শেয়ার বলতে কোম্পানির শেয়ার মূলধন কে বুঝায়। কোন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করার অর্থ ঐ কোম্পানির মালিকানায় অংশীদার হওয়া। ধরুন কোন কোমপানির এক লক্ষ শেয়ার আছে। আপনি তাদের একটি শেয়ার কিনলেন। আপনি ঐ কোম্পানির এক লক্ষ ভাগের এক ভাগের মালিক।এই অনুপাতে কোম্পানির লাভ লোকসানে রয়েছে আপনার অংশীদারিত্ব। কোম্পানি পরিচালনায় আপনার অধিকার আছে ( বার্ষিক সাধারন সভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে আপনি এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। অন্য শেয়ার হোল্ডারদের ভোটে আপনিও পরিচালক নিযুক্ত হতে পারেন।)
এই সমস্ত শেয়ার ক্রয় বিক্রয়ের জন্য রয়েছে শেয়ার বাজার। বাংলাদেশে ঢাকা স্টক এক্সচেন্জ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেন্জ এর মাধ্যমে এই ক্রয় বিক্রয় চলে। পুরো বিষয়টা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আছে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেন্জ কমিশন বা এসইসি। সাম্পরতিককালে এই বাজার এখন টালমাটাল। অবিশ্বাস্য ও ভুতুড়ে কিছু বিষয় বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পুরো ভার বহন করতে হচ্ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। আর এদের কাটা ঘা য়ে নুনের চিটা দিচ্ছে সরকারে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। কিছু নিষ্ঠুর কিছু তালগোল পাকানো আর কিছু হাস্যকর এই সব বক্তব্য।
কি হচ্ছিলো এই বাজারে। গত এক বছর ধরে এই বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছিলো। দাম বাড়ার এই স্রোত দেখে সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই মার্কটে। ২০১১ তে এসে ধপাস করে নিচে পড়ে এই বাজার। সর্বশেষ তিন মিনিটে ৬০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। ভোজবাজির মত ব্যপার। সরকারে কর্তাব্যক্তি ও বিভিন্ন টক শো তে তাদের চামচা রা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারিদের দুষলেন। এখন সরাসরি বলা হল তারা কেন বিনিয়োগ করলেন।
আসলেই তো তারা কেন বিনিয়োগ করলেন? তাদের কে বিনিয়োগ করানো হয়েছে।
কিভাবে?
সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের কে মারকেটে আসতে উত্সাহিত করেছে। সুদের হার কমানো হয়েছে ( সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটা অবশ্যই ভাল উদ্যোগ ছিল), জেলা শহরে এমনকি থানা শহরে পর্যন্ত ব্রোকার হাউজের শাখা খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সর্কারি কর্তারা বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে মানুষ কে শেয়ার বাজারে আসতে উত্সাহিত করেছেন। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ কে প্রশ্নতীত রাখা হয়েছে। ইনকান ট্যাক্স ল তে ও এই বিনিয়োগ উত্সাহিত করা হয়েছে। মোটকথা সব ধরনের প্রনোদনা দেয়া হয়েছে শেয়ার বাজেরে বিনিয়োগ কে। সুতরাং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারিরা দলে দলে এই বাজারে প্রবেশ করেছে।
তো এই বাজার যখন আকষ্মাৎ পড়ে গেল কর্তারা সব ভুলে গেলেন। ব্যপার টা এরকম আপনি আপনার বাড়িতে সবাই কে দাওয়াত দিলেন। নিমন্ত্রিতরা আসার পর তাদের কে পিটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তোদের এখানে আসতে বলছে কে?
সবথেকে চমকপ্রদ বক্তব্য রাখতেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা। তাঁর বক্তব্যের সাথে কেবল হীরক রাজার দেশের মন্ত্রীদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়। তিনি শেয়ার বাজার নিয়ে সরকারের মাথা ব্যথার কোন কারন খুজে পাননা। তিনি মনে করেন শেয়ার বিনিয়োগকারিদের টাকা চুরির টাকা। সর্বোপরি তিনি মনে করেন জাতীয় অর্থনীতিতে শেয়ার বাজার গুরুতৃপূর্ন কিছু নয়। জাতীয় অর্থনীতিতে শেয়ার বিনিয়োগকারিদের কোন ভূমিকা নেই।
শেয়ার বাজার কি আসলেই জাতীয় অর্থনীতিতে গুরত্বহীন? মোটেই না। দুনিয়ার তাবৎ অর্থনীতিতে এটিকে বিশেষ গুরত্ব দেয়া হয়। কারন শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশে এর গুরত্ব অপরিসীম। কিভাবে? পুঁজিবাজারের মূল উদ্দেশ্য হল পুঁজির সংস্থান করা। পুঁজিবাজার না থাকলে পুরো বিনিয়োগ করতে হয় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অথবা ব্যাংক থেক ঋণ নিয়ে। কিন্তু বৃহৎ শিল্পের বিকাশে পুঁজির এই দুটি উত্স যথেষ্ট নয়। স্বাভাবিকভাবেই বেশি পুঁজি মানে বেশি বিনিয়োগ, বেশি উত্পাদন, বেশি কর্মসংস্থান এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি। আমাদের মত দেশ গুলো মুখিয়ে থাকে বিদেশি বিনিয়োগের দিকে। বিদেশি বড় বড় পুঁজিপতিরা আমাদের এখানে শিল্প কারখানা করবেন। আমরা সেখানে গিয়ে গোলামি খাটব। মুনাফার অংশ পুঁজি মালিকের নিজের দেশে চলে যাবে। কারন আমাদের পুঁজির অভাব। এই পুঁজির অভাব দূর করার একটা বড় উপায় শেয়ার মার্কেট। অনেক বড় আকারের বিনিয়োগে ব্যাংকের সামর্থ্য থাকেনা। উদ্যোক্তারা নিজেরা এখানে অর্থের পুরোটা সংস্থান করতে পারেন না। বৃহৎ শিল্পের বিকাশে তাই পুঁজিবাজারে গুরুত্ব অপরিসীম। হাজার ক্ষুদ্রবিনিয়োগকারির অল্প অল্প পুঁজি শত কোটি হাজার কোটি হয় সেই টাকা বিনিয়োগ হয়। এই বিনিয়োগের টাকা সংগৃহিত হয় প্রাথমিক বাজার থেকে। এই প্রাথমিক বাজার কিন্তু সেকেন্ডারি বাজারের উপর নির্ভরশীল। কারন সেকেন্ডারি বাজার যদি চাঙ্গা না হয় তাহলে মানুষ কিসের আসায় প্রাথমিক বাজারে বিনিয়োগ করবে? প্রাথমিক গণ প্রস্তবের মাধ্যমে যে শেয়ার বন্টিত হয় তা মূল্যায়িত হয় সেকেন্ডারি তে। বাজারে যদি ধ্বস নামে তাহলে অর্থনীতির পুঁজি সংগ্রহে ভাটা পড়বেই।
এই সহজ কথা গুলো বুঝার জন্য আহামরি কোন বিদ্যার দরকার হয় না। কিন্তু দেশের অর্থ উপদেষ্টা যদি এই বিষয় না বুঝেন তাহলে সমস্যা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এখনই সাবধান হওয়া দরকার। কারণ উপদেষ্টা মহোদয় যে কোন সময় বলে ফেলতে পারেন দেশের আর্থনীতিতে ব্যাংক গুলোর কোন অবদান নাই। এরাতো শুধু একজনের নিকট হতে টাকা নিয়ে আরেকজন কে ধার দেয়। এদের নিজেদের কি ভূমিকা?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

