এ বছরে বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে আরবী সাহিত্য চোখ কেড়েছিল সবার। বিশেষ করে নারী চালিত একটি সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল বহু বুদ্ধিজীবির মাথা। সেই পত্রিকাটির নাম - ‘‘জাসাদ’’। অর্থাৎ - শরীর।
আরব সাহিত্যে অনেক কিছু এসেছে। কিন্তু মেয়েদের খুব ঘনিষ্ঠ, অন্তরঙ্গ দিকগুলি স্থান পায়নি এতোদিন। নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন, আকাঙ্খা - এগুলি এতোদিন কিন্তু উপেক্ষিতই হয়েছে। শুধু তাই নয়, মেয়েদেরও যে কিছু ব্যক্তিগত চাহিদা থাকতে পারে - তার খোঁজ এতোদিন নেওয়া হয়নি। কেন না, মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু জিনিসই যেন নিষেধের বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছিল। অন্ততপক্ষে আরব বিশ্বে। অবশ্য এবার, জাসাদ-এর মাধ্যমে শুধু নারীর গোপন ইচ্ছাগুলিই নয়, আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে যৌনশিক্ষার মতো বিতর্কিত বিষয়ও।
অতীতে আরব বিশ্বে স্যাটিলাইট টিভি চ্যানেলে যৌন বিষয়ক অনুষ্ঠান অবাধে প্রচারিত হতে দেখা যেত। কিন্তু, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ইসলামী যৌনশিক্ষাবিদরা টেলিফোনের মাধ্যমে দর্শকদের যৌন বিষয়ক প্রশ্নগুলির উত্তর ও সমস্যার সমাধান দেওয়ার পাশাপাশি, ইসলামের আদর্শ ও শরিয়ত অনুযায়ী ইসলামসিদ্ধ যৌনজীবন সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতেন সরাসরি।
কিন্তু আজ, এই যৌনতা বিষয়ক পত্রিকা ‘‘জাসাদ'' লেবানন থেকে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলিতে। বিনা বাধায় আরবি ভাষায় প্রকাশিত এমন একটি পত্রিকা পৌঁছে যাচ্ছে পাঠকদের হাতে। বহু স্পর্শকাতর বিষয় থাকলেও পত্রিকাটিকে কিন্তু কৌতূহল ও আগ্রহের সঙ্গেই গ্রহণ করতে শুরু করেছে মানুষ। আর সেখানেই, মাত্র এক বছর আগে প্রথম প্রকাশিত এই পত্রিকাটির জয়। জয় জাসাদ-এর সঙ্গে জড়িত কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিকদেরও।
ছবিঃ জুমানা হাদাদ।
পত্রিকাটির প্রকাশক জুমানা হাদাদ জানালেন, ‘‘আমি যখন পত্রিকাটি শুরু করি, তখন আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল - তথাকথিত ট্যাবুগুলি ভেঙে দেওয়া। আরবি ভাষা ও সংস্কৃতিকে আমি সব রকম শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলাম। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে এ ধরণের বাধ্যবাধকতা ছিল না। আমরাই প্রথম আমাদের কামনা, বাসনা প্রকাশ করেছিলাম৷ সব বাধা ভেঙে ফেলে শরীরের সুপ্ত চাহিদার জানালা খুলে দিয়েছিলাম লেখায়। কিন্তু ইতিহাসের কোন এক সন্ধিক্ষণে সব কিছু যেন হঠাৎ করেই বদলে গেল৷ চাপিয়ে দেওয়া হলো বাধা-নিষেধের বেড়াজাল৷ এখন সে কথা ভাবলে আমার মনে দুঃখ, ক্রোধ - দুটোই একসঙ্গে জেগে ওঠে৷ এই বেড়াজাল ভাঙতে আমি সবকিছু করতে প্রস্তুত।''
আজ জুমানা হাদাদ-কে দেখলে ঠিক যেন মনে হয়, তিনি আরব্য রজনীর গল্পের পাতা থেকে উঠে এসেছেন। যেন এক রাজকন্যা৷ যেন আধুনিক যুগের শাহজাদী। পরনে আঁটোশাটো পোশাক, সুন্দর কেশ বিন্যাস আর তার সঙ্গে প্রসাধনের হাল্কা আভা। জুমানা বললেন, আরব্য রজনীর গল্প যখন সাহিত্যের ইতিহাসে স্থান পেয়েছিল, শরীর ও মনের কামনা বাসনার রঙিন দিকগুলি উঠে এসেছিল গোটা বিশ্বের সামনে।
আর হারিয়ে যাওয়া সেই চেতনার জগৎ ফিরে পেতেই জুমানা বেছে নিয়েছিলেন তাঁর এই পত্রিকাটি। জুমানার কথায়, ‘‘আমরা সব ধরণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করি পত্রিকাটিতে৷ বিষয়বস্তু নির্বাচনে আমাদের কোন রকম বাধা-নিষেধ নেই। সমকামিতা, যৌন নির্যাতন, যৌন অসুস্থতা, সঙ্গম বিষয়ক সমস্যা, পারিবারিক সম্মানহানির ফলে হত্যার ঘটনা - সব রকম নিষিদ্ধ বিষয় নিয়েই লেখা প্রকাশ করি আমরা। তবে শুধু নারী নয়, বিষয় হিসেবে পুরুষ, পুরুষতন্ত্রও স্থান পায় আমাদের লেখায়। যেমন পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংখ্যায়, মূল বিষয়বস্তু হিসেবে আমরা বেছে নিয়েছিলাম পুরুষাঙ্গকে। সে সংখ্যায় পুরুষাঙ্গ সাহিত্যে, শিল্পকলায়, স্থাপত্যে - কিভাবে ব্যবহৃত বা উল্লেখিত হয়েছে তা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছিল৷ আলোচনা ছিল পুরুষলিঙ্গ কিভাবে শক্তির বা উৎসের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়ে থাকে - সে বিষয়টি, এমনকি তার রাজনীতি নিয়েও। আর স্বাভাবিকভাবেই, এটা আরব বিশ্বে হৈ চৈ ফেলে দেয়। সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি, পত্রিকাটি বন্ধ করার জন্য হুমকিও দেওয়া হয় আমাকে। কিন্তু আমি হার মানি নি, আমি জানতাম, এমন অনেক সমমনা মানুষ আছেন, বহু নারী আছেন - যারা আমার সঙ্গে রয়েছেন। যারা আমার সঙ্গে একমত।''
জুমানা কিন্তু হঠাৎ করে এই পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন নি। জুমানা বারে বারে দেখেছিলেন, কিভাবে যৌনতা সম্পর্কিত কিছু তুচ্ছ ঘটনা, অজ্ঞতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের অভাব পুরুষতন্ত্রের নামে বহু ক্ষেত্রে দাম্পত্য কলহ অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে ওঠে। তাই জুমানার কাছে অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নারী-পুরুষ বিষয়ক সামাজিক ট্যাবুগুলিকে সাহিত্য, কলা, সংগীত, ভাস্কর্যের মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরাকেই আবশ্যিক মনে হয়েছিল।
আর তার জন্য নিজ সঞ্চিত অর্থ ব্যায় করতেও পিছ পা হননি তিনি। জুমানা বললেন, ‘‘বিজ্ঞাপনের মধ্যে, সেই জগৎ-টার মধ্যে আমি শরীরের প্রাধান্য, তার একতরফা উপস্থিতি উপলব্ধি করেছিলাম। বারে বারেই মনে হয়েছিল - আমরা যাই কিনি না কেন, কিভাবে যেন তার মধ্যে নারী শরীরকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। সাবানের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে রান্নার তেলের বিজ্ঞাপনে - সে দেশি বিদেশি যাই হোক না কেন - তাতে আমি যেন পুরুষতন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছিলাম। তাই চেষ্টা করেছিলাম গতানুগতিক বিজ্ঞাপনের জগৎ নয়, ইউরোপের কোন সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা আদায় করার। একবার নয়, দু-দুবার এ চেষ্টা করে আমি ব্যর্থ হই। আমার মনে হয়েছিল আরবি ভাষায় এহেন একটা পত্রিকা প্রকাশে সহযোগিতা করার ব্যাপারে তারা ভয় পাচ্ছে। কিন্তু পত্রিকাটি একবার প্রকাশের পর বিক্রি বেশ ভাল হওয়ায়, পত্রিকাটি চালাতে এরপর আর কোন অসুবিধা হয়নি।''
আর সেটাই দিনে দিনে জুমানাকে আরো সাহসী করে তুলতে সাহায্য করেছে। সে জন্যই নিষিদ্ধ নারী লেখক আলাভিয়া সোভ-এর লেখাও আজ প্রকাশ হচ্ছে জাসাদ-এ। শুধু নারীদের লেখাই নয়, প্রকাশিত হচ্ছে পুরুষদের লেখাও। বাধা-ধরা নিয়মকে ভেঙে নারীদের পাশাপাশি প্রকাশিত হচ্ছে পুরুষের কল্পনা, নারী বিষয়ক যৌন বাসনা, তাদের সমস্যা, এমনকি নারীকে তারা কিভাবে দেখেন - সেই ভাবনাগুলিও। সম্প্রতি আলাভিয়া সোভ-এর একটি লেখায় নারীদেহের সমস্ত খুঁটিনাটি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি আলোচনা করেছেন বিভিন্ন বয়সের যৌন সমস্যা, আশা-আকাঙ্খা, এমনকি গর্ভকালীন সঙ্গম-এর মতো বিষয় নিয়েও। তবে শুধু যৌনতাই নয়, নারী-পুরুষের মনন নিয়ে, তাদের চিন্ত-ভাবনাগুলি নিয়েও লিখেছেন সোভ। তাঁর নতুন বই-টির বিষয়বস্তু তাই অচিরেই হয়ে উঠেছে - ভালোবাসা।
তবে জুমানার মতো পুরুষতন্ত্রের দিকে অঙ্গুলি প্রদর্শন বা সমাজে নারীর উন্নয়ন সোভ-এর লক্ষ্য নয়। সোভ জানান, ‘‘নারী স্বাধীনতা নয়, শিল্প-ই আমার লক্ষ্য। তবে আমি যাই লিখি, সমাজে তার একটা প্রভাব তো পড়েই। আমার নারী চরিত্রগুলি কোন না কোন ভাবে লেবাননের মেয়েদের প্রতিবিম্ব হয়ে ধরা পড়ে। আমি আমার চারি দিকে যা দেখি, যা শুনি এবং যা অনুধাবন করি - সেই বিষয়গুলি নিয়েই লিখি আমি। আমি কোন রকম বিধি-নিষেধের ধার ধারি না। আমি নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে যেমন লিখি, তেমনই তাদের শরীর, অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলি নিয়েও লিখি। ঠিক যেভাবে বিষয়গুলি আমার মনে উঠে আসে, ঠিক যে ভাষায় আমি নিজে কল্পনা করি - লিখিও ঠিক সেই ভাষায়। কোন রাখ-ঢাক ছাড়াই। আর সে কারণেই যারা ক্ষমতায় অসীন, তারা আমার লেখাকে ভয় পান। তারা ভয় পান সত্যের মখোমুখি হতে৷ ভয় পান ধর্মীয় ও যৌন ট্যাবুগুলিকে ভেঙে, গুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসতে৷ সেটা যে সহজ কাজ নয়।''
তথ্যসূত্রঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



