আমি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছি। আমি একটি ছোট স্থানীয় পত্রিকায় চাকুরি করি। সেই সুবাদে আমার পত্রিকায় আমার সিনেমার শুটিং শুরু হয়েছে এই মর্মে একটি খবর ছাপা হয়েছে। সেই খরব ছাপা হওয়াতেই ঘটেছে বিপত্তি ।
আমাদের পত্রিকার সাথে একজন ব্যর্থ রাজনীতিবিদ জড়িত। তার নাম ধরে নিলাম, সালাম। ভদ্রলোক বিএনপি করেন। তিনি মনে করতেন, তিনি একজন বিরাট নেতা, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন একজন চামচা। বাপ দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে যা আয় আসত, তাই খরচ করে তিনি রাজনীতি করতেন। চামচামি করতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে অনেক টাকা পয়সা লুটিয়েছেন।
ভদ্রলোক যেমন কালো, তেমনি দেখতে ভয়ংকর। অনেকটা সিনেমার ডাকাত সর্দারের মতো চেহারা। সারাক্ষণ ঘেমে থাকা সেই চেহারা এতটাই ভয়ংকর যে আমাদের সম্পাদকের ছেলে একবার তাতে দেখে ভীষণ ভয় পেয়েছিল।
তার স্বাস্থ্যও ভয়াবহ। পর্বতের মতো আকার তার । অতিরিক্ত মোটা হওয়াতে তাকে অনেকে জাম্বো বলে ডাকে। সারাক্ষণ খাওয়া দাওয়া বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতে তিনি বড়ই পছন্দ করেন।
ভূমিকা অনেক হল । এবার মূল ঘটনায় আসা যাক। আমার সিনেমার শুটিং শুরু হওয়ার সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সকাল বেলাই আমার পরিচিতি জনরা ফোন করে অভিনন্দন জানাচ্ছে। দুপুরের দিকে জাম্বো সাহেব ফোন করলেন ।
তার ভীষণ অভিমান আমার প্রতি। আমি কেন তাকে না জানিয়েই সিনেমার শুটিং শুরু করলাম। আমি বললাম, আমি লেখক মাত্র, পরিচালক আরেক জন।
তিনি এই সব বুঝলেন না। তার অভিমান হল, আমি কেন তাকে সিনেমায় সুযোগ দিলাম না। তার কথা শুনে হাসব না কাদব ভেবে পেলাম না। এই পর্বতকে যদি সিনেমায় নেই, ভয়ে দর্শক পালিয়ে যাবে।
সন্ধ্যায় ভদ্রলোক তার তেলতেলে চেহারা নিয়ে আমার পত্রিকা অফিসে হাজির। তার একটি মাত্র দাবি, ভাই আমারে একটা চরিত্রে নেন।
আমি তাকে এড়ানোর জন্য বলি, নেব। আপনাকে অবশ্যই কোন একটা সিনেমায় নেব।
- না, আমারে এই সিনেমায়ই নেন, তিনি অনুরোধ করেন।
আমি বানিয়ে বলি, আপনাকে পরবর্তী সিনেমায় নেব। আপনার জন্য একটি চরিত্রও বেছে রেখেছি।
- কী চরিত্র ? উনার আগ্রহ বাড়ে।
- আপনাকে আমি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার চরিত্র দেব ।
- ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ? উনি খানিকটা অবাক। এইডা আবার কেমন কর্মকর্তা ?
- প্রত্যেক থানায় একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকেন।
- থানায় আবার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে ? থানায় তো থাকে পুলিশ ।
- থানায় থাকে পুলিশ। কিন্তু একজন ওসিও তো থাকে, তাকে বাংলায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলে।
উনি তো বেজায় খুশি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়ার আনন্দে তার চোখ চক চক করছে। উঠে যান আমার ডেস্ক ছেড়ে।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের এক ফটো সাংবাদিক আমার কাছে এসে হাজির, ভাই, আপনে নাকি সালাম ভাইরে ভারপ্রাপ্ত অভিনেতা বানাইছেন ?
আমি তো অবাক। ভারপ্রাপ্ত অভিনেতা ! ওটা আবার কী ?
ফটো সাংবাদিক আমাকে বলে, সালাম সাহেব ওদেরকে বলেছে, তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তিনি তার সহ অভিনেতা মানে পুলিশ কনস্টেবল ও চোর খুঁজছেন।
ফটো সাংবাদিক পুলিশ কনস্টেবলের চরিত্র করতে চান। আমি তার বিশাল ভূড়ির দিকে তাকাই। বলি, তোমার যে বিশাল ভূড়ি, তোমাকে কনস্টেবল বানালে উনাকে ভারপ্রাপ্ত মানাবে না। তোমাকেই ভারপ্রাপ্ত মনে হবে। দর্শক মনে মনে জানতে চাইবে উনি ভারপ্রাপ্ত হলে তোমার ভূড়ি বেশি বড় কেন ?
ফটো সাংবাদিক ঝটপট উত্তর দেয়, আমার ডায়ালগ থাকবে, স্যার, আপনের ঘুষটা তো আমার পকেট হয়া যায়, আমার ভাগটা রাইখ্যা লই। এই জন্যই আমার ভূড়ি বড়।
আমি তার কথায় হেসে উঠি।
বলি, তোমার ভূড়ি ফ্রেমের বাইরে চলে যাবে । তোমার ভূড়ি কমাও।
ফটো সাংবাদিক বলে, আগামী সপ্তাহে জিমে ভর্তি হয়া যামু গা।
ফটো সাংবাদিক আরও বলে, আমাদের বিজ্ঞাপন ম্যানেজারকে চোরের চরিত্রটা দিয়েন।
রোগা পটকা বিজ্ঞাপন ম্যানেজারকে চোরের ভূমিকায় ভেবে আমি বললাম, চোর ধরবে কে ?
- আমি ধরমু।
-মাইর দিবে কে ?
- সালাম ভাই, মানে ভারপ্রাপ্ত মাইর দেবে।
- ও যেই শুকনা, ওরে এক চড় দিলে ও তো ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে চলে যাবে।
ফটো সাংবাদিক চিন্তায় পড়ে যায়। বলে, তাইলে আমিই চড়টা দিমু। আস্তে দিলে সামলাইতে পাড়ব।
কিছুক্ষণ পর সালাম সাহেব হাজির। তার হাতে মিষ্টির প্যাকেট। আমি অবাক । তিনি বলেন, একটা ভারপ্রাপ্ত চরিত্র পাইলাম, তাই সবাইরে মিষ্টি মুখ করাইতাছি।
উনি মিষ্টির প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি আমার মুখে তুলে দিলেন। প্যাকেট নিয়ে চলে গেলেন মিষ্টি বিলাতে। অফিসের সবাইকে মিষ্টি করিয়ে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অভিনেতা হিসেবে পরিচয় দিলেন।
অন্য দিকে ফটো সাংবাদিক মিষ্টি খেতে খেতে বলে, আপনারে একটা পরামর্শ দেই। ভারপ্রাপ্তের ভার তো মাসআল্লাহ কম না। উনার জন্য স্পেশাল সেট বানাইয়েন। নাইলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভারে সেট ভাইঙ্গা পড়তে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

