গোটা বিশ্ব থেকে আগামী এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৩ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত শ্রীলংকার কাছে গভীর সমুদ্রে সাবমেরিন কেবলের মেরামত কাজ চলবে। সে সময় এখানকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সব ধরনের টেলিযোগাযোগ এক রকম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কয়েক দিন আগেই সাবমেরিন কেবল কোম্পানি সি-মি-উই-৪ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে জানিয়েছে। তবে এ সময়ে পূর্বদিকের দেশগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগ ঠিক থাকবে।
একই সময়ে 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে দাঁড়িয়েছে ভি-স্যাটের (ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল) লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়। আজ দেশে বৈধ উপায়ে ভি-স্যাট ব্যবহারের শেষ দিন। ফলে বিকল্প উপায়ে টেলিযোগাযোগ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার উপায় থাকছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভি-স্যাট না থাকা এবং সাবমেরিন কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দেশের ইন্টারনেট থেকে সব ধরনের টেলিযোগাযোগে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বিদেশ থেকে এখন প্রতিদিন সাড়ে চার কোটি থেকে ৫ কোটি মিনিটের টেলিফোন কল আসে। কয়েক কোটি মিনিটের কল বিদেশে যায়। এ আদান-প্রদানের মাধ্যমও এখন সাবমেরিন কেবল। এক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথের জোগানদাতা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডও (বিটিসিএল) এখন পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থায় ব্যান্ডউইথ সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। তাদের যোগাযোগের মাধ্যম পশ্চিমমুখী থেকে ঘুরিয়ে পূর্বমুখী করার কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত নিতে পারেনি। বর্তমানে বিটিসিএলের ২২ এসটিএম ওয়ানের মধ্যে ১৪টি রয়েছে পশ্চিম দিকে। পূর্বদিকে রয়েছে মাত্র ৮টি এসটিএম ওয়ান। এ আটটি এসটিএম ওয়ান দিয়ে যাবতীয় টেলিযোগাযোগ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না বলেও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের কোন কোম্পানির কাছ থেকে আপৎকালীন ব্যান্ডউইথ নিতে গেলে তারা অনেক বেশি দাম হাঁকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিটিসিএলের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, প্রকিউরমেন্ট পলিসিতে কড়াকড়ি থাকায় চাইলেই যে কোনো সময় যে কোনো কিছু কেনার সুযোগ তাদের নেই। অন্যদিকে পূর্বদিকে যেতে চাইলে প্রতিটি এসটিএম ওয়ানের জন্য ২৩ হাজার টাকা করে খরচ বাড়বে।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) বলছে, খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। একদিকের সংযোগ বন্ধ থাকলে কিছু সমস্যা হবে ঠিক। কিন্তু এখনও হাতে যেহেতু কয়েক দিন সময় আছে সে কারণে বিকল্প আয়োজন করা যাবে। তারা বলছেন, আপৎকালীন সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলোর মাধ্যমেও কাজ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের সব পশ্চিম দিকের যোগাযোগও তাদের মাধম্যেই করা যেতে পারে। এতে হয়তো কিছু বাড়তি খরচ হবে। কিন্তু বিএসসিসিএলের কথায় ভরসা করতে পারছেন না দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে বিটিসিএলের কাছ থেকেই যেহেতু দেশের অধিকাংশ গ্রাহক ব্যান্ডউইথ নিয়েছেন সে কারণে তারা উদ্বিগ্ন।
জানা যায়, তিন-চার দিন আগে সি-মি-উই-৪-এর কলম্বো শাখায় রিপিটার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মেরামতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু মেরামত করতে গেলে পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। একই সময়ে ভারতের চেন্নাই এবং মুম্বাইয়েও মেরামত কাজ করা হবে। ভারতের সাবমেরিন কেবলের ৬টি বিকল্প সংযোগ থাকায় তাদের সমস্যা হবে না। শ্রীলংকারও কয়েকটি বিকল্প সংযোগ রয়েছে। তারপরও আমাদের কথা চিন্তা করেই তারা তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত কাজ শুরু করেনি। বরং আমাদের বিকল্প নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ দিতে সময় দিয়েছে তারা।
এ বিষয়ে সাবমেরিন কেবল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, কালবিলম্ব না করে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হয়তো ক্ষতি তেমন একটা হবে না। সব আন্তর্জাতিক গেটওয়ে, ইন্টারনেট গেটওয়ে বা অন্যান্য টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প আয়োজনের কথা ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গতকাল সন্ধ্যায় বিটিসিএলের এমডি এসএম খাবীরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কিছুই জানানো হয়নি। তবে এমন কিছু হলে নিশ্চয়ই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে তিনি জানান, হয়তো কিছু ঝামেলা হবে, কিন্তু চালিয়ে নেওয়া যাবে।
এদিকে কয়েক দিন থেকে বিটিসিএল অফিস ঘেরাও করে রেখেছে কোম্পানিটির ক্যাজুয়েল শ্রমিকরা। তাদের ঘেরাওয়ের কারণে কোম্পানিটির কর্মকর্তাদের অনেকেই অফিস করতে পারছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যাজুয়াল শ্রমিকরা অফিসের অনেক কম্পিউটার সংযোগ বন্ধ করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেন কর্মকর্তারা। তাছাড়া বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবসের অনুষ্ঠান নিয়েও তারা অনেকে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় অফিসের অনেক খবরই তাদের কাছে নেই। এটিও তেমনই একটি না থাকা খবর।
অন্যদিকে এ বিষয়ে কোম্পানি দুটির কার্যক্রম গাফিলতির পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করছেন অনেকেই। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আখতারুজ্জামান মঞ্জু সমকালকে বলেন, সত্যি সত্যি এমন কিছু হলে তাতে দেশের অনলাইন ব্যবসা একেবারেই বসে যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে যাবে।
আজ ভি-স্যাট ব্যবহারের শেষ দিন নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় ভি-স্যাটের মাধ্যমেই দেশে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অবৈধ কল টার্মিনেশনের সঙ্গে ভি-স্যাটের সম্পর্ক থাকতে পারে আশঙ্কা করে এই লাইসেন্স আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আজ দেশে বৈধভাবে ভি-স্যাট ব্যবহারের শেষ দিন। এত দিন পর্যন্ত সাবমেরিন কেবলে কোনো সমস্যা হলে ব্যাকআপ হিসেবে ভি-স্যাট ব্যবহার করা হতো। এক্ষেত্রে ভি-স্যাট ব্যবহার বন্ধ হওয়ার পর সাবমেরিন কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াকে কেয়ামতের সঙ্গে তুলনা করেছেন আইএসপি ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আরও কিছুদিনের জন্য যেন ভি-স্যাটের লাইসেন্সের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। না হলে এ পরিস্থিতি উত্তরণ করা কোনো অবস্থায় সম্ভব হবে না।
আখতারুজ্জামান বলেন, সাবমেরিন কেবলের একদিকের সংযোগ থাকবে না সেটা আমরা আগে থেকে জানতাম না। তারপরও বিকল্প সাবমেরিন কেবল না আসা পর্যন্ত ভি-স্যাট থাকা উচিত বলে আমরা বিটিআরসির কাছে আবেদন করেছি। এখনই এ প্রেক্ষাপটে অবশ্যই ভি-স্যাটকে আরও কিছুদিন সুযোগ দেওয়া উচিত। সূত্র সমকাল।
এর সাথে এই লেখাটি অবশ্যই পড়ুনঃ Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


