ইসলাম সম্পর্কে এমন কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই যে, এটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। ইসলামকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা বড় অন্যায় এবং রাজনীতিতে এটিকে টেনে আনা উচিৎনয় শুধু, রিতিমতো অপরিহার্য। কেন না, বিশ্ব ইতিহাসে সোনালি ও সমৃদ্ধ রাজনীতি একমাত্র ইসলামই উপহার দিতে পেরেছে এবং পারবে।
রাসুল (সাঃ) কে দুনিয়াতে কেন পাঠানো হয়েছিল? বিশ্বের একমাত্র প্রতি পালক আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সৃষ্টি মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান পাঠালেন এবং তা বাস্তবে রূপায়নের জন্য পাঠালেন অসংখ্য নবী রাসুলকে। তারা কেবল ব্যক্তি গত পর্যায়ে এ ধর্ম পালনে সিমাবদ্ধ থাকেন নি। বরং তাদের আসল উদ্দেশ্যই ছিল ব্যাপক ভাবে এটাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এর কল্যাণ সবার কাছে পোঁছে দেয়া।
ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের ব্যাপার হলে আমাদের রাসুল (সাঃ) কে ইতিহাসের সীমাহীন ও মর্মান্তিক বাধা বিঘ্ন মোকাবেলা করার প্রয়োজন হতো না। কুরাইশরাতো তাকে অঢেল সম্পদ সহ সবকিছু দিতে চেয়েছিল শুধু একটা জিনিসের বিনিময়ে যে তিনি যেন ইসলামকে নিজের মধ্যেই সিমাবদ্ধ রাখেন। অন্যদের কাছে তা পোঁছে দিয়ে তাদের দলভুক্ত করে যেন সংঘবদ্ধ না হন। কিন্তু রাসুল (সাঃ) কে কোনো কিছুই তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কারণ ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্যই, আল্লাহ তা'য়ালা রাসুল (সাঃ) কে এই দুনিয়াতে পেরন করেছেন।
ধর্ম যদি নিতান্তই ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিষয় হয়ে থাকে তাহলে ধর্মের চমৎকার অনুশাসনের আলোকে সমাজ ব্যবস্থা কি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? সমাজের কুৎসিত কর্মকান্ড গুলো নিবারণের দায়িত্ব ধর্মইতো নিয়ে থাকে। সমাজ তথা দেশ কিংবা বিশ্ব সুন্দরের পথে এগিয়ে যেতে ধর্মের সাহায্য গ্রহন অনিবার্য। তাহলে আর ধর্ম ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকে কী করে?
ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার হলে দুনিয়াজুড়ে লাখ লাখ মসজিদ এবং সে খানে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের দরকার ছিল,না। দরকার ছিল না, ঈদগাহে ঈদের জামাতের কিংবা হজ মৌসুমে হারাম শরীফে লাখ লাখ মুসলমানের একত্রিত হওয়া।
যারা নিজের প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীস্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা করে কেবল তারাই ধর্মকে ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে ব্যবহার করতে কুন্ঠা করেনা। ধর্মকে তারা গণতন্ত্রে বিশেষ করে ভোটের সময় স্বার্থ হাসিলের মৌসুমি হাতিয়ার মনে করে এবং তা ব্যবহার করে ফায়দা লোটে। ইসলামের সত্য ও সুন্দর বিধান প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের প্রকৃত স্বার্থের মূলে চরম কুঠারাঘাত হবে জেনেই তারা ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করতে অঙ্গিকারবদ্ধ। অনেকে আবার আরো একটু অগ্রসর ও ক্ষিপ্ত হয়ে এটাকে নির্মূল করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়, অন্যায় ভাবে গায়েরজোরে মানুষ মারে এবং গালা গালের আশ্রয় নেয়। এ ধরনের ঘোষণা কিংবা মানসিকতা গণতন্ত্রে সমর্থনযোগ্য কি না সে প্রশ্ন করা হলে তারা এর সদুত্তর দিতে পারে না। মজার ব্যাপার হলো, এরা আবার গণতন্ত্রের উত্তপ্ত দাবিদার। গণতন্ত্রের জন্য তাদের মায়াকান্না দেখলে বোঝা যায় তারা যেন এর দরদে ফেটে পড়ছেন। মুখে গণতন্ত্রের স্লোগান এবং আড়ালে গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিভ্রান্ত প্রচারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের ঘোষণায় তাদের কোনো বাধা নেই। কেন না, ধর্ম পরিত্যক্ত হলে ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি কোনো বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায় না। অথচ ধর্মকে চার দেয়ালের মধ্যে সুরক্ষার স্লোগানদতাদের কখনই বাংলাদেশের জনগণ স্বাগত চোখে দেখেনি, দেখবেও না।
দুঃখের বিষয় কিছু নাম ধারী মুসলমান, তারা নিজেকে মুসলমান দাবীকরে আবার ধর্মনিরপেক্ষ ও দাবীকরে! কোনো প্রকৃত মুসলমানের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ধারণ করার সুযোগ নেই। মুসলমান মানেই হলো তিনি একটি বিশেষ ও পরিচ্ছন্ন বিশ্বাসের উন্নত ও শুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। নিরপেক্ষতার দাবি এখানে মোটেও বাস্তব সম্মত নয়। অবশ্য যিনি ঘটনাচক্রে মুসলমান তার কথা ভিন্ন। কারণ, একজন মুসলমান কোনো অবস্থাতেই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' এই পবিত্র কালেমা পাঠের মাধ্যমে ঈমানদার ব্যক্তি সর্বক্ষণ মুসলমান বা ইসলাম ধর্মের একজন গর্বিত অনুসারী হিসেবেই থাকেন। এ শাশ্বত কালেমায় বিশ্বাস করলে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণ করতে তিনি বাধ্য। এমতাবস্থায় ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুটিয়ে রেখে ইসলামমুক্ত তথা ইসলামবিরোধী রাজনীতি গ্রহণ করার কি অধিকার তার থাকতে পারে! আমরা দেখেছি ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের বাইরে যারা দেখতে সাংঘাতিক অনিচ্ছুক তারা মূলত এর প্রচ্ছন্ন কিংবা ক্ষেত্রভেদে প্রকাশ্য বিরোধিতাই করে। তাদের মনোভাব এমন যে, ধর্মকে বড়জোর মসজিদ-মাদ্রাসা পর্যন্ত তালাবদ্ধ রেখে রাজনীতির মতো ময়দানে তারা নিজেরা যে ভাবে খুশি লুটেপুটে খাবে। ইসলমের ইতিহাস উল্টালে দেখা যায় যে, রাসুল (সাঃ) এর নবুয়তের পথম দিকে দওয়াতী কার্যক্রমকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে হিজরতের পর মাদানী জীবনে তিনি রাজনৈতিক বিষয়ের প্রতি দৃঢ় মনযোগী হন। তিনি উপলব্দি করেছিলেন যে, ইসলাম প্রচার এবং বিশ্ব সমাজের কাছে তা সঠিকভাবে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি চমৎকার রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের বাস্তবায়ন ছাড়া এর সুফল বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে দেয়া অসম্ভব। ইসলাম একটি সর্বাঙ্গীণ শাশ্বত জীবন বিধান। সামাজিক, অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক, দার্শনিক এমন কোনো বিষয় নেই যা ইসলামে অনুপস্থিত। সুতারাং মানব চরিত্রের যথার্থ উৎকর্ষ সাধন, সমাজে বা রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সর্বোপরি সুখ ও শান্তি-শৃঙ্খলাপুর্ণ সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য ইসলামের কোনো বিকল্প নেই। তবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির যারা উদ্যগতা তারা এ মহা সত্যকে কখনোই স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত নয়। স্বীকার করে নিলেই ইসলামের জন্য কাজ করা তাদের পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়বে এই ভয় বোধ করি সব সময় তাদের তাড়া করে ফেরে। আর ইসলামের পক্ষে কাজ করলে, তারা চুরি করতে পারবেনা, কোন রকম অন্যায় করতে পারবে না , সে খানেই তাদের ভয়।
ইসলামকে সঠিকভাবে না বোঝার কারণে যারা এতে রাজনীতির উপস্তিতি স্বিকার করতে চান না, তাদের সময় এসেছে নতুন করে ইসলাম বিষয়ে ভালোভাবে অধ্যয়নের। জাতির কল্যাণে যেসব রাজনীতিবিদ নিজকে উৎসর্গ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদের উচিত ইসলামী মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করা। আর যেসব বুদ্ধিজীবী কিংবা কলামিস্ট ইসলাম বিষয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতিকে গতিদান করছেন তাদের উচিত নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি ইসলামের বিপক্ষে নয় বরং এর সপক্ষে কাজে লাগানো। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, দুনিয়ার প্রতিটি কথা, কাজ ও চিন্তার জন্য কিয়ামতের দিন মহাপ্রভু আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

