somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবা হওয়া খুব কষ্টের মাঝেও অনেক আনন্দ।

১০ ই জানুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৫:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দশ জানুয়ারী ২০০৯ পছন্দের মেয়েটিকে অনেকটা হুট করে জীবন সঙ্গী করে নিয়েছি। দুই পরিবারের কারো সম্মতি, কাহারবা অসম্মতি দুইটা জীবনকে একটি বন্ধনে আবদ্ধ হতে কোন বাঁধাই রুখতে পারেনি। বিয়ের এক মাস পর ছুটি শেষ করে প্রবাসে চলে আসি। পরিচিত জনরা বিয়ের সংবাদের সাথে, আরও একটি সংবাদ জানতে চায়, সবাইকে না সূচক উত্তর দিলে, অনেকে সাহস করে জানতে চায়, আসলে সমস্যাটা আপনার নাকি ভাবীর?
তখন বাধ্য হয়ে বলতে বাধ্য হতাম যে ডাক্তারই দেখায়নি কি ভাবে বলবো সমস্যাটা কার। আর আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। বিয়ের পর বাড়িতে ছিলাম এক মাস এবং যিনি মা হবেন উনার পরীক্ষার কথা বলে , কথা অন্য প্রসঙ্গে ঘুরানোর চেষ্টা করতাম।
এক বছর প্রবাসে থেকে দেড় মাসের ছুটিতে দেশে গেলাম, তাও ডাক্তার দেখানোর ইচ্ছে হল না। কারণ ভাইদের মধ্যে যিনি আমার বড় জন তিনি তখনও সন্তানের বাবা হতে পারেননি। তাই নিজেও ভাবলাম আল্লাহ যদি সন্তান-দেন এমনিতেই দিবেন, ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা, আরও পরে ভেবে দেখবো। কিন্তু ছুটি শেষ করে যখন প্রবাসে আসলাম এই বার আগের চাইতে বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম এবং বুঝতে পারলাম আমাদের ছোট দুই ভাইয়ের সন্তান হওয়া নিয়ে আমাদের চাইতে, আমাদের বড় ভাই বেশি চিন্তিত। বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারলাম উনি রেগে আছেন, কেন ডাক্তার দেখালাম না।
আবারো প্রায় এক বছরের মাথায় ছুটিতে গেলাম এবং পারিবারিক প্রয়োজনে তিন ভাই এক সঙ্গেই দেশে গেলাম। কোম্পানির কাছ থেকে আবেদন করে এক মাসের জায়গায় তিন মাস ছুটি নিলাম। বড় ভাই ভাবীর মাধ্যমে সব সময় আমাদের খোজ খবর নিচ্ছেন এবং হুমকি দিচ্ছিলেন যে এইবার যদি এরা ডাক্তার না দেখায় বা সন্তানের মুখ না দেখে তাহলে আগামী ছুটিতে এদের দেশে আসতে দেয়া হবেনা।
আমি প্রথম মাসেই বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা বুঝতে পারলাম। এক দেড় মাসের সময় জীবন সঙ্গিনীর কষ্ট দেখে এবং বড় ভাইয়ের চাপে ডাক্তারের কাছে নিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু ডাক্তার বলে এগুলো স্বাভাবিক এই সময়ে বমি এবং খাওয়ায় গন্ধ ইত্যাদি কোন সমস্যা না। আমরা যখন ডাক্তার দেখিয়ে চেম্বার থেকে বাহির এসে ভাবীর হাতে ঔষধের প্রেসকিপসন দিয়েছি, তখন বড় ভাই ঐ প্রেসকিপসন নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেয়ে হাজার প্রশ্নে ডাক্তারের মাথা দিলেন বিগড়ে।
উনি বলতে চাইলেন এই সময় বেশি পাওয়ারের ঔষধ খাওয়া ঠিক হবে না। এক মুহূর্তে ঐ ডাক্তারনিকে বাদ দিয়ে। রোগিণীকে আপন করে চিকিৎসা করেন এমন ডাক্তার খোজ করে, তারপর চিকিৎসা শুরু হল।
তিন মাস ছুটি শেষ করে চলে আসলাম প্রবাসে, বড় ভাই আমার আগেই চলে এসেছিলেন। উনি আসার পর থেকেই আম্মা বাবা ভাবীদেরকে ফোন করে খোজ খবর নিচ্ছেন এবং হরেক রকম উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমি যখন আসলাম, তখন নেটে মোবাইলের জ্বালায় বাড়ির সবাই প্রায় বিরক্ত, কিছুই করার নাই, আগে যে প্রবাসে একাকীত্ব শূন্যতা, এখন তার চাইতেও বেশি। মাথায় একটিই চিন্তা দেশের আপনজন। একটি দেহের মধ্যে আরেকটি দেহ। কি ভাবে দিন পার করছে, খোজ নিয়ে জানতে পারি এই পা পুলে যাচ্ছে তো, এখন শরীরের এই অংশে ব্যথা-তো কিছুক্ষণ পর অন্য অংশে ব্যথা। সারাক্ষণ নিজের মন পড়ে আছে দেশে। নেট বই থেকে বা বন্ধুদের কাছ থেকে নতুন কোন টিপস বা পরামর্শ পেলেই দেরি না করে জানিয়েছি। অনেক সমস্যার কথা অপর পান্থ থেকে জানাচ্ছে, আমিও জেনে গুগল মামার সাহায্য নিয়ে সমাধান খোজার চেষ্টা করেছি, ক্ষেত্র বিশেষে চিন্তা মুক্ত হয়েছি। সময়টা খুব ব্যস্ত কাটিয়েছি। মা হওয়া কত কষ্টের, বাবা হয়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
আমার এবং বড় ভাইয়ের পক্ষ থেকে পরামর্শ ছিল, যে কোন অবস্থায় ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার। ডাক্তার একটা সময় দিয়েছিল, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর। ২০ ডিসেম্বর এদিক সেদিক কিছু বুঝতে না পেরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তারও নিজের কাছে পর্যবেক্ষণে রাখতে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল। ডাক্তার কে অসংখ্য ধন্যবাদ, ডাক্তারনি দিন রাত কষ্ট করে রোগিণীকে দেখেছেন।
আম্মা আমাকে সান্ত্বনা দিল যে, উনি আলট্রা করতে মনিটরে দেখেছেন সব কিছু ঠিক আছে, শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে, আমিও আম্মাকে তাই বললাম। মনের মধ্যে হাজারো চিন্তা উকি ঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে। দেশে জীবন সঙ্গিনী হাসপাতালের বেড়ে, আর আমি প্রবাসে নিজ রুমে হাসপাতালের বেড়ের মতই বেড়ে একবার শুই আবার কম্পিউটারে বসে দেশে কল করি। সারা জীবন জানতাম ব্যথা সারার জন্যে মানুষ ঔষধ খায়, কিন্তু আমার জীবন সঙ্গিনীকে ব্যথা হওয়ার জন্যে ঔষধ এবং ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে কিন্তু ব্যথা হয় আবার ভাল হয়ে যায়। আমাকে ফোনে বলে আমার ব্যথা আসার জন্যে দোয়া কর! তখন আমি বললাম, আল্লাহ ব্যথা না দিয়ে সন্তানকে পাঠিয়ে দিন, ঐ দিক থেকে বলল, ডাক্তার বলেছে ব্যথা আসতেই হবে। তখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ছিল, যত কম ব্যথা এবং আমার জীবন সঙ্গিনীর সহ করার মত ব্যথা দিয়ে সন্তান কে দুনিয়াতে পাঠিয়ে দাও। আল্লাহ তালা হয়তো এই নয় দশ মাসে অসহ ব্যথার মাধ্যমে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা বৃদ্ধি করেন।
আমি আগেই জীবন সঙ্গিনীকে বলে রেখেছিলাম, যেহেতু ২১শে ফেব্রুয়ারীতে তুমি দুনিয়াতে এসেছ, তোমার সন্তানও হয়ত মাস ডিসেম্বর হলেও ঐ ২১ তারিখই মেইনটেইন করবে। ২০ তারিখ রাত খুব কষ্টের মধ্যে পার করছিলাম। কিছুক্ষণ পর পর ফোন করতে ছিলাম দেশে, লজ্জা সরম রেখে আম্মা এবং শাশুড়ির কাছ থেকে খোজ নিচ্ছিলাম। ২১ তারিখ সৌদি আরব সময় ফজরের আগে, বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা হবে, বিছানায় শুয়ে চটপট করতেছি, এমন সময় বড়বোন ফোন করে জানাল উনার বাতিজা হয়েছে, এবং সব কিছু নরমাল।
নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করলাম। আম্মার কাছে ফোন দিলাম, আম্মাসহ সকলেই খুব খুশি, সব কিছু স্বাভাবিক আছে, আম্মা আনন্দের সাথে এক টানা নাতির বর্ণনা দিয়ে গেলেন।
এবং আমি যার কণ্ঠ শুনার জন্যে অপেক্ষা করছি তার সাথে কথা বলতে বললেন।
কেমন আছ জিজ্ঞেস করতেই বলে, এই সময় কেউ কি ভাল থাকে! কেমন লাগছে জানতে চাইলে বলে, কি যে কষ্ট হয়েছিল এবং হচ্ছে, মনে-হচ্ছে তোমার সন্তান কে দেখে যেন আস্তে আস্তে সব ভুলে যাচ্ছি। তবে যখন বেশি ব্যথা করছিল তখন তোমাকে অনেক বকা দিয়েছি। জানতে চাইলাম কেন, আমার কি দোষ? বলে আমার এই অবস্থায় তুমি আমার পাসে নাই। অসহায়ের মত নিজের অপরাধ মাথা পেতে নিলাম। তারপর এক দুই ঘণ্টা আগে পৃথিবীর মুখ দেখা সন্তানের গুন কীর্তন করেই গেল, কষ্টের কথা যেন কিছুই মনে নেই।
প্রতিদিন নেটে বসে জীবন সঙ্গিনীর সাথে কথা বলতাম, কিন্তু সন্তান দুনিয়াতে আসার ২৪ ঘণ্টার পরেও যখন সন্তানকে দেখতে না পেরে অনেকটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম। স্ত্রীর কাছে শুনেই যেন নিজ সন্তানের জন্যে কেমন এক টান অনুভব করছি। আমার চাপা চাপিতে, এদিক সেদিক লড়তে না পারলেও ল্যাপটপ নিয়ে নেটে এসে সন্তানের ছবি পাঠাল এবং সন্তানকে সরাসরিও দেখাল, নিজের মনটা যদিও কিছুক্ষণের জন্যে শান্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন দিন নেই রাত নেই, আমি যে রকম ফোন করে জ্বালাতন করি সন্তানের মা কে, একই ভাবে সময়ে অসময়ে কান্না করে সন্তানও জ্বালাতন করে তার মা কে। বাবা এবং মা হওয়া খুব কষ্টের মাঝেও অনেক আনন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:২৭
২২টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×