somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিছু বিয়ের গপ-সপ...

১০ ই জুন, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কাহিনী ১

আমি তখন অনেক ছোট, স্কুলে পড়ি। আমাদের পাড়ায় এক মেয়ের বিয়ে। আমার ছোট ফুফু তখন কলেজে পড়তেন, তাই বাই ডিফল্ট পাড়ার যত তরুণী-যুবতী মেয়ে যাছে সবাই আম্মাকে ভাবী ডাকতেন আর আমিও তাদের সবাইকে ফুফু ডাকতাম। তো, সেই কনে ফুফুর বিয়ের দিন দুপুরে হঠাৎ খবর আসলো বর কুমিল্লার কাছে এক্সিডেন্ট করেছে, হাত ভেঙ্গে গেছে, এখন হাসপাতালের দিকে গেছে। বরপক্ষ আসতেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে, বর অসাবধানতাবশতঃ জানালার বাইরে হাত রেখেছে, পিছন থেকে গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়েছে।

এ খবর শুনে তো কনে ফুফু ভয়ে কাঁদতে লাগলো, সবাই নিশ্চয় তাকেই অপয়া ভাববে। পরে শেষ পর্যন্ত সেদিনই বিয়েটা হয়েছিল। ব্যাপারটা কেমন করে ম্যানেজ হয়েছে মনে নেই, আমার কি আর ঐ বয়স ছিল যে ঐসব বড়দের দুশ্চিন্তার মধ্যে নাক গলাতে যাব। আমি এক দৌড়ে একবার গিয়ে বউ সাজানি দেখে আসি, আরেকবার হাতভাঙ্গা বর দেখতে যাই। তখন তো আর পার্লার ছিল না, ঘরেই বউ সাজানো হতো, তাও আবার বরের স্যুটকেস/ লাগেজ আসার পরে। সবাই মিলে ঘিরে কনের জন্য আনা ঐ স্যুটকেসে কি কি আছে, কেমন শাড়ি এনেছে, গহনা কেমন, কসমেটিকস্‌ ভাল না খারাপ, আরো কি কি সব দেখতো আর নানা মন্তব্য। এসব উপহার দেখেই বোঝা যেত বরপক্ষ কিপটা নাকি সমঝদার, শাড়ি-কসমেটিকস যদি পছন্দ না হয়েছে তো নারীমহলে বরপক্ষের সে কি বদনাম করা, চিল্লাচিল্লি --- কি মনোহর সে দৃশ্য!

আর কি কি খেয়েছি সেটাও ভুলে গেছি। :)


কাহিনী ২

এটা আমার বড়মার (নানীর মা) বিয়ের কাহিনী। বরপক্ষ নাকি সাতদিন নৌকায় বসে ছিল বড়মাকে বিয়ে করতে এসে। কি কারণ? প্রথমত, দেনমোহর নিয়ে দর কষাকষি। দ্বিতীয়ত, বিয়ের ১ম শাড়ি পছন্দ হয়নি। তাই একদিকে দুই পক্ষের মুরুব্বীদের মধ্যে মোহরানা নিয়ে তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছিল, অন্য দিকে কাউকে পাটনা (এটা কোন জায়গা? লক্ষ্মীপুর থেকে কতদূর? ) পাঠিয়ে আবার আরেকটা বিয়ের শাড়ি আনা হলো।

একদিকে বরপক্ষের প্রেস্টিজ ইস্যু, যেখানে বিয়ে করতে এসেছে সেখান থেকে বিয়ে করে না গেলে মানসম্মান কিছু থাকবে না, লোকে হাসবে এ বাড়ির মেয়ে বিয়ে করতে পারেনি। আরেকদিকে কনে পক্ষের তেজ, কথায় না মিললে ঘাটে নামতে দিব না।

গল্প শোনার ফাঁকে আমি একবার বড়মাকে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, আপনার বিয়েটা হইছিল কবে? উনি সাল ঠিকভাবে বলতে পারলো না, শুধু বললো বৃটিশ আমলে আইনের বছর। তো, নানুর বয়স হিসেব করে, পরবর্তীতে ইতিহাস পড়ে যা বুঝলাম সেটা খুব সম্ভবত ১৯৩৫ সাল।

বাপরে! ওই যুগে মেয়েদের কি দাম!


কাহিনী ৩

গতকাল আমাদের জাতীয় মাতার তিন কন্যার মহা ধুমধামে বিয়ে হয়েছে। কোথাও কোথাও দেখলাম, ঐ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পিছনে কারণ হিসেবে রুনা-রত্নাকে অপয়া ভাবতে শুরু করেছিল তাদের হবু শ্বশুড়বাড়ির লোকজন আর এলাকাবাসি। তারা একটু পিঠটানও দিচ্ছিল এদেরকে বিয়ের ব্যাপারে, আর একথা মাতাজীর কানে গিয়েছিল বলেই উনি তড়িঘড়ি করে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন।

ঘটনা যদি তাই-ই হয়, এই ২০১০ সালেও যেখানে দেশের নামের আগে "ডিজিটাল" শব্দ লাগানো হয়েছে, সেখানে এখনো কুসংস্কারের প্রতি আমাদের কি ভয়! "ডিজিটাল" শব্দটা কি মারাত্মক ভেংচি কাটছে। অনেক শিক্ষিত লোকজনও এ বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মাতাজী ধন্যবাদ দিচ্ছেন এটা ভেবে যে যাক্‌ এটা কুসংস্কার, বরং ঐ মেয়েগুলোকে বিয়ে করলে আর্থিকভাবে আরো বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে, সেটাই মাতাজী প্রমাণ করে দিলেন। ঐ এলাকায় একজনও আলোকিত শিক্ষিত লোক ছিল না যারা এটা তাদেরকে বোঝাতে পারতেন।

আর এ ঘটনা থেকে আরেকটা বড় বিশ্রী ব্যাপার আবারো জানা গেল, মাতা-পিতা, সহায়-সম্পত্তিহীন মেয়েরা বিয়ের বাজারে কি পরিমাণ অযোগ্য! খোদ প্রধানমন্ত্রী মাতা হয়ে এ যাত্রা ওই মেয়েদের বিবাহের যোগ্য করে তুললেন। আমাদের মাতাকেও এমন ভুল সামাজিক ব্যবস্থার কাছে মাথা নুইতে হলো!

একটা পত্রিকায় দেখলাম "পুরান ঢাকার ঐতিহ্য" মেনে মাতাজী ৮ ভরি গহনা, ঘটি-বাটিসহ ঘরভর্তি ফার্নিচার দিয়েছেন। ঘটনা সত্যি নাকি? গত দুইদিন ধরে আমি তো ভেবেছিলাম মেয়েগুলোর নতুন মা যেহেতু সামর্থ্যবান তাই স্বেচ্ছায় বুঝি অমন উপহার দিয়েছেন। যদি সত্যি সেটা "ঐতিহ্য" মেনে দেয়া হয়, তাহলে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে পুরানো ঢাকায় বরপক্ষ থেকে মেয়েদের কি কি উপহার দেয়া হয় বিয়েতে? ঐতিহ্যে কি কি দেয়ার নিয়ম আছে? সেগুলো কি রুনা, রত্না, আসমাকে দেয়া হয়েছে? শুধু তো জামিলের আত্মীয়-স্বজনদের আহত-নিহত হতে দেখেছি, বাকীদের কি অবস্থা?


আর যদি বলা হয় তারা আসলে কম স্বচ্ছল পরিবারের, তাহলে আমি বলবো মাতাজীর ত্রাণ তহবিল থেকে বরের হাত দিয়ে কনেদেরকে উপহার দেয়ার কাজটা করলে বেশি ভাল হতো। এতে করে কনেপক্ষের বাধ্যগত উপহার দেয়ার (আসলে বেনামের যৌতুক) ভুল ঐতিহ্যকে আমাদের ক্ষমতাধর আম্মুজী ভেঙ্গে দিতে পারতেন। আর যখন আমাদের এ বর্তমান সমাজ এখনো যৌতুকের অভিশাপে অভিশপ্ত, সেখানে এ উদ্যোগটা যৌতুকের বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজে লাগানো যেত, মানে এক ঢিলে যতগুলো পাখি মরেছে, আরো একটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ পাখি মারা যেত।

ভবিষ্যতে আমাদের নেতা-নেত্রীরা মা-বাবা হয়ে মেয়ের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যদি এটা মনে রাখেন তাহলে খুব ভাল হয়।


অবশেষে রত্না-সুমন, রুনা-জামিল, আসমা-আলমগীরের নতুন জীবন সুখময় হোক, এ কামনা করি। আর পরবর্তীতেও সংসারের কোন ঘটনা-দুর্ঘটনায় যেন তাদেরকে অপয়া কথাটি শুনতে না হয়, সে কামনাও করি।





সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ৯:২৪
২৯টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×