তখন আমি কলেজের ছাত্র। আমার এক বন্ধু খুব ছ্যাবলা টাইপের ছিল। তার ছ্যাবলামি থেকে বাঁচতে গিয়েই বিদ্যাসাগর রচনাবলী চুরি করতে হয়েছিল।
আমার ছ্যাবলা বন্ধুটি সকাল বিকাল আমার বাসায় আসত। সকালে হঠাৎ এসেই বলত, শামীম, ২টা টাকা দে তো ?
আমি দিতাম।
আবারও অন্য দিন এসে বলত, ৫টা টাকা দে তো। রিক্সা ভাড়া দেব।
দিতাম।
আবারও একদিন এসে বলত, ১০টাকা হবে ?
আমি পকেট থেকে বের করে দিতাম।
এভাবে টুকটাক করে প্রায়ই সে টাকা নেয়। আমিও দেই। তখন একমাত্র আমি বন্ধুদের মধ্যে টিউশনি করি। মাস গেলে হাজারখানেক টাকা পাই।
একদিন টাকা নেয়ার সময় ছ্যাবলাটি বলল, লিখে রাখিস।
কথাটি আমার কানে বাজল। এখন সে টাকা চাওয়ার ভঙ্গিটি বদলে ফেলল। এভাবে বলত, বন্ধু ২টা টাকা দে তো, লিখে রাখিস।
আমিও একটা ডায়েরিতে সে আমার কাছ থেকে কত টাকা নিচ্ছে তা লিখে রাখতে শুরু করলাম। মাস দুয়েকের মধ্যে সেটা শ দেড়েক হয়ে দাঁড়াল।
অন্য দিকে সে আরেকটা বিরক্ত শুরু করল। আমি বাসায় না থাকলে সে তার নোংরা পোশাক খুলে রেখে আমার ধোয়া ইস্ত্রি করা কাপড় চোপড় পরে বেরিয়ে যেত। নতুন পালিশ করা জুতা পরে চলে যেত। একদিন দেখি আন্ডারওয়্যারটাও নাই।
সারাদিন আমার পোশাকে ঘুরে ফিরে সন্ধ্যা বা রাতে ময়লা অবস্থায় সেগুলো খুলে রেখে চলে যেত। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আম্বাকে বলে দিলাম, আমি না থাকলে ওকে যেন আমার ঘরে ঢুকতে দেয়া না হয়। তারপরও একদিন আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে ঢুকে আমার শার্ট মনে করে আমার ছোট ভাইয়ের ইস্ত্রি করা শার্ট পরে চলে গেল। আমার ছোট ভাই তো আমার উপর ক্ষেপে গেল। তারপর রিক্সা নিয়ে ওই ভদ্রলোককে খুঁজে বের করে তার গা থেকে শার্ট খুলে আনল।
এর মাস দেড়েক পরে সে আমার বাসায় হাজির। আবারও যথারীতি বলল, ৫টা টাকা দে তো, লিখে রাখিস।
আমি বললাম, যেগুলো লিখে রেখেছি, সেগুলো আগে শোধ কর।
ও অবাক। তুই কি সত্যি লিখে রেখেছিস ?
তু্ই তো লিখে রাখতে বললি ? লিখে রাখব না ?
ওকে আমার ডায়েরির হিসাবটা দেখালাম। দেখে চিন্তায় পড়ে গেল। ঠিক আছে দিয়ে দিব, ব্যাপার না।
তারপর আর ছ্যাবলাটার দেখা নাই। বন্ধুদের আড্ডায়ও অনিয়মিত। একদিন বন্ধুদের আড্ডায় কথাটা তুললাম। জানা গেল, সে শুধু আমার কাছ থেকে নয়, প্রায় সব বন্ধুর কাছ থেকেই একই ডায়ালগ মেরে টাকা নিয়েছে।
একদিন ওর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। টাকার কথা বললাম। ও আমাকে বলল, তুই একটা অভদ্র, এই ছোটখাট হিসাব কি মনে রাখতে হয় ? লিখেও রাখতে হয় ?
উল্টো আমি বিব্রত হলাম। তার কাছে আর টাকা চাওয়ার সুযোগ রইল না। তবে তারপর থেকে ও আর টাকা চায় না।
কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা। যেভাবেই হোক ওর কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করবই। ওই ব্যাটা লিখে রাখিস বলল কেন ?
অবশেষে ওর কোন একটা দামী জিনিস চুরি করব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ওর তেমন কোন দামী জিনিস নাই। অবশেষে পেলাম একটা দামি জিনিস। টাকায় নয়, সংগ্রহের দিক থেকে । সেটা হল একটা বিদ্যাসাগর রচনাবলী। একেবারে অখণ্ড সংস্করণ। মানে বিদ্যাসাগরের সকল লেখা একটা বইয়ে।
একদিন বিকেলে ওর বাসায় গিয়ে দেখি ও নাই। শেলফে থেকে সোজা বইটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। কেউ দেখল না।
বাসায় এসে দেখি বইটার দাম ১০০ টাকা। তার মানে বাংলাদেশী টাকায় ১৫০ টাকা। আমার ১৫০ টাকা উদ্ধার হল এবং একটা দুর্লভ সংগ্রহ বাড়ল।
অবশেষে বিদ্যাসাগর রচনাবলী চুরি করে ছ্যাবলাটার উপর সামান্য ঝাল মিটাতে পারলাম।
(আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের ১০৮তম মৃতু্যবার্ষিকী। ব্লগার ভিন্ন চিন্তার ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ নমি তোমায় বিনম্র শ্রদ্ধায় শিরোনামে পোস্ট পড়ে এই পুরোনো ঘটনাটি মনে পড়ল। )
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




