কৈফিয়ত : পৃথিবীতে কে আছে যার জীবনে দুঃখ নেই ? দুঃখের এসব কথা নাকি চেপে রাখতে নাই। কোথাও না কোথাও বলে দিতে হয়। বলে দিচ্ছি সবাইকে। জানি না, আমার দুঃখ কথা সবার কেমন লাগবে।
স্মরণীয় দুঃখ :
আমার ছোটকাল খুব একাকীত্বে কেটেছে। তার জন্য দায়ী আমার মেজ ভাই। আমার মেজ ভাইয়ের সব শাসন ছিল আমার উপর। আমি রাস্তায় বেরুতেই পারতাম না তার জন্য। আমাকে রাস্তায় দেখলেই ধমকাতে শুরু করতেন। কেন রাস্তায় এসেছি সেই কৈফিয়ত চাইতেন। তার মারের ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি রাস্তা ছেড়ে বাসায় চলে যেতাম।
বাসার বাইরে না যাওয়ার কারণে মহল্লায় আমার সমবয়সীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। আমার বন্ধু সংখ্যা খুব কম ছিল। আমার স্কুলের সহপাঠী ছাড়া আর কেউ আমার বন্ধু ছিল না।
আমার এই একাকী শৈশবের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল আমার ছোট ভাই। আমার থেকে সে আড়াই বছরের ছোট। আমার বড় বোনের কাছে শুনেছি, আমার ছোট ভাই সারাক্ষণ আমাকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেই যেত, আর আমি উত্তর দিতেই থাকতাম। আমার এসব কথা খুব একটা মনে পড়ে না।
যাই হোক, সেই একাকীত্বের সময়ে কখনও কখনও মেজ ভাইয়ের চোখ ফাকি দিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বাইরে। একবার আমাদের বাড়ির এক বুয়ার সাথে বেড়াতে যাই। আমার বয়স সম্ভতত তখন ছিল সাত বছর। ক্লাশ টুতে পড়ি।
বুয়া আমাকে উঠানে খেলা করতে দেখে ডাক দিয়ে বলে, বাইরে যাবা ?
তার ডাক শুনে আমার যে কী হল। খুশিতে রাজি হয়ে গেলাম। খালি গা, খালি পা ও গায়ে ধুলোবালি মাখা অবস্থায় কেবল একটা হাফ প্যান্ট পরে বুয়ার সাথে বেরিয়ে গেলাম। সেই হাফ পেন্টের ইলাস্টিক ঢিলা ছিল বলে তা মাঝে মাঝে নাভির উপরে উঠিয়ে দিতে হত।
মেজ ভাই কেন সবার চোখ এড়িয়ে বাইরে চলে গেলাম বুয়ার সাথে। বুয়া আমার হাত ধরে রাখল। নিয়ে গেল আমার পাশের একটি চারতলা ভবনে। সেখানে আমাকে সিঁড়িতে বসিয়ে রেখে বুয়া একটি ফ্লাটের ঢুকে গেল। আমি খেয়াল করলাম না সে কোন ফ্লাটে ঢুকল।
গেল তো গেলই। আধ ঘণ্টা পড়ে আমি সিঁড়ি থেকে উঠে তার সন্ধানে গেলাম। কিন্তু কোন ফ্লাটে খোঁজ করব তাকে ?
একটি ফ্লাটের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লাম। আস্তে আস্তে ডাকছি, বুয়া, এই বুয়া।
এমন সময় পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক দশাসই মহিলা। মহিলা যেমন লম্বা তেমনি মোটা। এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাক ছাড়লেন, এই ছ্যাড়া, এহেনে কী ? চুরির মতলব নাকি ?
সে আমাকে চোর মনে করায় আমার খুব চোট লাগল। আমি মিন মিন করে বলার চেষ্টা করলাম, একটা মহিলা আসছে। তার সাথে আমি আসছি।
সেই মহিলা আমার কথা শুনলেনই না। হাক দিয়ে বললেন, একদম লাত্থি দিয়া পেটা গাইললা ফালামু। চুরি করতে আয়া আবার বড় কথা কস ?
আমি তাড়াতাড়ি ওই ফ্লাট থেকে বেরিয়ে এলাম। সম্ভবত আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। কোত্থেকে যে বুয়া এল বুঝলাম না। সে এসে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এল।
আমার জীবনে প্রথম অপমানিত হওয়ার ঘটনা ছিল সেটি। খালি গা, খালি পা আর গায়ে ধুলোবালি মাখা বলে ওই মহিলা আমাকে টোকাই ধরনের ছিচকে চোর ভেবেছিলেন। এখনও সেই ঘটনা মনে হলে সামান্য দুঃখ পাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



