আমরা একটা কালো সময় পার করছি। যে যুবসমাজ দেশের ভবিষ্যৎ , তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করায় ব্যস্ত। ইভ টিজিং নামের এক ভয়াল মহামারী কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাদের। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর এক ঝাঁক তরুণ প্রজন্মের বদলে আমরা পেয়েছি নষ্ট হয়ে যাওয়া অন্ধকার মনের একদল যুবককে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।
কী এমন কিছু ঘটে গেল যার জন্য তরুণ প্রজন্ম এমন নষ্ট হয়ে গেল ? অনেক দিন থেকেই ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে ওরা আজ মূর্তিমান নষ্টের দল। পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, সংস্কৃতিগত ও রাজনৈতিক পচনের ফলে আজ তরুণ সমাজের সামনে কোন স্বপ্ন নেই। জীবনকে নোংরাভাবে উপভোগ করার জন্য তারা এত উদগ্রীব।
নগর জীবনের ছোঁয়া আজ গ্রামেও গিয়ে পৌঁছেছে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের পারিবারিক ঐতিহ্যও আজ হারিয়ে গেছে। আগে যেখানে পরিবারের কর্তা হিসেবে বৃদ্ধ দাদা দাদীকে মূল্যায়ন করা হতো, তাদের মতামত ও উপদেশকে জীবনের পাথেয় বলে গণ্য করা হত, এখন তারা পরিবারের মধ্যে অপাংক্তেয়। তাদের জীবন আদর্শ এখন একটি মৃত বিষয়। বৃদ্ধ দাদা দাদীর সদুপদেশ আমাদের শিশুকালে নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিত, এখন সেই সব পারিবারিক ঐতিহ্য মৃত। এখন ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে আমরা যা খুশি তা করার শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি আমাদের সন্তানদের । আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি অবহেলার ফলেই আমাদের সন্তানেরা আজ মূল্যবোধহীন। তারা আজ জীবন উপভোগের নামে নানা অপকর্মের প্রতি আগ্রহী। বখে যাওয়া একটা উচ্ছৃঙ্খল জীবনকে তারা আধুনিকতা বলে ধরে নিয়েছে। যার ফলে ইভ টিজিং নামের এই মহামারীর এই চরম প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
আমাদের সামাজিক জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আগে গ্রামে গ্রামে পঞ্চায়েত বা মোড়ল প্রথা ছিল। শহরে মহল্লায় মহল্লায় ছিল পঞ্চায়েত প্রথা। মহল্লার সর্বজনমান্য কোন বৃদ্ধ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এই পঞ্চায়েতের প্রধান হতেন। মহল্লার নানা পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা এই সব পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সমাধান করা হতো। আধুনিকতার নামে আমরা এই ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পঞ্চায়েত প্রথাকে বর্জন করেছি। তাছাড়া বর্তমানে টিকে থাকা থাকা পঞ্চায়েতগুলোরও অবস্থা ভালো নেই। আগে যেখানে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কোন ব্যক্তি পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হতেন, বর্তমানে সেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোন ধান্দাবাজ পঞ্চায়েত কমিটি দখল করে নিয়েছে। ফলে পঞ্চায়েত কমিটির প্রতি মানুষের পূর্বে সেই শ্রদ্ধা ও আস্থা আজ আর নেই। ইভ টিজিং এর মতো একটি সামাজিক সমস্যা অনায়াসে এই পঞ্চায়েত কমিটির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যেত।
তাছাড়া যে সব কিশোরী ও তরুণীরা ইভটিজিং এর শিকার হয়, তাদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও নেতিবাচক। এ সব ক্ষেত্রে প্রায় সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা মেয়েটিকে দায়ী করে। সামাজিকভাবে জানাজানি হলেও মেয়েটিকে দোষ দেয়া হয়। ফলে যারা ইভটিজিং এর শিকার হয়, তারা অবশেষে আত্মহত্যাকেই শ্রেয় বলে মনে করে। পরিবার ও সমাজ তাদের এই সমস্যা থেকে উদ্ধারের জন্য সমব্যথী হয়ে এগিয়ে এলে এত এত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটত না।
একটা সময় ছিল যখন শিক্ষককে সমাজের সবচেয়ে সৎ ও জ্ঞানী মানুষ হিসেবে মানুষ শ্রদ্ধা করত। গ্রামের মধ্যে শিক্ষকদের মানুষ নির্দ্বিধায় শ্রদ্ধা করত। কিন্তু এখন আর সেই দিন নাই। সর্বগ্রাসী দারিদ্রের শিকার আমাদের শিক্ষকরা এক সময় কিছু বাড়তি আয়ের জন্য বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। সেই সামান্য প্রাইভেট টিউশনি এখন কোচিং সেন্টারে রূপ নিয়েছে। এখন প্রাইভেট কোচিংএর নামে শিক্ষকরা এখন ক্লাশের বাইরে পড়াতে বেশি আগ্রহী। জ্ঞানদান নয়, অর্থ উপার্জনই এখন শিক্ষকতা পেশার মূল ব্রত। শহর বন্দর ঘুরে কোচিং নির্ভর শিক্ষ এখন গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা এখন অন্য যে কোন পণ্যের মতো পয়সা দিয়েই কেনা যায় বলে একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার সাথে যে নৈতিক শিক্ষার সম্পর্ক সেটা এখন আর মানুষকে টানে না। বরং কোন উপায়ে সার্টিফিকেট অর্জনই শিক্ষার ব্রত হয়ে পড়েছে। নীতিহীন এই ধরনের শিক্ষা নীতিহীন একদল তরুণ তৈরি করবে, সেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয় না।
যারা ইভ টিজিং এর সাথে জড়িত সেই সব বখাটেরা মূলত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর দল। এরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে অনেক আগেই। ফলে পড়াশোনার এক পর্যায়ে ফেইল মেরে শিক্ষাজীবনের ইতি টেনেছে অকালেই। যা কিছু সামান্য শিক্ষা অর্জন করেছে, সেটাও কোচিং নির্ভর নৈতিকতাহীন শিক্ষা। ফলে বখে যাওয়া এই তরুণরা যে কোন উপায়ে জীবনকে উপভোগ করতে আগ্রহী। তাদের কাছে ইভ টিজিং হল একটা বিনোদন।
আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিরাট। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির কাছে আজ আমাদের সংস্কৃতি ধরাশায়ী। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে গড়ে ওঠা টিভি চ্যানেলগুলো মূলত বিদেশী বিজাতীয় অনুষ্ঠানগুলোর নকল অনুষ্ঠান বানাতে ব্যস্ত। তাছাড়া বিদেশী চ্যানেলগুলো এখন আমাদের টেলিভিশন জুড়ে রয়েছে। এ সব চ্যানেলের অনেক অনুষ্ঠান সেক্স ও ভায়োলেন্সে পূর্ণ। নাটক ও সিনেমায় ইভ টিজিং দেখানো হচ্ছে অহরহ। ইভটিজিংকে প্রেম ভালোবাসার মোড়কে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফ্যান্টাসিতে ভোগা একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর টেলিভিশনের নাটক ও সিনেমায় দেখানো ইভটিজিংকে ফ্যাশন হিসেবেই শিখছে। ফলে ইভ টিজিং যে একটা অপরাধ, এই বোধটাই তার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তরুণরা একটা বড় সময় কাটায় টেলিভিশনের সামনে। তাদের মনোজগতের একটা বড় জায়গা গঠন করে টেলিভিশনের প্রোগ্রামগুলো। দিনের পর দিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখা ইভটিজিংকে ফ্যান্টাসি না ভেবে যখন জীবনে প্রয়োগ করতে যায় তখনই বাঁধে বিপত্তি।
আমাদের দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিদেশী অনুষ্ঠান নকল না করে দেশীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে পারত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি।
আমাদের রাজনীতির সাথে এখন কোন নৈতিকতা নেই। আমাদের রাজনীতি মানে হল যে কোন উপায়ে ক্ষমতার স্বাদ নেয়া। বৈধ অবৈধ উপায়ে বিপুল বিত্তের মালিক হওয়াই এখনকার রাজনীতির অন্যতম মূল লক্ষ্য। রাজনীতিতে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীও আছেন, কিন্তু এ সব সুবিধাবাদী ধান্দাবাজদের চাপে তারা এখন কোণঠাসা। ফলে তরুণ সমাজের সামনে এমন কোন নেতা নেই যাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে একটা বড় স্বপ্ন দেখা যায়। বরং নষ্ট নেতার পেছনে আরও অনেক নষ্ট তরুণরাই সংঘবদ্ধ। এই সব তরুণদের সাঙ্গপাঙ্গ বখাটেরাই ইভ টিজিং এ একটা বড় ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে যে দখলের রাজনীতির সাথে এরা পরিচিত, সেই দখল প্রক্রিয়ায় নারীকেও তারা দখলের সামগ্রী হিসেবেই বিবেচনা করে। রাস্তাঘাটে স্কুলে বা কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথে, বিপণি বিতানে তারা তরুণীদের দেখলেই টিজ করতে শুরু করে। নষ্ট তরুণদের পেছনে থাকা এই রাজনৈতিক প্রভাব সরে না গেলে ইভ টিজিং সহসা কমবে না।
অন্য দিকে ইভটিজিং এর অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গেলে সেটা ভালোভালে আমলে না নেয়ারও অভিযোগ আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তো আমাদের এই সমাজের প্রতিনিধি। ইভ টিজিংকে একটা লঘু অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়ে গেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে।
আমাদের দেশে আইন-কানুনের পাশাপাশি আইনের ফাঁকও আছে। ইভটিজিং এর প্রতিকারের জন্য পর্যাপ্ত আইনও নাই। সরকার নতুন আইন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির বিধান করতে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু কেবল আইন করে ইভ টিজিং এর মতো সামাজিক সমস্যা কমানো যাবে না বলে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও স্বীকার করেন। দরকার ব্যাপক সামাজিক সচেতনা ও সক্রিয় পদক্ষেপ।
এই যুগের নারীরা ঘরে থাকবে না, সেটাই বাস্তবতা। তারা শিক্ষা গ্রহণের জন্য ঘর থেকে বেরুবে। তারা কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরুবে। তারা পুরুষের পাশাপাশি আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন। পুরুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব তাদের চারপাশ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া। তাদের চলাফেরা নির্বিঘ্ন করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব । যেখানেই ইভটিজিং সেখানেই প্রতিরোধ ছাড়া এই মহামারী থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
যেই দেশে প্রধানমন্ত্রীও একজন নারী এবং বিরোধী দলের নেত্রীও একজন নারী, সেই দেশে ইভটিজিং হয়, এটা ভাবতেই আমাদের লজ্জা লাগে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


