somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মায়ের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা

০৮ ই মে, ২০১১ বিকাল ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি নয়মাস দীর্ঘ নয়মাস প্রহর গুণেছি কখন আমার মা মারা যাবে। হয়তো সবাই এক পলকেই ভেবে নিয়েছেন আমার মতো কুলাঙ্গার ছেলে বা সন্তান দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু তবু বলব হ্যা আমি আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছি। কান সজাগ রেখেছি। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রয়েছি কখন আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ আসবে। সেই দিন এলো অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবসের আনন্দকে ম্লান করে দিয়ে আমার মা বিদায় নিলেন।
এর ঠিক নয় মাস আগে:
বাবা একদিন ফোন করলেন।আমরা ঢাকায় আসছি। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম আমরা মানে আর কে কে? বাবা বললেন তোর মাও। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মার তো ঢাকায় আসার প্রশ্নই আসে না। কারণ ঢাকায় আমাদের বংশের কেউ থাকে না যেখানে মা বেড়াতে আসবে। তাছাড়া মা ছিল গ্রামের একজন অতি সাধারণ মহিলা। মা কোনো দিন অলংকার ব্যবহার করেননি। সামর্থ্য নেই সেজন্য নয়। মা সাধারণ জীবন যাপন পছন্দ করতেন। তিনি শহরের যান্ত্রিকতা, ব্যস্ত কোলাহল, সহ্য করতে পারতেন না। তাই পারতপক্ষে তিনি শহরের নাম করতেন না।তাই আমি একটু ভাবনায়ই পড়লাম। বাবাকে আবার ফোন করলে বাবা বললো মার চিকিৎসার জন্য। বাবা জানালেন মার যা রোগ হয়েছে তার চিকিৎসা বরিশালে হবে না। এবার আমার মনে ভয় ঢুকে গেল। তাহলে তো সহজ কোনো রোগ নয়। কঠিন কোনো রোগই হবে।
পরদিন আসলো। মা বাবা ও বড় ভাই। সকালে তারা আমাকেও সাথে নিয়ে গেলেন মহাখালী। ক্যান্সার হাসপাতালে। ডাক্তার দেখলেন। বায়োপসি করলেন। বায়োপসি রিপোর্ট দিলেন। পড়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে একটি ক্লিনিকে মাকে ভর্তি করালাম। মায়ের রিপোর্ট আমাকে দেখতে দেয়া হল না। বালিশের নীচে রেখে দিল। পড়ে আমি সুযোগ বুঝে রিপোর্ট বের করে নিলাম। সেখানে লেখা ca gum. মানে ক্যান্সার গাম। দাতের মাড়িতে ক্যান্সার। আমি চোখকে বিশ্বাস করতে পাড়লাম না। আমি শব্দটিকে উচ্চারণ করলাম স্যাগাম। ডিকশনারি তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম । কিন্তু কোথাও পেলাম না স্যাগাম শব্দের অর্থ। আমি মানতে পাড়ছি না আমার মায়ের ক্যান্সার হবে। ক্লিনিকের ইন্টার পাস কম্পাউন্ডারকে জিজ্ঞেস করলাম মায়ের কী হয়েছে। সে আমাকে যে কি না প্রাণীবিজ্ঞানে অনার্স পড়ছে তাকে ঝাড়ি দিয়ে বললো মিয়া লেখাপড়া কিছু জানেন না। এখানে ক্যান্সার ছাড়া কেউ ভর্তি হয় না। আমি বললাম আমার মা কি ভালো হবে? জবাবে তিনি বললেন, পাশের বেডের এক মহিলারও একই সমস্যা ছিল। সে কয়েকদিন আগে মারা গেছে। এরপর শুরু হল আমার জীবনের কঠিনতম দিনগুলো। আমার মাও মারা যাবে। মায়ের এই হাসিমুখ খানা আর থাকবে না। আর কখনো মাকে দেখব না। চোখের সামনে মা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আমি মাকে নতুন করে আবিস্কার করলাম। মাকে আমার আগের থেকে আরো বেশি মমতাময়ী মনে হলো। মায়ের মতো আরো বেশি পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। মা আমাকে সবসময় কাছে রাখতে চায়। তার মুখ সবসময় মলিন থাকে। আমি বিদায় নিয়ে মেসে যেতে চাইলে মায়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ে।মাও বুঝতে পেরেছেন যে তিনি মারা যাবেন।
এরপর ডাক্তার কেমো থেরাপি দেয়া শুরু করলো। মায়ের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কিছু খেতে গেলেই বমি আসে। মাথার চুল ঝড়ে পড়তে লাগলো। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু চেয়ে দেখছি। আমাদের করার কিছু নেই। ক্যাম্পাসে কত বন্ধুর মায়ের ক্যান্সারে ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে টাকা তুলেছি। কিন্তু আমি আমার কোনো বন্ধুকে তখন পাশে দেখিনি। ক্যান্সারের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। নিজেকে কীট মনে হল।
এদিকে মা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাকে বেশি বেশি উপদেশ দিতে শুরু করেছেন। আমি কীভাবে চলব। আমি যেন কারো সাথে গ্যাঞ্জাম ঝগড়া ফ্যাসাদ না করি। আমি ছোট বেলা থেকেই শারীরীকভাবে দুর্বল হওয়ায় মা সবসময় আমাকে মারামারি থেকে দুরে রাখতেন।মারামারি হবে এ আশংকায় আমাকে খেলতেও দিতে চাইতেন না। দিলেও সেটা উঠানে বসে। যাতে তিনি ঘরে বসেই আমাকে চোখে চোখে রাখতে পারেন।
কেমো দিচ্ছে ডাক্তার একের পর এক। মায়ের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ডাক্তার এবার কেমো বন্ধ করে শুরু করলেন রেডিও থেরাপি। রেডিও থেরাপিতে অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেল। মা এখন কথাও বলতে পারেন না। কথা বেজে যায় মুখে। মুখের বাম পাশে পচন ধরে গেছে। ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি একবার শুরু হলে তা খুব দ্রুত হয়। পড়ে তা রক্তের মাধমে শরীরের অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
ঈদের দিন ঈদগাহে মায়ের জন্য বিশেস প্রার্থনা করা হল। যাতে মা তাড়াতাড়ি মারা যান। আমরাই হয়তো প্রথম যারা মায়ের মৃত্যুর জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছে। কারণ আমরা মায়ের কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না। মায়ের এমন অবস্থা হল যে, এক ফোটা পানি মুখে দিলেও ব্যথায় উহ করে উঠতেন। খাওয়া তো দুরের কথা। এদিকে আমার পরীক্ষা থাকায় আমাকে ঢাকা আসতে হবে। মা আমাকে বিদায় দিলেন। আসার সময় মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন আর বললেন তোকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দিয়ে গেলাম।আমার মন চায়নি। তবু আমাকে আসতে হল গ্রাজুয়েশনের পাঠ নিতে। এরপর প্রতিটি মুহুর্ত কেটেছে মায়ের মৃত্যুর খবরের ভয়ে। কখন না জানি খবর আসে। তারপর ষোলই ডিসেম্বর ফজরের নামাজের পড়ে মা চির বিদায় নিলেন। মার একটি অসিয়ত ছিল আমাদের প্রতি। তার মুমূর্ষ অবস্থায় যেন ভীড় না পড়ে। অর্থ্যাৎ সবাই যেন গন হারে মুখে পানি দিতে না আসে। কারণ মা বেনামাজি ও বেপরোয়া মহিলাদেরকে পছন্দ করতেন না। আল্লাহ তার কথা রেখেছেন। মা এমন সময় মারা গেলেন তখন তার কাছে কেউ ছিলনা। আমার ছোট বোন মাকে ইশারায় নামাজ পড়িয়ে নিজে নামাজ পড়তে গেছে। এই ফাকেঁ মা ফাকিঁ দিলেন সবাইকে। মা চলে গেলেন। সাথে একটি জিনিস বন্ধ করে দিয়ে গেলেন। আদরের দরজা।
মা মারা গেছেন ৬ বছর হল। এ ৬ বছরে একবেলা ভাতও কেউ আমাকে পরম মমতায় বেড়ে দেয়নি। এত বড় পৃথিবীতে ভাতের কোনো অভাব নেই। কিন্তু মমতামাখানো ভাত!। হোটেলে খাওয়ার মধ্যে আমার খাওয়ার তেমন কোনো পার্থক্য থাকলো না।
এখন আমি বাড়ি গেলে নিজ ঘরে নিজেকে অতিথী মনে হয়।প্রতিবেশীরা শুরু করলো করুণা দেখাতে। এঘর ও ঘর থেকে ডাক আসে খাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই মমতা মাখানো আদর মাখানো ভাত পাইনি। আদর কি জিনিস ভুলেই গেছি। আদর সোহাগ না পেতে পেতে আমার মেজাজ অনেকটাই উগ্র হয়ে গেছি। আমি খুব সহজেই রেগে যাই। খারাপ ব্যবহার করি। আমার এ ব্যবহারে অনেকেই আমাকে দেখতে পারে না। কিন্তু আমি কি করব।
মা চলে গেলে পৃথিবী মরুভূমি হয়ে যায়।
২৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×