বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজে সবচেয়ে অল্প সময়ে ধনী হওয়ার ব্যবসা কোনটা ?
উত্তর : তৈরি পোশাক শিল্প।
কারণ তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বেতন সবচেয়ে কম। অশিক্ষিত ও নারী শ্রমিক থাকায় তাদের ইচ্ছামতো ঠকানো যায়। ঠকানোর কিছু নমুনা দেখা যাক।
০১) যে কোন অজুহাতে প্রতি মাসে বেতন কাটা হয়। কোন শ্রমিকই কোন মাসে পুরো বেতন তুলতে পারে না। বিশেষত গার্মেন্টসে প্রবেশের সময় ১৫ মিনিট দেরি হলে একদিনে হাজিরায় লাল কালি বা লেট মার্ক দেয়া হয়। তিন দিন লেট মার্ক পেলে এক দিনের বেতন কাটা যায়। কোন শ্রমিকই জানে না পরের মাসে সে কত বেতন পাবে।
০২) কর্মক্ষেত্রে গালাগালি এবং নোংরা ব্যবহার প্রাপ্তি গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতি দিনের রুটিন। কর্মকর্তারা গালাগালি ছাড়া তাদের সাথে কথা বলে না।
০৩) নিয়ম হল রাত ৮টা পর্যন্ত ওভার টাইম করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ওভারটাইম হয় ১০টা পর্যন্ত। কখনও কখনও রাত বারোটা বা রাত তিনটা। কখনও কয়টা পর্যন্ত ওভারটাইম হবে তার কোন ঠিক নাই। মাসের পর মাস শ্রমিকরা নির্মমভাবে ওভারটাইম করে যায় এবং যাচ্ছে। নারী শ্রমিকদের এত রাত পর্যন্ত বাইরে কাজ করার নজির সম্ভবত পৃথিবীর কোন দেশে নাই।
০৪) নিয়ম হল, ওভারটাইম হলে একটা নাস্তা দেয়া হবে সন্ধ্যায়। এই নাস্তা পচা কলা আর পাউরুটিতে সীমাবদ্ধ। এই নাস্তার বিল অনেক সময় মালিকপক্ষের কেউ না কেউ মেরে খায় এবং কোন না কোন অজুহাতে প্রায় সময়ই নাস্তা দেয়া হয় না।
০৫) নিয়ম হল, ওভারটাইমের বিল সাধারণ বেতনে দ্বিগুণ হবে। কিন্তু গার্মেন্টেসে ওভারটাইম বিল দেড় গুণ। সেটাও সব সময় মানা হয় না।
০৬) নিয়ম হল, পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ করা। কিন্তু ২০ তারিখের আগে অধিকাংশ গার্মেন্টেসে বেতন দেয়া হয় না। দু এক বড় গার্মেন্টস এই নিয়মের ব্যতিক্রম।
০৭) বেতন দেয়া হলেও ওভারটাইমের বিল নিয়ে প্রতিমাসেরই তালবাহানা করে মালিকপক্ষ। মাসের পর মাস ওভারটাইম বকেয়া রাখে। কমপক্ষে ৩ মাসের ওভারটাইম সব সময়ই বকেয়া থেকে যায়। চাকুরি ছেড়ে দিলে এই বকেয়া মালিকপক্ষ মেরে দেয়।
০৮) ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলিতে বেতন বকেয়া রাখা একটা সাধারণ ব্যাপার। প্রায় সময়ই এই সব গার্মেন্টেসের শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের জন্য রাস্তায় আন্দোলনে নামতে হয়।
০৯) ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলি নূ্্যনতম বেতনের ধারও ধারে না। তারা নূ্যনতম বেতনের চেয়ে অনেক কম বেতনে শ্রমিক রাখে। বেতন কম দেয়ার জন্য তারা অল্প বয়সী শিশুদের চাকুরি দেয়।
১০) বকেয়া বেতন ও ওভারটাইম নিয়ে মালিকপক্ষের সাথে দর কষাকষি করতে গেলে ঝুট সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয় মালিকপক্ষ। প্রায় সময় বাড়ি ফেরার পথে মারধর ও সম্ভ্রমহানির শিকার হয় শ্রমিকরা। ঝুটসন্ত্রাসীরা সব সময় সরকারী দল করে বলে পুলিশ তাদের সমঝে চলে।
১১) গার্মেন্টসগুলিতে কোন বৈধ ট্রেড ইউনিয়ন নাই। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কোন সমস্যা হলে বহিরাগত ট্রেড ইউনিয়নের কাছে যাওয়া লাগে। এই সুযোগে কিছু অশ্রমিক ওসব ট্রেড ইউনিয়নের নেতা সেজে বসে আছে। তারা সুযোগ সুবিধা আদায় করে দেয়ার নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা খসিয়ে নেয়।
১২) বড় কর্মকর্তারা প্রায় সময়ই মালিকের ভাই বেরাদর হয়। এরা কোন কাজ কর্ম না করেই লাখ টাকা বেতন পায়। বড় কর্মকর্তাদের সাথে একজন শ্রমিকের বেতনের অকল্পনীয় বিস্তর ফারাক।
১৩) বড় কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা ভাই বেরাদর থাকলে সেই গার্মেন্টসে অরাজকতা চরম হয়। এই ভাই বেরাদররা চুরি কর্মে বিশেষ সিদ্ধহস্ত। তারা শ্রমিকের বেতন কাটে, নাস্তার টাকা মারে, ওভারটাইমের টাকার মারে, মেশিপত্র ও ঝুট পাচার করে দেয় - কিন্তু এই অর্থ মালিকের কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজে মেরে দেয়। নিজের পকেট ভারি করার জন্য তারা নানা অজুহাতে শ্রমিকের টাকা মারার তালে থাকে।
১৪) গার্মেন্টসগুলির বাইরে লেখা থাকে, শিশু শ্রমিক তারা নেয় না। কিন্তু বাস্তবে ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলিতে সকল হেলপারই শিশু শ্রমিক। ওরা কখনও হেলপার পদে বড় শ্রমিক নেয় না। কোন ধরনের এনজিও বা ক্রেতা সংগঠনের তদন্ত এলে এই শিশু শ্রমিকদের সে দিন ছুটি দিয়ে দেয়া হয়।
১৫) গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী। কমপ্লায়েন্সের নিয়ম অনুসারে প্রতিটি গার্মেন্টেসেই নারী শ্রমিকের ছোট শিশু সন্তানের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কোন ডে কেয়ার সেন্টার নাই। কোন ধরনের এনজিও বা ক্রেতা সংগঠনের তদন্ত এলে একটা রুম ফাকা করে তার উপর সুন্দর করে লিখে দেয়া হয় - ডে কেয়ার সেন্টার এবং তৎক্ষণাৎ কিছু খেলনা এনে ওই রুমটা সাজানো হয়।
১৬) কমপ্লায়েন্সের নিয়ম অনুসারে, প্রত্যেক গার্মেন্টেসে নিজস্ব চিকিৎসক থাকার কথা। বাস্তবে ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলোর বেশির ভাগ গার্মেন্টসেরই কোন চিকিৎসক থাকে না। কোন ধরনের এনজিও বা ক্রেতা সংগঠনের তদন্ত এলে একটা রুমের উপর সুন্দর করে লিখে দেয়া হয় - মেডিক্যাল সেন্টার এবং মহল্লার কোন কম্পাউন্ডারকে টাকা দিয়ে চিকিৎসক সাজিয়ে বসিয়ে রাখা হয়।
১৭) কমপ্লায়েন্সের নিয়ম অনুসারে প্রতিটি গার্মেন্টসের একটি জরুরী নির্গমন সিঁড়ি থাকার কথা। ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলিতে এই ধরনের কোন সিঁড়ি থাকে না। ফলে আগুন লাগলে একটি অপরিসর সিঁড়ি দিয়ে বের হতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শ্রমিকদের অসহায় নির্মম মৃতু্যর সংবাদ আমরা প্রায়ই পত্রিকাতে পাই।
গার্মেন্টস সেক্টরে এই রকম আরো অনেক অনেক খচরামি আছে। এই সব খচরামির কারণে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মেজাজ সব সময় চড়া থাকে। তাই তো শ্রমিকরা যখন ফুঁসে ওঠে, সেটা এত ভয়াবহ হয়। তারা এত বেশি ভাংচুর চালায় এই কারণেই।
বর্তমানে গার্মেন্টস সেক্টরে সর্বনিম্ন বেতন ৩ হাজার টাকা ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও গার্মেন্টস মালিকরা খচরামি করলেন। সামনের ঈদের বোনাস আগের বেতনের হিসেবে দেয়ার জন্য তারা বেতন বাড়ানোর সময়টিকে পিছিয়ে নিয়ে গেলেন নভেম্বর মাসে। কেবল ঈদের বোনাস কম দেয়ার জন্য তারা এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। আজকে গার্মেন্টস সেক্টরে যে অসন্তোষ চলছে, তার অন্যতম কারণ বেতন বাড়ানোর সময়সীমাটি এত দেরিতে থাকা। শ্রমিকরা চলতি মাস থেকে বাড়তি বেতন দাবি করছে। তাদের দাবিটি যৌক্তিক।
বেতন যখন বাড়ানোই হল, তখন চলতি মাস থেকে দিলে সমস্যা কোথায় ? অনর্থক খচরামি আর কত ? এই সব খচরামি বাদ দিয়েও তো গার্মেন্টস মালিকরা মুনাফা অর্জন করতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


