স্বাধীন বাংলাদেশঃ নতুন করে পথ চলা
১৯৭২ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার বিদেশী ব্যাংক বাদে সকল ব্যাংক জাতীয়করণ করে। সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোন ছাড়াও সময়ের প্রয়োজন মেটাতে এ ছাড়া আর বিকল্প কোন পথ ছিল না বলেই অনেকে মনে করেন। পাল্টা যুক্তি থাকলেও তা তেমন জোড়ালো নয়। কেননা দু’টি ব্যাংক ছাড়া বাকী সকল ব্যাংকের মালিকানা ছিল পাকিস্তানীদের। ফলে সরবকারকেই ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বাজেট বক্তৃতায় এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সমাজতন্ত্র কায়েম ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের পথে এ বছরের মার্চ মাসে সকল দেশীয় ব্যাংকের রাষ্ট্রায়ত্বকরণ এক বিরাট পদপে। গত ৬ মাসে ব্যাংক আমানত ১২৫ কোটি টাকারও বেশী হয়েছে অর্থাৎ শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশী বেড়েছে। কোন সমর্থন বা রিজার্ভ ব্যতীত আমরা বাংলাদেশে প্রচলিত সাবেক পাকিস্তান সরকারের ৩৫৮ কোটি টাকার দায় গ্রহণ করেছি। এ প্রচলিত মুদ্রাংকের সমর্থনে ব্যবহৃত স্বর্ণ ও অন্যান্য জামানত করাচীতে সংরণ করা হত বলে আমরা এ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। ষ্টেট ব্যাংকের সম্পদসহ সাবেক পাকিস্তানের সকল সম্পদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আমরা সর্বাত্বক চেষ্টা করব।’
পাকিস্তানী মালিকদের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নিয়ে গঠিত হয় সোনালী ব্যাংক। মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অষ্ট্রেলিশিয়া ব্যাংক ও ষ্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নিয়ে গঠিত হয় রূপালী ব্যাংক। হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক নিয়ে গঠিত হয় অগ্রণী ব্যাংক এবং ইউনাইটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক নিয়ে গঠিত হয় জনতা ব্যাংক। অন্যদিকে ইষ্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নিয়ে গঠিত হয় পূবালী ব্যাংক ও ইষ্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশনের সম্পদ ও দায় নিয়ে গঠিত হয় উত্তরা ব্যাংক। জাতীয়করণ করার সময় ৬টি ব্যাংকের মোট শাখা ছিল প্রায় ১১শ’ এবং আমানত ছিল প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা।
১৯৭৬ সাল থেকেই সরকার রাষ্ট্রায়ত্বকরণের পথ থেকে সরে আসে। এর পরিবর্তে পুঁজি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এজন্য অপক্ষা করতে হয় ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। এ বছরের ৩০ জুনের মধ্যে উত্তরা ও পূবালী ব্যাংককে কোম্পানীতে রূপান্তর করে ব্যাংক দু’টির পূর্বতন মালিকদের অগ্রাধিকার দিয়ে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও আরও ৬টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। যেমন এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউসিবিএল, ন্যাশনাল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে অবশ্য আইএফআইসি ১৯৭৬ সাল থেকে বিনিয়োগ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সংস্কারের উদ্যোগঃ এরশাদ জমানা
সামরিক শাসন জারী করার পর জেনারেল এরশাদ ব্যাংক থেকে বৃহৎ ঋণ গ্রহীতাদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তাতে যে তথ্য বেড়িয়ে এসেছিল তা ছিল অতি চমকপ্রদ। কেননা ১৯৮২ সালের মধ্যে অর্থাৎ অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যেই একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বড় অংকের ঋণ নিয়ে খেলাপীতে পরিণত হয়ে পড়ে। জেনারেল এরশাদ অবশ্য এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন কোন সদুদ্দেশ্যে নয়, বরং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য। এরশাদ মতা পাকাপোক্ত করার জন্য এসব ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করেছিলেন। তবে বিপত্তি দেখা দেয় ঋণ খেলাপীদের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায়। ফলে বিষয়টি নিয়ে সেসময় ব্যাপক আলোচনা হতে থাকে। বাধ্য হয়ে সরকার গঠন করে ঋণ, অর্থ ও ব্যাংকিং কমিশন। কমিশন তাদের রিপোর্ট দিয়েছিল ১৯৮৬ সালে। কমিশন যে বিষয়গুলো নিয়ে সুপারিশ করে তা হল; বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক হার, পুনঃঅর্থায়ন নীতি, খেলাপী ঋণ, পল্লী ও অঞ্চলে ও কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারী ব্যবস্থার সমস্যা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক জালিয়াতি। কমিশনের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালে দেশে আসে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ মার্গ ট্রয়েড। এরশাদের সময় সংস্কার উদ্যোগ এ পযন্তই। বরং এসময় উল্টো ঘটনাই ঘটতে থাকে। ১৯৮৬ সাল থেকে ৯০ পর্যন্ত শিল্প খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ শতাংশ। এসময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমেদ জনসভা করে ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছিলেন। উদ্যোক্তা সমাবেশ, ঋণ মেলা করে ব্যাপক ভাবে ঋণ বিতরণের ফল হচ্ছে খেলাপী ঋণের ব্যাপক বৃদ্ধি। সত্যিকার অর্থেই আর্থিক খাত এ সময়ে ছিল বিপর্যস্থ।
প্রথম পর্ব-
Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব-
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

