somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যাডেট কলেজ জীবন: বাধাকপি, চিকেন পক্স আর নীল ছবির গল্প

০৩ রা নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
সেবার আমাদের ক্যাডেট কলেজের খোলা জায়গায় বাধাকপি লাগানো হলো। হয়েছিল বাম্পার ফলন। যেদিকে তাকাই খালি বাধাকপি আর বাধা কপি। দেখলে চক্ষু জুড়ায় না, আতঙ্কে বুক কাপে। কে খাইবো এতো বাধাকপি।
আতঙ্ক যে সঠিক দ্রুতই তার প্রমান পাওয়া গেলো। সকালে আমাদের দেওয়া হতো তিনদিন পাউরুটি আর তিনদিন পরোটা। আমরা দেখলাম পরোটার সাথে বাধাকপি ভাজি। আর যেদিন পাউরুটি সেদিন বাধাকপি সেদ্ধ উপরে গোলমরিচ দেওয়া। ১০টায় ছিল টিফিন ব্রেক। মানে হলো এক কাপ দুধ আর সাথে সিঙ্গারা, গজা বা এই জাতীয় কিছু। নতুন যুক্ত হলো বাধাকপি সিদ্ধ। দুপুরে ভাতের সঙ্গে বাধাকপি ভাজি, মাংস থাকলে সেটাও বাধাকপি দিয়ে রান্না করা। এমনকি একদিন অবাক বিষ্ময়ে দেখলাম ডালের মধ্যেও বাধাকপি। রাতের খাবারেও একই মেনু। এই যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে ক্ষেতে যতদিন বাধাকপি ছিল ততদিন।
সেই যে আমি বাধাকপি খাওয়া ছেড়েছি আজ অব্দি আমি খাইনি। এখনও বাধাকপি দেখলে আমার অসহ্য লাগে। আমি খাই না।

২.
আমি ছিলাম শরিয়তউল্লাহ হাইসের। আর আদিল শেরে বাংলা হাউসে। পরেরদিন টেস্ট পরীক্ষা, সম্ভবত ইংরেজি। কী কারণে যেন হাউসেই প্রেপ। (আমাদের পড়তে যেতে হতো যার যার কাশ রুমে। হাউসে কোনো পড়ালেখার নিয়ম ছিল না।) কী একটা কাজে আমি গেলাম আদিলের রুমে। পাশের রুম থেকে আসলো মুজিবর আর জাহিদ। সোহরাওয়ার্দী হাউস থেকে আসলো জাকির। আরো আসলো আমার হাউসের মঈন ও বুলবুল। এভাবে দেখা গেল ১৫ জনের মতো একই রুমে, কোনো কারণ ছাড়াই।
রেহাই পাওয়া গেলো না। প্রিন্সিপাল স্যার হাউন ভিজিট করছেন আমাদের জানা ছিল না। এক রুমে সবাইকে পেলেন তিনি। সবাই এক রুমে মানেই আমরা কোনো এক ষড়যন্ত্র করছি। হয় পালাবো না হয় ক্যাডেট কলেজ বিরুদ্ধ কিছু একটা। কিছুতেই বিশ্বাস করানো গেলো না যে আমাদের কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না।
আমাদের নেওয়া হলো প্রশাসনিক বিল্ডিং-এ। একজন একজন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। তারপর নেওয়া হলো মাঠে। সেই রাতে এক্সট্রা ডিল। যারা ক্যাডেট কলেজে পড়েননি তারা জানবেন না এটা কি। একটু বলি-যাও এক দৌড়ে দেওয়াল ছুয়ে আসে। আসা মাত্র ফ্রন্ট রোল, তারপর আবার ফ্রগ জাম্প। এই রকম চলতেই থাকে। সেই আদিল আমেরিকায়। মঈন লে. কর্ণেল। বুলবুল আইন মন্ত্রণালয়ে। জাকির জাজ। রেজা গ্রামীণ ফোনে।

৩.
আমাদের সপ্তাহের একদিন সিনেমা দেখানো হতো। বৃহস্পতিবার। অডিটরিয়ামে চলতো সিনেমা দেখা। কখনো বাংলা, কখনো ইংরেজি ছবি। সাগরিকা দেখানো হয়েছিল। আমরা তখন টুয়েলভ কসে (ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার)। সেভেন বসতো সবার আগে। আর সব শেষে আমরা। আমাদের পেছনে স্যারদের ছেলে মেয়েরা। তারও পিছনে স্যাররা।
সেবার দেখানো হবো ইংরেজি ছবি। আমরা চুপচাপ শৃঙ্খলা রেখে বসে আছি। ছবি শুরু হল। মারামারির ছবি। ছবি চলতে চলতে হঠাৎ দেখি ছবির সঙ্গে একদমই সম্পর্ক নাই এমন দৃশ্য। নীল ছবি। কাট-পিস। একদম পুরো নীল। আমরা তো চোখ বড় বড় করে দেখছি। স্যাররা হতভম্ব। আমার চোখ আবার চলে যায় ঠিক আমাদের পিছনে। যে প্রজেক্টর চালাচ্ছিল সে বুঝতে পারছে না কী করবে। প্রথমে এক হাত রাখলো প্রজেক্টরের সামনে। তাও তেখা যাচ্ছে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে। তারপর দেখি দুই হাত। তাও দেখা যাচ্ছে। এই বার সে বুঝলো বন্ধ করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তারপর অনেকদিন আমাদের সিনেমা দেখা বন্ধ ছিল। তদন্ত কমিটি হেন তেন অনেক কিছু হয়েছিল। সেই আমার প্রথম নীল ছবি দেখা।
৪.
তখনও ছুটি হতে ১৫ দিন বাকি। কী একটা কাজে প্রিন্সিপাল স্যার ও অ্যাডজুটেন্ট ঢাকায়। দায়িত্বে ভাইস প্রিন্সিপাল ও ডাক্তার (ক্যাপ্টেন)। আমাদের একটা হাসপাতাল ছিল, ১৭ বেডের। সেবার হঠাৎ চিকেন পক্স দেখা দিল। ১৭টা বেডই ভরে গেল রুগীতে। ১৮তম রুগীকে আর রাখার জায়গা নেই। তাকে দেওয়া হল ছুটি।
ব্যস তারপরই দেখা গেল মহামারি। প্রতি মিনিটে একজন করে আক্রান্ত হচ্ছে আর ছুটি নিয়ে লাফাতে লাফাতে বাসায় চলে যাচ্ছে। একটু পরেই বুঝে গেলাম আসল কাহিনী। মোমবাতি জ্বালিয়ে শরীরের যে কোনো জায়গায় একটা ফোসকা ফেলতে পারলেই হলো। আর্মির ডাক্তার সেইটারেই চিকেন পক্স মনে করে রুগি বানিয়ে দিচ্ছে। আমিও ভাবলাম চিকেন পক্সই হোক। রেজা আমার পিঠে ফোসকা ফেললো। তারউপর খাকি ড্রেস পড়ে গেলাম প্রশাসনিক ভাবনে। সব স্যাররা বসে আছেন চিকেন পক্স দেখার জন্য। আমি রুমে ঢুকে বললাম, বললাম আমার পিঠে চিহ্ন আছে। মাশুক স্যার বললেন জামা খুলতে।
আমি তখন কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট। ফলে ক্রস বেল্ট পড়তে হয়। ফলে খুলতে একটু সময় লাগে। খোলার চেষ্টা করতেই মাহফুজ স্যার বললেন থাক খুলতে হবে না। শওকত ভাল ছেলে, ও মিথ্যা বলবে না। কিন্তু রুমে এসে দেখি খাকি ড্রেসের ঘসায় ফোসকা উধাও। জামা খুললেই ধরা খেতাম। ভাল ছেলের সুনাম বাঁচিয়ে দিল। তারপরেই বাসায়।
সেবার এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। কলেজ বুঝে ফেলেছিল আমরা তাদের বোকা বানিয়েছি। তাগো বুদ্ধি হাটুতে থাকলে আমাদের কী করার আছে। ফলে আমরা ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়ে কলেজ খুলতেই হাজির হই। তবে প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে অনেক ঝাড়ি দিয়েছিলেন।
৫.
আমার সেই ক্যাডেট কলেজে আবার যাই গত বছর। সিটিব্যাংক এনএ কলেজকে কম্পিউটার দেবে। ব্যাংকের সিইও মামুন ভাই ফৌজদারহাট ক্যাডেটের। আমাকে বলতেই রাজী হয়ে গেলাম। অডিটরিয়ামটা ছিল আমার জায়গা। আমি ছিলাম কালচারাল প্রিফেক্ট। সেখানেই অনুষ্ঠান। আমিই একমাত্র প্রাক্তন ক্যাডেট। সবাই উপস্থিত, আমারা যেতাম সেভাবেই। অনুষ্ঠান শুরু, প্রিন্সিপাল স্যার বক্তৃতা দিলেন। মামুন ভাই কথা বললেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো বিশেষ অতিথি হিসেবে। সেই মঞ্চে আবার আমি উঠলাম। সেই অনুভূতি একদমই অন্যরকম। আমার কলেজ বরিশাল ক্যাডেট কলেজ।

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:০১
৫২টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×