সমকাল প্রতিবেদক
বাজারে টাকার প্রবাহ যে হারে বাড়ছে সে হারে নতুন শেয়ারের সরবরাহ না বাড়ায় ক্রমেই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে শেয়ারবাজার। অল্পসংখ্যক শেয়ারের পেছনে ছুটছেন অনেক বিনিয়োগকারী। এতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে বেশিরভাগ শেয়ারের দাম। একই সঙ্গে বাড়ছে বিনিয়োগের ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার অভাবও শেয়ারবাজারে ভারসাম্যহীনতাকে বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজার সম্পর্কে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তারা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ছুটছেন গুজবের পেছনে। যেসব শেয়ার অতিমূল্যায়িত তাদের আগ্রহ যেন সেগুলোর প্রতিই বেশি। আয়ের বিপরীতে আর্থিক খাত এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম তুলনামূলক কম হলেও এগুলোর দিকে তাদের মনোযোগ কম। এ ধরনের মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে সহজেই 'বাজারকারসাজিতে' করে যাচ্ছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট। গত সপ্তাহে এ বিষয়টি আবার নতুনভাবে সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজারের টেকসই বিকাশ ও স্থিতিশীলতার জন্য দ্রুত শেয়ার সরবরাহের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এছাড়া গত বুধবার হঠাৎ বাজারে বড় ধরনের যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল সে ধরনের ঘটনা এড়াতে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।
শেয়ারবাজারে গত সপ্তাহটি ছিল ঘটনাবহুল এবং নানা রেকর্ডে ভরপুর। শেয়ারবাজারে আগের দুই সপ্তাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারা গত সপ্তাহেও ছিল। সপ্তাহের প্রথম তিন দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাধারণ সূচক বেড়েছিল ৭২ পয়েন্ট। বুধবার সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসেও এক পর্যায়ে এই সূচক ৫৪ পয়েন্ট বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু এর ঠিক পরপরই হঠাৎ করে বাজারে অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় বড় দরপতন। এক পর্যায়ে সূচক ১৫৮ পয়েন্ট কমে যায়; যদিও শেষ পর্যায়ে সূচক কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। দিন শেষে সূচক দাঁড়ায় আগের দিনের চেয়ে ৯০ পয়েন্ট কম। জানা যায়, দিনের মাঝামাঝি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) এক কর্মকর্তা টেলিফোনে কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও বড় ব্রোকার প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার কেনা-বেচায় বিদ্যমান আর্থিক সমন্বয় সুবিধা (নেটিং) স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন (নেটিং সুবিধা হচ্ছে_ বিক্রীত শেয়ারের মোট মূল্যের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থের শেয়ার কেনার সুযোগ)। কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই দিনের মাঝভাগে হঠাৎ করে নেটিং বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী চরম বিপদে পড়েন। তারা দিনের প্রথম ভাগে শেয়ার কিনেছিলেন এবং দিনের শেষ ভাগে অন শেয়ার বিক্রি করে মূল্য সমন্বয় করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। সমন্বয়ের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের মাথায় যেন বাজ পড়ে। এই ঘটনায় পুরো বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যে কারণে শুরু হয় বড় ধরনের মূল্যপতন। তবে এই মূল্যপতনের দিনেও ডিএসইতে লেনদেনের নতুন রেকর্ড হয়। আর এই ঘটনাটি নানা প্রশ্নকে সামনে তুলে আনে। বিনিয়োগকারী, মার্চেন্ট ব্যাংকার, ব্রোকারসহ বাজার সংশ্লিষ্ট অনেকেরই সন্দেহ, একটি মহল সস্তায় শেয়ার হাতিয়ে নিতে এ ঘটনা ঘটায়। আর এর সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই যোগসাজশ আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু লোকের। তাদের বক্তব্য, বাজারের লাগাম টেনে ধরতে চাইলে এভাবে দিনের মাঝভাগে নেটিং বন্ধ না করে নির্দিষ্ট একটি দিন থেকে এটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারত এসইসি। এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার প্রদত্ত ঋণের অনুপাত কমিয়ে এনেও এটা করা সম্ভব ছিল।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইতে ৬ হাজার ২১ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ৫৮৮ কোটি টাকা বেশি। লেনদেন বেড়েছে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আলোচিত সপ্তাহে ডিএসইতে ২৪৬ কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা হয়, যার মধ্যে দাম বাড়ে ১২২টির, কমেও ১২২ কোম্পানির শেয়ারের দাম। ডিসএসইতে সাধারণ সূচক ১১৫ পয়েন্ট বেড়ে ৪ হাজার ৮৩৮ পয়েন্ট উন্নীত হয়, যা এই সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থান। সপ্তাহের শেষ দিনে ডিএসইর বাজার মূলধন প্রথম বারের মতো ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত দুটি পৃথক বৈঠকের সিদ্ধান্তও ছিল পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। একটি বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে শেয়ারবাজারে তারল্য আরও বাড়বে। অন্য বৈঠকে ৬ মাসের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬ কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে বাজারে শেয়ার সরবরাহের সংকট আপাতত অনেকটাই কেটে যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


