ঢাকা শহরে আজকাল অনেক চাকুরীজীবি মায়েদেরই চিন্তার বিষয় হচ্ছে অফিসে থাকা অবস্থায় বাচ্চাদের দেখাশোনার ব্যাপারটি। বর্তমান সময়ে একক পরিবার ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা বোধ হয় এটি। তাই চাকুরীজীবি মায়েদের জন্য কিছু সরকারী ডে-কেয়ার সেন্টারের কথা এখানে জানাতে চাচ্ছি।
জাতিসংঘের ইউ এন ডি পি সংস্থার একটি প্রকল্পের আওতায় বংলাদেশে ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তদের জন্য ৬টি এবং নিম্নবিত্তদের জন্য মোট ৪৫টি (সংখ্যাটা একটু ভুল হতে পারে, স্মৃতির উপর ভরসা করে লিখছি) ডে-কেয়ার সেন্টার পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে ৪/৫ বছর আগে। এইগুলো বাংলাদেশ সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে কাজ করে।
মধ্যবিত্তদের গুলো বাংলাদেশ সচিবালয়ে, আজিমপুরে, খিলগাঁয়ে, মিরপুরে, মহাখালীতে অবস্থিত। আরেকটা জায়গার নাম মনে করতে পারছি না। মোট কথা যেখানে যেখানে সরকারী আবাসস্থল আছে, তার কাছাকাছি। মূলতঃ সরকারী চাকুরীজীবিদের জন্য করা হলেও সচিবালয়েরটা ছাড়া মনে হয় বাকী সবগুলোতে অন্য পেশাজীবিরাও তাদের বাচ্চা রাখতে পারে। বাচ্চা রাখার সময় ৯ টা থেকে ৫টা। ৬ মাস থেকে ৬ বছরের বাচ্চাদের রাখা হয়।
প্রকল্পের বাজেট থেকেই শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। মেন্যু অনেকটা এই রকমঃ সকাল ১০টায় দুধ-পাউরুটি, বা সুজি, সেমাই, দুপুরে ভাত-সবজী-মাছ/ডিম/মাংস সাথে লেবু (ভিটামিন সি-র অভাব পূরণের জন্য), বিকেলে যে কোন একটা ঋতুকালীন ফল (আম, কলা, কমলা, তরমুজ, কাঁঠাল-- যে কোন কিছু)। খাবারের ব্যাপারে কোন দিন কি খাবার দেয়া হবে তার একটা রুটিন আছে এদের। সুষম খাদ্যের প্রতি নজর দেয়া হয়। একেবারে শিশু যারা, মানে যারা শক্ত খাবার খেতে পারে না, তাদের দুধ বা তরল সুজি/খিচুড়ী সাধারনতঃ বাচ্চার অভিভাবককেই দিতে বলা হয়, কারণ সেটা বেশী স্পর্শকাতর।
সকালের নাস্তার পর বাচ্চাদের নিয়ে বিভিন্ন রকমের খেলা-ধূলা, ছবি আঁকা, বর্ণমালা শেখানো, যারা একটু বড় বাচ্চা তাদের হাতের লেখা চর্চা ---এই গুলো করানো হয়। এর জন্য যদিও একটি প্রাইমারী শিক্ষিকার পোস্ট আছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই সে পোস্টে কেউ থাকে না, কারণ মাস্টার ডিগ্রী পাশ করা একটি মেয়ে শুধু কিছুদিনের জন্যই এখানে চাকুরী করতে আসেন। অন্য জায়গায় ভাল চাকুরী পেলে চলে যান। তাই বড় আপা-ই সরাসরি এগুলো তত্ত্বাবধান করেন, সাথে সাহায্যকারী হিসেবে থাকেন অর্ধশিক্ষিত আয়া/কর্মচারীরা। এক চিকিৎসকেরও পোস্ট আছে, সেটারও করুণ দশা দেখেছি।
বাচ্চাদের রুম, থালা-বাটি, বিছানা এইগুলো পরিষ্কার রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা আছে, কেউ চাইলে তার বাচ্চার জন্য আলাদা গ্লাস-প্লেট দিতে পারেন। মোটের উপর বাচ্চারা ইটের বাসায় একা কাজের মেয়েসহ বন্দী থাকার চেয়ে এখানে অনেক সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবসহ ভালই উপভোগ করে। তবে কিছু কিছু বিচ্ছুতো সব জায়গাতেই থাকে, তাই মাঝে মাঝে আপনার বাচ্চার কাছে কারো কারো নামে নালিশও পেতে পারেন, যেটা বাচ্চাদের স্বভাবসুলভ দুষ্টমীর বাইরে বেশী কিছু নয়। আর মাসিক বেতনটা একেবারেই হাতের নাগালে, যেহেতু সরকারী। তাই আপনার বাচ্চাদেরও প্রয়োজন হলে এখানে রাখার ব্যাপারে ভাবতে পারেন। নিরাপত্তাজনিত তেমন কোন সমস্যা নেই।
তবে সব ভালোর মাঝে যেটুকু অসুবিধা দেখেছি, সেটা হলো অর্ধশিক্ষিত কর্মচারীদের মাঝে মাঝে খিস্তী-খেউড় আওড়ানো (সেটা তারা নিজেদের মাঝে ঝগড়া-ঝাটি করার সময়ই বেশী করে)। বাচ্চারা অনায়াসেই এগুলো মুখস্থ করে ফেলে, অফিসার বড় আপা অনেক চেষ্টা করে, বুঝিয়েও ব্যর্থ হন মাঝে মাঝে। এই ব্যাপারে কর্মচারীদের আরো বেশী কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন আছে।
তবে একটা গুরুতর সমস্যা হলো, ৫ বছর মেয়াদী পরীক্ষামূলক প্রকল্পের (উন্নয়ন খাত) আওতায় হবার কারণে, এর দাপ্তরিক সময়সীমা প্রায় শেষ। এখন এটা কার অধীনে কিভাবে চলবে, ফান্ড কোথা থেকে, কিভাবে জোগাড় হবে, এসব এখন সরকারের আলোচনার টেবিলে, বিস্তারিত আমার জানা নেই। কিন্তু প্রায় দেখেছি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ থাকে, শুধু বাচ্চাদের খাবারের টাকাটা ঠিকভাবে দেয়া হয়। যার ফলে কর্মচারীদের মেজাজ প্রায়ই খারাপ থাকে, দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে, যার কিছুটা প্রভাব বাচ্চাদের সাথে করা আচরণের উপর গিয়ে পড়ে, যদিও সেটা মোটেও কাম্য নয়।
তবে দিন দিন চাকুরীজীবি নারীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ডে-কেয়ার সেন্টারের চাহিদাও তত বাড়ছে। তাই শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতে আরো বেশী এই ধরণের সেন্টার গড়ে তোলা আবশ্যক। আর খরচ অবশ্যই অভিভাবকদের আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
[বিদ্রঃ ডে- কেয়ারের বর্ণনা নিজের বাচ্চাদের সেখানে রাখার ফলে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে লেখা। ]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



