সাইফুল ইসলাম, যশোর
যশোর শহর থেকে উত্তরে যশোর-ঝিনাইদহ সড়ক ধরে ঠিক ১৬ কিলোমিটার গেলে ডান হাতে পড়ে মশিয়াহাটি গ্রাম। এই গ্রামেরই একটি পাড়ার নাম ঋষিপাড়া। ১৯৯৫ সালের ৩ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এই পাড়ায় এসেছিলেন হিলারি ক্লিনটন। সেই থেকেই ঋষিপাড়া হয়ে গেল হিলারি আদর্শ পল্লী।
এই পল্লীর বয়স্করা এখন সময় পেলেই স্মৃতি হাতড়ান, ফিরে যান ১৫ বছর আগের সেই সোনালি দিনগুলোতে। জীবনে হয়তো স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না, কিন্তু পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়নি, না খেয়ে মরতে হয়নি কাউকে। আর এখন সাপ্তাহিক কিস্তির চিন্তায় এই পাড়ার মানুষ থাকেন উৎকণ্ঠায়।
ঋষিদের বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য গতকাল ভোরে সরজমিনে ঋষিপাড়ায় গিয়ে দেখা গেল সবার মাঝেই কেমন সন্ত্রস্তভাব। এই প্রতিবেদক গ্রামীণ ব্যাংকের লোক কি না, কোথা থেকে আগমন_ নানা জিজ্ঞাসা। খোঁজ করি ভক্ত দাসের বাড়ি। ভয়ে কেউই তার বাড়ির সঠিক ঠিকানা দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত অনেক ঘুরে সেনাবাহিনীর তৈরি করে দেওয়া আবাসন প্রকল্পের ছোট এক খুপরি ঘরে পাওয়া গেল ভক্ত দাস ও তার স্ত্রী পার্বতী রানীকে। প্রশ্ন করি এখানে কেন, গ্রামীণ ব্যাংকের করে দেওয়া সেই বাড়ি কোথায়? ভক্ত জানান, ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিজের জমিতে যে বাড়িটি করেছিলাম, সেই ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়েই জমি, বাড়ি সবই বেচতে হয়েছে। সেখানে এখন আর কিছুই নেই।
কথার মাঝে এসে হাজির হন সুনীল দাস ও তার স্ত্রী ময়না রানী। ময়না জানান, তাদের দেড় বিঘা জমি ছিল, বাড়ি ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের লোন সুদে-আসলে শোধ করতে গিয়ে সবকিছুই বেচতে হয়েছে। একবার কিস্তির ভয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রামে পালিয়ে গিয়েছিলেন তারা। সেখান থেকে এসে আবাসন প্রকল্পে খুপরি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো গ্রামীণ ব্যাংকের লোন শোধ হয়নি তাদের। প্রশ্ন করি ব্যাংক আর কত টাকা পাবে? আর কতদিন কিস্তি দিতে হবে? আপনারা এসব জানেন? ময়না বলেন, আমরা লেখাপড়া জানি না, তারা কিস্তি দিয়ে যেতে বলে, আমরা দিয়ে যাই। এক ঋণ শোধ হওয়ার আগেই বিভিন্ন নামে তারা আবারও ঋণ দেয়।
কথা হয় ঋষিপাড়ার মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি পল্লীচিকিৎসক মিন্নাত আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক এখানে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। ঋণ নিয়ে এরা কী করবে, তা না দেখেই এদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। পাকা বাড়ি, ল্যাট্রিন করার জন্য ২০-২৫ হাজার টাকা করে ঋণ দিয়েছে, যা থেকে কোনো আয় হয় না। এদের পেশা বাঁশ দিয়ে চাটাই আর ঝুড়ি বোনা। সেগুলো হাটে বিক্রি করে যে লাভ থাকে, তাতে তিন বেলা খাবারই জোটে না, কিস্তি দেবে কীভাবে। ডা. মিন্নাত বলেন, কিস্তি দেওয়ার চিন্তাতেই এখানকার বেশির ভাগ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গ্রামীণ ব্যাংক এই পাড়ায় আসার আগে এখানকার মানুষের ছিল নানা উৎসব-পার্বণ। এক মাস ধরে চৈত্রীপূজা (চড়কপূজা) চলত। সারা মাস ধরে উৎসবে মজে থাকত তারা। আর এখন তারা সেসব ভুলেই গেছে। চৈত্র মাসে একদিন কোনো রকমে পূজাটা সেরে নেয়।
ভক্ত, পার্বতী, ময়না, সুনীলদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে জড়ো হয় ঋষিপাড়ার বেশ কয়েকজন ছেলেবুড়ো। তাদের মুখে শোনা যায় ঋণের জালে জড়িয়েপড়া মানুষের করুণ কাহিনী। তারা এখন ঝুড়ি বোনে কিস্তি শোধের জন্য, জন (কামলা) বিক্রি করে কিস্তি শোধের জন্য, রাতে ঘুমাতে যায় কিস্তি শোধের উপায় নিয়ে চিন্তা করতে করতে, সকালে ঘুম ভেঙেও সেই একই চিন্তা। এক বেলা কম খেয়ে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


