যানজটে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানোই দায়। বছরে নস্ট হচ্ছে ঢাকাবাসীর ৪৫ কোটি শ্রমঘন্টা। আর্থিক ক্ষতি ১২ হাজার কোটি টাকা। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের এই ভয়াবহ ভোগান্তি নিয়ে কারোরই যেন কোনও মাথাব্যথা নেই। নেই কোনও সমন্বিত উদ্যোগ। শিগগিরই এর একটি বিহিত না করলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা অচল হয়ে পড়বে— এই আশংকা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিয়ে কাজ করা গবেষকদের।
মহানগরী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ যানজট প্রবণ শহর। এ যানজট রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে পাড়ার অলি-গলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। নিত্যদিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় সব রাস্তায় দেখা যায় যানজট।
রাজধানীর মগবাজার, ফার্মগেইট, মহাখালি, মতিঝিলের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো এখন যানজটের কারণে অনেক গণপরিবহনের চালকদের কাছে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। পুরো ঢাকাই এখন যানজটের গ্রাসে। ঢাকার উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম সব প্রান্তের মানুষকেই ভোগাচ্ছে এই নগর বিড়ম্বনা।
রাজধানীতে যানজটের কারণে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিবছর ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের এবারের জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে জ্বালানির অপচয় ও কর্মঘণ্টার হিসাব ধরে আর্থিক এ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীতে প্রতিদিন যানজটের কারণে যে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জ্বালানি ও সময় অপচয় হচ্ছে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ার কারণে এই ধরনের ক্ষতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে শুধু অর্থই নয় সঙ্গে সঙ্গে সময়, উৎপাদন ও মানুষের উদ্যম নষ্ট হচ্ছে।
বিশেজ্ঞরা বলছেন, নগর পরিকল্পনা ও পরিবহন পরিকল্পনাকে সমন্বয় করে যানজট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ঢাকা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে অপরিকল্পিত একটি শহর। আর যানজটের মূল ও প্রধান কারণই হলো এই অপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা।
মহানগরীতে যানজটের কারণ হিসেবে প্রধানত রাস্তাঘাটের স্বল্পতা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, বেপরোয়া ও এলোমেলোভাবে গাড়ি চালানো, বাড়তি যাত্রীর আশায় ধীরগতিতে গাড়ি চালানো, নগরবাসীর হাঁটার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা, ট্রাফিক আইন না মানা প্রভৃতিকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যানজটের এই কারণগুলোকে দূর করতে পারলে সমস্যার ইতিবাচক সমাধান সম্ভব হবে।
ঢাকার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ মানুষ বর্তমানে পায়ে হেঁটে চলাচল করছে। নগরীতে হাঁটার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধাগুলো বাড়ানো গেলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। ঢাকার ফুটপাতগুলোর অবস্থা এমনই করুণ যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষকে হাঁটতে অনুৎসাহিত করে। ফুটপাতগুলো দিনে দিনে অবৈধ দখলদারদের দখলে চলে যাচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও এসব ফুটপাতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে নির্মাণ সামগ্রী।
যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং রাজধানীর যানজটের বড় একটি কারণ। ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে শহরের প্রধান প্রধান রাস্তায় জায়গা দখল করে গাড়ি পার্কিং করার দৃশ্য একটি নিয়মিত ব্যাপার।
নগরীর যেসব মানুষ যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণ-পরিবহন ব্যবহার করেন তার ৮৫ শতাংশই বাস-মিনিবাস ব্যবহার করেন। রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজার বাস-মিনিবাস চলছে। যেগুলোর বেশিরভাগেরই রয়েছে ফিটনেস সমস্যা। আবার অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ চালকরা এই গাড়িগুলো চালাচ্ছে। এলোমেলো ও বিশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে এই চালকেরা সৃষ্টি করছে যানজটের।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজধানীর যানজট সমস্যার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এছাড়া শহরের ওপর চাপ কমাতে এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এজন্য সারা দেশে অফিস-আদালত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ছড়িয়ে দেয়ার ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। শহরের জনসংখ্যা কমলে স্বাভাবিকভাবে যানবাহনের সংখ্যাও কমবে। সেক্ষেত্রে যানজট পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
তথ্যসূত্রঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


