে কুমিল্লা ঘটনায় সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। কেননা কুমিল্লায় ব্যাঙের ছাতার মত ব্যাংক গজিয়ে ওঠা এবং দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারী বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেসময়ই ব্যাংকের তফসিলীকরণ-এর উদ্যোগ নেয়া হয়। আবার এ সময়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোগে ঋণ দেয়া শুরু করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। আরেকটি নিয়ম করে দেয়া হয়েছিল কোন ব্যাংক শহর এলাকায় ৩টি শাখা স্থাপন করলে পল্লী অঞ্চলে খুলতে হবে একটি। পরবর্তীতে নিয়ম করা হল শহরে ২টা খুললে গ্রামে খুলতে হবে একটি। এই বিধি অবশ্য ভাল ভাবেই কার্যকর হয়েছিল।

ছবি: এখনও চালু বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো ব্যাংক।

 

 

  • ১৩ টি মন্তব্য
  • ১৭৩ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৪ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২২
comment by: শওকত হোসেন মাসুম বলেছেন: প্রথম পর্ব
Click This Link
২. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২২
comment by: সারিয়া তাসনিম বলেছেন:
মাসুম ভাই , অনেক বড় , এট্টু পরে পড়ুম ।
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৮

লেখক বলেছেন: ঠিকাছে

৩. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৩
comment by: মৈথুনানন্দ বলেছেন: কবে যে সুইস ব্যাঙ্কে আকাউন্ট খুলতে পারবো! :(
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৯

লেখক বলেছেন: কবে যে............

৪. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৭
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: পড়ছি।
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪৬

লেখক বলেছেন: চলবে

৫. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৭
comment by: মিরাজ বলেছেন: পড়লাম । এবার পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা ।
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:১৫

লেখক বলেছেন: আসছে

৬. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০৪
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: প্রবাসী+ দ্বি-নাগরিকরা কি ১০০% শেয়ার মালিকানায় ব্যাংক কিনতে পারবে ?
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:২০

লেখক বলেছেন: আইনগত বাধা নাই। তবে এখন তো নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।

৭. ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:২৪
comment by: মেসবাহ য়াযাদ বলেছেন: আমার কাছে ৫০ কোটি পয়সা আছে। আমি সুইস ব্যাংকে একাইন্ট করুম...কারো কোনো আপত্তি আছে ??
২৭ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৮:০০

লেখক বলেছেন: নাই

 



 


লেখালেখি ছাড়া জীবনে আর কিছু শিখি নাই। আর শিখেছি গান শুনতে, ছবি দেখতে আর বই পড়তে।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৫৯৩৬৯