কাহিনী ১
আমি তখন অনেক ছোট, স্কুলে পড়ি। আমাদের পাড়ায় এক মেয়ের বিয়ে। আমার ছোট ফুফু তখন কলেজে পড়তেন, তাই বাই ডিফল্ট পাড়ার যত তরুণী-যুবতী মেয়ে যাছে সবাই আম্মাকে ভাবী ডাকতেন আর আমিও তাদের সবাইকে ফুফু ডাকতাম। তো, সেই কনে ফুফুর বিয়ের দিন দুপুরে হঠাৎ খবর আসলো বর কুমিল্লার কাছে এক্সিডেন্ট করেছে, হাত ভেঙ্গে গেছে, এখন হাসপাতালের দিকে গেছে। বরপক্ষ আসতেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে, বর অসাবধানতাবশতঃ জানালার বাইরে হাত রেখেছে, পিছন থেকে গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়েছে।
এ খবর শুনে তো কনে ফুফু ভয়ে কাঁদতে লাগলো, সবাই নিশ্চয় তাকেই অপয়া ভাববে। পরে শেষ পর্যন্ত সেদিনই বিয়েটা হয়েছিল। ব্যাপারটা কেমন করে ম্যানেজ হয়েছে মনে নেই, আমার কি আর ঐ বয়স ছিল যে ঐসব বড়দের দুশ্চিন্তার মধ্যে নাক গলাতে যাব। আমি এক দৌড়ে একবার গিয়ে বউ সাজানি দেখে আসি, আরেকবার হাতভাঙ্গা বর দেখতে যাই। তখন তো আর পার্লার ছিল না, ঘরেই বউ সাজানো হতো, তাও আবার বরের স্যুটকেস/ লাগেজ আসার পরে। সবাই মিলে ঘিরে কনের জন্য আনা ঐ স্যুটকেসে কি কি আছে, কেমন শাড়ি এনেছে, গহনা কেমন, কসমেটিকস্ ভাল না খারাপ, আরো কি কি সব দেখতো আর নানা মন্তব্য। এসব উপহার দেখেই বোঝা যেত বরপক্ষ কিপটা নাকি সমঝদার, শাড়ি-কসমেটিকস যদি পছন্দ না হয়েছে তো নারীমহলে বরপক্ষের সে কি বদনাম করা, চিল্লাচিল্লি --- কি মনোহর সে দৃশ্য!
আর কি কি খেয়েছি সেটাও ভুলে গেছি।
কাহিনী ২
এটা আমার বড়মার (নানীর মা) বিয়ের কাহিনী। বরপক্ষ নাকি সাতদিন নৌকায় বসে ছিল বড়মাকে বিয়ে করতে এসে। কি কারণ? প্রথমত, দেনমোহর নিয়ে দর কষাকষি। দ্বিতীয়ত, বিয়ের ১ম শাড়ি পছন্দ হয়নি। তাই একদিকে দুই পক্ষের মুরুব্বীদের মধ্যে মোহরানা নিয়ে তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছিল, অন্য দিকে কাউকে পাটনা (এটা কোন জায়গা? লক্ষ্মীপুর থেকে কতদূর? ) পাঠিয়ে আবার আরেকটা বিয়ের শাড়ি আনা হলো।
একদিকে বরপক্ষের প্রেস্টিজ ইস্যু, যেখানে বিয়ে করতে এসেছে সেখান থেকে বিয়ে করে না গেলে মানসম্মান কিছু থাকবে না, লোকে হাসবে এ বাড়ির মেয়ে বিয়ে করতে পারেনি। আরেকদিকে কনে পক্ষের তেজ, কথায় না মিললে ঘাটে নামতে দিব না।
গল্প শোনার ফাঁকে আমি একবার বড়মাকে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, আপনার বিয়েটা হইছিল কবে? উনি সাল ঠিকভাবে বলতে পারলো না, শুধু বললো বৃটিশ আমলে আইনের বছর। তো, নানুর বয়স হিসেব করে, পরবর্তীতে ইতিহাস পড়ে যা বুঝলাম সেটা খুব সম্ভবত ১৯৩৫ সাল।
বাপরে! ওই যুগে মেয়েদের কি দাম!
কাহিনী ৩
গতকাল আমাদের জাতীয় মাতার তিন কন্যার মহা ধুমধামে বিয়ে হয়েছে। কোথাও কোথাও দেখলাম, ঐ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পিছনে কারণ হিসেবে রুনা-রত্নাকে অপয়া ভাবতে শুরু করেছিল তাদের হবু শ্বশুড়বাড়ির লোকজন আর এলাকাবাসি। তারা একটু পিঠটানও দিচ্ছিল এদেরকে বিয়ের ব্যাপারে, আর একথা মাতাজীর কানে গিয়েছিল বলেই উনি তড়িঘড়ি করে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন।
ঘটনা যদি তাই-ই হয়, এই ২০১০ সালেও যেখানে দেশের নামের আগে "ডিজিটাল" শব্দ লাগানো হয়েছে, সেখানে এখনো কুসংস্কারের প্রতি আমাদের কি ভয়! "ডিজিটাল" শব্দটা কি মারাত্মক ভেংচি কাটছে। অনেক শিক্ষিত লোকজনও এ বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মাতাজী ধন্যবাদ দিচ্ছেন এটা ভেবে যে যাক্ এটা কুসংস্কার, বরং ঐ মেয়েগুলোকে বিয়ে করলে আর্থিকভাবে আরো বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে, সেটাই মাতাজী প্রমাণ করে দিলেন। ঐ এলাকায় একজনও আলোকিত শিক্ষিত লোক ছিল না যারা এটা তাদেরকে বোঝাতে পারতেন।
আর এ ঘটনা থেকে আরেকটা বড় বিশ্রী ব্যাপার আবারো জানা গেল, মাতা-পিতা, সহায়-সম্পত্তিহীন মেয়েরা বিয়ের বাজারে কি পরিমাণ অযোগ্য! খোদ প্রধানমন্ত্রী মাতা হয়ে এ যাত্রা ওই মেয়েদের বিবাহের যোগ্য করে তুললেন। আমাদের মাতাকেও এমন ভুল সামাজিক ব্যবস্থার কাছে মাথা নুইতে হলো!
একটা পত্রিকায় দেখলাম "পুরান ঢাকার ঐতিহ্য" মেনে মাতাজী ৮ ভরি গহনা, ঘটি-বাটিসহ ঘরভর্তি ফার্নিচার দিয়েছেন। ঘটনা সত্যি নাকি? গত দুইদিন ধরে আমি তো ভেবেছিলাম মেয়েগুলোর নতুন মা যেহেতু সামর্থ্যবান তাই স্বেচ্ছায় বুঝি অমন উপহার দিয়েছেন। যদি সত্যি সেটা "ঐতিহ্য" মেনে দেয়া হয়, তাহলে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে পুরানো ঢাকায় বরপক্ষ থেকে মেয়েদের কি কি উপহার দেয়া হয় বিয়েতে? ঐতিহ্যে কি কি দেয়ার নিয়ম আছে? সেগুলো কি রুনা, রত্না, আসমাকে দেয়া হয়েছে? শুধু তো জামিলের আত্মীয়-স্বজনদের আহত-নিহত হতে দেখেছি, বাকীদের কি অবস্থা?
আর যদি বলা হয় তারা আসলে কম স্বচ্ছল পরিবারের, তাহলে আমি বলবো মাতাজীর ত্রাণ তহবিল থেকে বরের হাত দিয়ে কনেদেরকে উপহার দেয়ার কাজটা করলে বেশি ভাল হতো। এতে করে কনেপক্ষের বাধ্যগত উপহার দেয়ার (আসলে বেনামের যৌতুক) ভুল ঐতিহ্যকে আমাদের ক্ষমতাধর আম্মুজী ভেঙ্গে দিতে পারতেন। আর যখন আমাদের এ বর্তমান সমাজ এখনো যৌতুকের অভিশাপে অভিশপ্ত, সেখানে এ উদ্যোগটা যৌতুকের বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজে লাগানো যেত, মানে এক ঢিলে যতগুলো পাখি মরেছে, আরো একটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ পাখি মারা যেত।
ভবিষ্যতে আমাদের নেতা-নেত্রীরা মা-বাবা হয়ে মেয়ের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যদি এটা মনে রাখেন তাহলে খুব ভাল হয়।
অবশেষে রত্না-সুমন, রুনা-জামিল, আসমা-আলমগীরের নতুন জীবন সুখময় হোক, এ কামনা করি। আর পরবর্তীতেও সংসারের কোন ঘটনা-দুর্ঘটনায় যেন তাদেরকে অপয়া কথাটি শুনতে না হয়, সে কামনাও করি।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ৯:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


