somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ কাশফুল কন্যা

০৬ ই নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১. নেয়ামতপুর গ্রামের গল্প। এটি বাংলাদেশের আর পাঁচ দশটা গ্রামের মত নয়। ভারতীয় সীমানা ঘেঁষে এর অবস্থান। উন্নয়নের তেমন ছোঁয়া লাগে নি। মানুষগুলো খুবই সাধা-সিধা, সহজ-সরল। এক জনের হাড়িতে চাল না থাকলে, আরেক জন যতটুকু পারে সাহায্য করে। এক জনের দুঃখে আরেক জন এগিয়ে আসে। এক জনের আনন্দ সবাই মিলে উপভোগ করে। মানুষগুলো সবাই কমবেশি অভাবি, কিন্তু সুখি।

গ্রামে ভাঙাচোরা বেড়ার একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। বৃষ্টির দিনে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে, ভিজে জুবুথুবু হয় ছাত্র ছাত্রীরা। ঝড়ের দিনে ভাঙা দড়জা জানালাগুলো যেন আর্তনাদ করে উঠে। আর শীতের দিনে হুহু করে ঠান্ডা বাতাস আসে। গ্রামের একমাত্র কাঁচারাস্তাটায় হাঁটু সমান কাদা হয় বর্ষাকালে। ইলেক্ট্রেসিটি তো দূরের কথা, খাম্বারও দেখা নেই। বটগাছ তলার করিম সরকারের একটা বহুমুখি মুদি দোকানই (চা এর স্টল থেকে শুরু করে সব পাওয়া যায়) গ্রামের মানুষের বাজার, বিনোদোনের জায়গা। করিম সরকারের একটা ১৭ ইঞ্চি সাদা কালো টিভি আছে, ব্যাটারির সাহায্যে চলে। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই ভিড় বাড়তে থাকে দোকানটায়। টিভির দর্শক ছেলে বুড়ো সবাই।

দোকানটায় চায়ের অর্ডারটা যেন আজ একটু বেশিই হচ্ছে।গ্রামের মানুষের বুক গর্বে ভড়িয়ে দিয়েছে সিরাজ মঝির বেটি সুফিয়া। সরকার প্রাইমারিতে কী যেন একটা পরীক্ষা চালু করল এবার, সেই পরীক্ষায় বড় পাশ দিয়েছে সিরাজ মাঝির বেটি।গতকাল বড় বড় গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছিল। ফটো তুললো, ভিডিও করলো, কী সব যেন লিখে নিল।

করিম সরকারের টিভিতে সুফিয়াকে যতবারই দেখাচ্ছে, ছোট বড় সবাই খুশিতে হাত তালি দিয়ে উঠছে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, ওই দেহ আমাগের সুফিয়ারে দেহাচ্ছে। আহা! এমন আনন্দ গ্রামের মানুষ কত দিন পায় নি।

২. আজকের সকালটা কেন যে গত চার পাঁচ দিনের মত হত হল না, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না আট বছর বয়সের সুহেল মাঝি। কুয়াশা যদি থাকতো, সূর্যটা যদি না উঠত, শীতের দোহাই দিয়ে আরেকটু ঘুমানো যেত। অথচ এখন উঠানে পাটি বিছিয়ে পড়তে বসতে হয়েছে তাকে। সে ভেবে পায় না, তার দিদি এমন নিষ্ঠুর হয় কি করে? সুহেল ক্লাস টুতে পড়ে, আর তার দিদি ফাইভ পাশ দিয়ে মাত্র সিক্সে উঠেছে। সুহেলের পাশেই বসে তার নিষ্ঠুর মাস্টার মশাই তার নিজের ক্লাসের বই মনযোগ দিয়ে পড়ছে। সুহেল মনে মনে বলে, দিদি তর পড়া তুই পড়েগ গে, এই কালের মদ্দি আমারে ক্যান ডাকপের গেলি? উঠানে তিনটা চড়ুই পাখি কী যেন খুঁজ়ে খুঁজে খাচ্ছিল। পড়ার চেয়ে সুহেলের মনোযোগ সেদিকেই বেশি।

হঠাৎ খেয়াল হতেই মাস্টার মশাই সুফিয়া খাতুন ধমকে উঠল।
-কিরে পড়স না ক্যান? ওই দিকে তাকাইয়ে কী দ্যাখস?
-না দিদি! কিছু না। আতকে উঠে সুহেল।
-তালি পরে পড়।

ওদের মা, হালিমা খাতুন দুই জনের কান্ড কারখানা দেখে একটু হাসল। তারপরে আবার নিজের কাজে মনযোগ দিল। ভাঙা চুলাটা কাদা দিয়ে মেরামত করছে সে। হালিমা খাতুনের মনে আজ খুব আনন্দ। গতকাল সুফিয়ার বাপ আতপ চাল আর খেজুরের গুড় কিনে এনেছে ছেলে মেয়েদের পিঠা খাওয়ানোর জন্য। আহারে! কতদিন যে ওরা ভাল মন্দ খায় না। সিরাজ মাঝির তিন কানি জমি আছে।যে ফসল আসে, এতে বছরের ছয় মাসও যায় না। বাকিটা সময় যায় অভাব অনটনে। এখানে ওখানে কামলার কাজ করে দুই বেলা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন চলে যায়।

-মা, বাপজান কনে গেছে? বিয়ান বেলা থিকাইতো দেখতেছি না? উত্তর পাওয়ার আশায় মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সুহেল।
-তর বাপে বিয়ান বিয়ান কাম খুঁজপের জন্যি বাইর হইছে।
-ও। সুহেল আবার পড়ায় মনযোগ দিল।

সুফিয়ার খুব সখ মায়ের সাথে থেকে ভিজানো চাল পাটায় বেটে বেটে আটা বানাবে। তারপর পিঠা বানাতে বসবে। সুফিয়ার ধারনা, তার মায়ের মত ভালো করে পিঠা বানাতে এই গ্রামের অনেকেই পারে না।

-মা, চাল গুড়া কইরবে না?
-হ। চুলাডা ভালো কইরে লেইপে নেই আগে।
সুফিয়া আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুহেল বই এগিয়ে দিয়ে বলল,
-দিদি পড়া হইছে। ধর দেহি।
-ঠিক আছে। ক।
সুহেল মুটামুটি নির্ভুল ভাবেই পড়া বলে যায়। খুশিতে মনটা ভরে যায় সুফিয়ার। তবুও কৃত্তিম অখুশির ভান করে বলে,
-বেশি ভালা হয় নাই। আরো পড়েক।
সুহেলের মুখটা কালো হয়ে যায়।
-দিদি!
-কী কবি, কলিই তো পারিস।
-তরে একটা কথা কই, রাখপি?
-পাড়লে রাখপোনে, ক দেহি একবার?
-বড় পিলারডার ওই হানে ম্যালা কাশ ফুল ধরছে। চলেক কাইটে নিয়ে আসি।
-খবরদার না! ওই হানে ভারতি মেলেটারি আছে। গুলি করি মাইরে ফেলাবেনে।
দিদির না শুনে সুহেল ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। খুব মায়া লাগলো সুফিয়ার ভাইটির জন্য।
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই দূরে দাড়াইয়ে থাকিস আমি কাইটে নিয়ে আসপানে।
দিদির আশ্বাস পেয়ে যেন সুহেলের খুশি আর ধরে না।

৩. দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের পঞ্চম পাতায় সপ্তম কলামে ছোট্ট একটা রিপোর্ট-
‘বিএসএফের গুলিতে বার বছরের একটি মেয়ের মৃত্যু। মেয়েটি কাশফুল কাটতে গিয়েছিল। বিএসএফের দাবী, মেয়েটি ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু মেয়েটির লাশ বাংলাদেশের সীমান্তেই পাওয়া যায়’।

১০ জানুয়ারি, ২০১০
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৩:৪১
২৯টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×