আমার এক পরিচিতি নাট্যকার ও নির্দেশক আছেন। তার নাম ও. আর (সংক্ষেপিত)। উনি চিরস্থায়ী বেকার। নাটক লেখা ও নির্দেশনা দেয়াকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেন না, বলেন নেশা। সেই নেশা নিয়েই তিনি একের পর এক সাময়িক নাট্যদল গড়েন এবং ভাঙ্গেন।
একবার তার হাতে পয়সা নাই, কাজও নাই। তার মহল্লার কয়েক জন ছিচকে মাস্তান ধরনের ছেলেকে পটাইতে লাগলেন। উদ্দেশ্য একটা নাটকের দল গড়া এবং একটি নাটক নির্দেশনা দিয়ে কিছু পয়সা উপার্জন।
সেই ছিচকে মাস্তানরা প্রথমে রাজি না হলেও পরে তারা আগ্রহ বোধ করা শুরু করল। বিশেষত যখন নায়িকা প্রসঙ্গ বারে বারে বলতে লাগলেন, তখনই ছিচকে মাস্তানের দল খুব আগ্রহ দেখাল। ছিচকে মাস্তানের দল শর্ত দিল শহরের সবচেয়ে সুন্দরী নায়িকা নিতে হবে, টাকা যা লাগে লাগুক।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, এই নায়িকারা কারা। এরা হল গরীব ঘরের সেই সব মেয়ে - যারা সামান্য কিছু টাকার জন্য বিভিন্ন দলে মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করে থাকে। তারা যে সব দলে কাজ করে সেই সব দল কমার্শিয়াল নাটক করে। কমার্শিয়াল নাটক বলতে অনেকে মনে করবেন যে, এই নাটকের টিকেট বিক্রি হয় এবং প্রচুর টাকা উপার্জন হয়। বরং ব্যাপারটি পুরো উল্টো। এই নাটক পুরো ফ্রি দেখানো হয়। এই নাটকে বাংলা সিনেমার বেশ কিছু গান থাকে। সেই গানের সাথে কিছু লুলীয় নাচ এবং অঙ্গভঙ্গি। নাটকের কাহিনীও প্রচলিত বাংলা সিনেমার নকল। কিন্তু কেন এই নাটকগুলোকে কমার্শিয়াল নাটক বলে সেটা আমার কাছে আজও বোধগম্য নয়।
এই সব কমার্শিয়াল নাটকের দলে কিছু বড় ভাই থাকেন যাদের পকেটে কিছু কাঁচা টাকা আছে। তারা এই সব মেয়েদের খরচ বহন করেন এবং দলের সব খরচ দেন।
ছিচকে মাস্তান পুলাপানদের মধ্যে কাঁচা টাকার মালিক আছিল দুইটা। কাঁচা টাকার লোকেরা প্রাকৃতিক কারণেই লুল প্রকৃতির হয়। এই দুইটাও তাই ছিল।
তখন সালমান শাহ বাংলা সিনেমার নায়ক হিসেবে খুব জনপ্রিয়। সালমান শাহর কোন এক ছবির গান নির্ধারিত হল ওই নাটকের জন্য। অভিনয়ের রিহার্সেলের আগেই নাচের রিহার্সেল শুরু হল। লুলদের একজন হল নায়ক। অন্য জন পাশে বসে নায়ক ও নায়িকার ঘনিষ্ঠ নাচ দেখতে লাগল এবং দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। বঞ্চিত লুল প্রস্তাব দিল, তাকে নায়ক বানাতে হবে, দরকার হয় সে বেশি টাকা দেবে। এই নিয়ে লাগল ঝগড়া এবং কয় দিন পর দেখা গেল, দলের কমপক্ষে ৫ জন লুল নায়ক হওয়ার জন্য তিন পায়ে খাড়া।
ও. আর (সংক্ষেপিত) পড়ে গেলেন বিপদে। কাকে রেখে কাকে নায়ক বানাবেন এবং নিজের পিঠ বাচাবেন সেটা ভেবে তার রাতের ঘুম হারাম।
ঘটনার এই পর্যায়ে আমার সাথে তার দেখা। আমি তত দিনে ৫ খান মঞ্চ নাটক লিখে ফেলেছি এবং ওই নাটকগুলো ও.আর (সংক্ষেপিত) দাদা দেখেছেন। ওই নাটকগুলো দেখে তারা ধারণা হয়েছে, আমি নাটকের উপর বিশিষ্ট পণ্ডিত।
তিনি পুরো ঘটনা বলে আমার পরামর্শ চাইলেন। বুঝলাম, কাহিনীটা সালমান শাহ অভিনীত সাম্প্রতিক বাংলা সিনেমার নকল। পুরা কাহিনীতে নায়ক-নায়িকার লদকা-লদকি।
আমি তাকে একটা ভিলেন চরিত্র বানানোর পরামর্শ দিলাম। বঞ্চিত লুলটারে সেই ভিলেন চরিত্র দিলেই ঝামেলা মিটে যাবে। আর নায়কের সাথে যেমন নায়িকার লদকা-লদকি আছে, ভিলেনের কল্পনায় ফালাইয়া সেই রকম লদকা-লদকি দিতে বললাম। (উপায় নাই , ও.আর (সংক্ষেপিত) দাদার পিঠের চামড়া বাঁচানো এখন ফরজ। )
ও.আর (সংক্ষেপিত) দাদা খুশি মনে গেলেন। যাওয়ার আগে আমারে ধইন্যবাদ দিতেও ভুললেন না।
কয়েক দিন পর হন্তদন্ত হয়ে উনি নিজে এসে হাজির। কী ব্যাপার ?
এখন সবাই ভিলেন হইবার চায়।
আমি অবাক। কারণ কী ?
আপনের কথা মতো লদকা-লদকি দিয়াই তো কাম সারছে।
আমি কেবল লদকা-লদকি দিতে বলছিলাম। উনি আগ বাড়ায়া একটা রেপ সিনও দিয়া ফালাইছেন। ফলে নায়কের চেয়ে ভিলেনের গুরুত্ব বেড়ে গেছে এবং নায়িকার সাথে ভিলেনের দৃশ্যও বেশি। নাচ-গান তো আছেই, বোনাস হইল রেপ সিন।
আমি রেপ সিন বাদ দেয়ার পরামর্শ দিলাম।
সপ্তাহখানেক পর উনার সাথে রাস্তায় দেখা। দেখি মাথায় ব্যান্ডেজ। আমি জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি জানালেন, নায়িকা লয়া নায়ক আর ভিলেন মারামারি করছে। আমি অগো মারামারি ঠেকাইতে গিয়া মাইর খাইয়া মাথা ফাডা।
নাটকের কী হবে ? আমি উদ্বিগ্নভাবে জানতে চাই।
উনি হতাশ গলায় বলেন, আর নাটক । ডরের চোটে নায়িকা ভাইগ্যা গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



