দৃশ্যপট - ০১ :
ছাত্র পড়াশোনায় মনোযোগী। স্কুলেও যায় নিয়মিত। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তার মনে হল, অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে সে সামান্য পিছিয়ে। তাই পরীক্ষার আগে এক গৃহ শিক্ষক রাখা হল। ছাত্রকে গৃহ শিক্ষক বিকেলে এক ঘণ্টা পড়ায়। ফলে ফাইনাল পরীক্ষায় সে ভালো ফলাফল করল।
দৃশ্যপট - ০২ :
দশ বছর পর । এই ছাত্রও পড়াশোনায় মনোযোগী। স্কুলে যায় নিয়মিত। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তার মনে হল, অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে সে সামান্য পিছিয়ে। তাই পরীক্ষার আগে সে এক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হল। কোচিং সেন্টারের শিক্ষক তাকে প্রতিদিন বিকেলে দুই ঘণ্টা পড়ান। ফলে ফাইনাল পরীক্ষায় সে ভালো ফলাফল করল।
দৃশ্য পট - ০৩ :
আরও দশ বছর পর। এই ছাত্রও পড়াশোনায় মনোযোগী। স্কুলে যায় নিয়মিত। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তার স্কুল মনে করল, অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে সে সামান্য পিছিয়ে। তাই পরীক্ষার আগে তার স্কুল কর্তৃপক্ষ কোচিং শুরু করল। স্কুলের ক্লাশ শুরুর আগে এক ঘণ্টা এবং পরের এক ঘণ্টা তাকে স্কুলের শিক্ষকের কাছেই কোচিং করতে হয়। আর সাপ্তাহিত ছুটির দিনগুলোতেও তাকে স্কুলে গিয়ে কোচিং করতে হয়। তারপর তাকে প্রতি বিষয়ে কোন শিক্ষকের কাছে কোচিংএ পড়তে হয়। তার জীবন কোচিংময়। কোচিংএর বাইরে তার আর কোথাও যাওয়ার সময়ও নাই। ফলে ফাইনাল পরীক্ষায় সে ভালো ফলাফল করল।
সামান্য কথা :
আগে স্কুলের বাইরে কোচিং ছিল। এখন স্কুলগুলোই কোচিং সেন্টার হয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা, জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষা বা বৃত্তি পরীক্ষা, এস.এস.সি পরীক্ষাকে উপলক্ষ করে প্রতি স্কুলেই কোচিং দেয়া হয়। এই কোচিং সাধারণও স্কুলের ক্লাশ শুরুর আগে ও পরে করানো হয় এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোকে করানো হয়। এই কোচিং বাবদ স্কুলের শিক্ষকরা অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করে থাকে। এই টাকা তারা ভাগাভাগি করে নেন।
এছাড়া যেই যেই শিক্ষক পেরেছেন, স্কুলের বা কলেজের বাইরেও কোচিং সেন্টার খুলে বসে আছেন। তিনি স্কুলে বা কলেজে পড়ানোর চাইতে কোচিং সেন্টারেই পড়াতে বেশি আগ্রহী। কেননা, কোচিং সেন্টার মানে কাচা পয়সা।
অন্য কথা :
এই কোচিং বাণিজ্যের জন্য কেবল শিক্ষকরা এক তরফা দায়ী নয়। দায়ী এক শ্রেণীর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীও । অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আছেন, যারা মনে করেন কোচিং সেন্টারে না পড়লে কোন ক্রমেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব না। কিন্তু এটা একটা ভুল ধারণা।
এমনকি অনেক শিক্ষার্থী বাংলা, ইসলাম ধর্ম, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদির মতো সহজ বিষয়গুলোও পড়ার জন্য কোচিং সেন্টারে দৌড়ায়। ফলে সারা দিন ধরে তাকে কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে দেখা যায়। এই কোচিং সেন্টারে দৌড়াদৌড়িটা এখন হিস্টিরিয়া রোগের মতো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
শেষ কথা :
শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দেন মাঝে মধ্যে। কিন্তু স্কুলগুলোতে কোচিং সেন্টার খুলে বসা সম্পর্কে তিনি কি ওয়াকিবহাল কিনা আমার সন্দেহ আছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কোচিং নির্ভর বানিয়ে ফেলেছে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। এখন কোচিং সেন্টারই স্কুল চালাচ্ছে। কে কোন স্কুলে পড়ছে তার চাইতে কে কোন কোচিং সেন্টারে পড়ছে এবং কতগুলো শিক্ষকের কাছে কোচিং করছে, সেটাই হয়ে উঠেছে ভালো ফলাফলের নিয়ামক। ফলে পরিষ্কার বলা যায়, কুকুর লেজ নয় বরং লেজই কুকুরকে নাড়াচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


