দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত বাংলা নামের ছবি ‘বান্ধবী’ চমক সৃষ্টি করেছে চলচ্চিত্র মহলে ৷ পরিচালক শিন ডং ইল অভিবাসী এক বাঙালি যুবকের আশা আকাঙ্ক্ষা, এক কোরিয়ান মেয়ের সঙ্গে সেই যুবকের হৃদ্যতার কথা তুলে ধরেছেন তাঁর এই ছবিতে। সেই সাথে অভিবাসী জীবনের নানারকম সমস্যা, দুঃখ কষ্টের কথাও ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
১৭ বছরের হাইস্কুলগামী ছাত্রী মিন সেও মায়ের সঙ্গে বাস করে ছোট্ট এক বাসায়। মায়ের পুরুষ বন্ধুও থাকে তাদের সঙ্গে। তাকে একেবারেই পছন্দ নয় মিন সেওর৷ স্পষ্টবাদী এই তরুণী মুখের ওপরই মায়ের অযোগ্য প্রেমিককে জানিয়ে দেয় তার অপছন্দের কথা। কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মিন সেও, কথা বার্তায় রুক্ষ মনে হলেও মনটা কিন্তু তার নরম। পরিবারের বোঝা হতে রাজি নয় এই মেয়ে। ভাল কোনো চাকরির আশায় ইংরেজি ভাষা কোর্সে ভর্তি হয় সে। খরচ জোগাড়ের জন্য পাশাপাশি ছোট খাট কাজও শুরু করে। খুব ভালভাবে না হলেও দিন কেটে যাচ্ছিল তার৷ কিন্তু হঠাৎ
এক ঘটনায় প্রায় অজানা এক জগৎ-এর সঙ্গে পরিচয় হয় এই তরুণীর। একদিন এক ওয়ালেট কুড়িয়ে পায় সে। টাকাটা খরচ করার অদম্য ইচ্ছাও হয়। কিন্তু তার আগেই ধরা পড়ে যায় ওয়ালেটের মালিক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক করিমের হাতে।
পুলিশের কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় মিন সেও৷ পরে এক শর্তে রফা হয়৷ করিমের আগের কর্মক্ষেত্রের মালিক তাকে এক বছরের বেতন না দিয়েই উধাও হয়েছে৷ বৈধ কাগজপত্র না থাকায় করিমকে এক মাসের মধ্যে কোরিয়া ছাড়তে হবে, তাই এই টাকাটা তার পাওয়া চাইই৷ মিন সেওর দায়িত্ব হল সেই মালিককে খুঁজে বের করা৷ উপায়ান্তর না দেখে রাজি হয়ে যায় সে৷
এক অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই তরুণ তরুণীর মধ্যে পরিচয় হলেও বন্ধুত্ব হতে দেরি হয় না তাদের মধ্যে। যদিও দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ তারা। স্বভাবের দিক দিয়েও তেমন কোনো মিল নেই। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মিন সেও পারিবারিক অশান্তি সত্ত্বেও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। আর ২৮ বছর বয়সী করিম ভাগ্যের সন্ধানে দেশ ছেড়েছে। বেছে নিয়েছে শ্রমিকের জীবন৷ যে জীবনে স্বপ্ন দেখার কোনো
অবকাশও যেন নেই। তাই মেয়েটির ছেলেমানুষের মত প্রশ্ন শুনে মাঝে মাঝে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সে। দেখিয়ে দেয় কোরিয়ার সমাজের দোষ ত্রুটি।
ছবিতে বর্ণবৈষম্য, শ্রেণীবৈষম্য, অভিবাসী শ্রমিকের সমস্যার মত অস্বস্তিকর বিষয়গুলো তুলে ধরা হলেও তাতে রয়েছে খানিকটা হালকা রসের ছোঁয়া।
মিন সেওর ভূমিকায় কোরিয়ার উঠতি টিনএজ তারকা ব্যাক জিন হি এবং করিমের ভূমিকায় মাহবুব আলম পল্লবের অভিনয় দর্শকদের ভাল লাগবে। মাহবুব কোরিয়ান ভাষা জানেন, তাই চরিত্রের প্রয়োজনে কোরিয়ান ভাষায় সংলাপ বলতে অসুবিধা হয়নি তাঁর।
৯০-এর দশকের গোড়া থেকে কোরিয়ায় অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার সাথে সাথে বিদেশী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আজ এই সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ সাফল্য ও অর্থের মুখ দেখলেও অনেককেই কঠোর সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হয়। তাদেরই একজন করিমের চরিত্রে রূপদানকারী বাংলাদেশী যুবক মাহবুব আলম। কিছুদিন আগেও যিনি ছিলেন নাম না জানা বিদেশী শ্রমিকদেরই একজন। আজ তাঁর সাচ্ছল্য ও সম্মান দুটোই আছে। কিন্তু অহমিকা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। অভিবাসী জীবনের দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনার স্মৃতি ভুলতে পারেননি মাহবুব। এই অবহেলিত মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করার তাড়না অনুভব করেন তিনি সব সময়। তাই তিনি সম্পৃক্ত হয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে, যারা বিদেশী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট। যুক্ত হয়েছেন চলচ্চিত্র জগৎ-এর সঙ্গে। অভিনয় ও পরিচালনা দুটোই করছেন এই তরুণ। তুলে ধরছেন অভিবাসী জীবনের দুঃখ কষ্টের কথা। আয়োজন করছেন অভিবাসী শ্রমিকদের চলচ্চিত্র উৎসবের।
মাহবুব মনে করেন, অভিবাসীরা কোরিয়ান সংস্কৃতিকে তেমন আপন করে নিতে পারেননি। কোরিয়ান ভাষা শেখার ব্যাপারেও খুব একটা আগ্রহ নেই তাদের। অন্যদিকে কোরিয়ান জনসাধারণ সন্দেহ , অবজ্ঞা ও করুণার চোখে দেখেন বিদেশীদের। আর এসব দূর করতে হলে দুই জনগোষ্ঠীরই পরস্পরের কাছে এগিয়ে আসতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে সৌহার্দ্যের হাত।
তথ্যসূত্রঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


