কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করি,
ইভ টিজিং:
১। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, এক মামার বাসা কাছাকাছিই ছিল, মামা নতুন বিয়ে করে বাসা নিয়েছে, মাঝে মাঝেই বেড়াতে যাই, সেদিনও গেলাম। বিকেলেই ফিরে আসবার কথা, হঠাৎ আম্মা কাউকে পাঠিয়ে খবর পাঠালো আজ যেন বাসায় না যাই, একটু আগে রিমন ঝুমাকে থাপ্পড় মেরেছে, পরিস্থিতি ভাল না। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ঝুমা আর আমি একসাথেই পড়তাম একই স্কুলে, একই ক্লাসে। স্কুলে একসাথেই আসা-যাওয়া করতাম। রিমনও আমাদের সমবয়সী, তবে একটু রংবাজ টাইপের, অন্য স্কুলে পড়তো। দুই একদিন আগে স্কুলে যাবার পথে (দুজনেই স্কুল পোশাকে ছিলাম, অশালীন কোন পোশাকে নয় আর স্কার্ফটা সবসময়ে মাথায় দিয়েই চলতাম) রিমন কি যেন বলে ফাজলামি করছিল আমাদের সাথে, দুজনেরই বিরক্ত লাগলেও ঝুমা একটু মুখরা টাইপ ছিল, চট করে পালটা বকা দিয়ে দিল, আমিও খুশী হয়েছিলাম, সাপোর্ট করেছিলাম ঝুমাকে। ওইদিন বিকেলে ঝুমাকে রাস্তায় একা পেয়েই দিল চড়। আমি থাকলেও হয়তো চড় খেতে পারতাম, ঠিক জানি না, তবে বড় বাঁচা বেঁচে গেছি! পরেরদিন এসে বাকী সব শুনলাম। ঝুমা কাঁদতে কাঁদতে তার আম্মাকে গিয়ে বলেছে, পরে খালাম্মা গিয়ে রিমনের আম্মার কাছে নালিশ দিয়েছে, এলাকার অভিভাবক পর্যায়ে এটা নিয়ে বেশ তোলপাড় হলো, রিমন আর তার বড় ভাই (সেও একটু বখাটে ছিল) কে সবাই ভাল করে শাঁসালো। রিমনের মা অনেক ভাল মহিলা ছিলেন, কিন্তু ছেলেরা মাকে পাত্তাই দিত না, কোন কথাই শুনতো না। রিমনের বাবা বিদেশে ছিলেন নাকি মারা গিয়েছিলেন সেটা এখন আর মনে করতে পারছি না। তবে মা একাই সংসার সামলাতেন এটুকুই মনে করতে পারছি।
--- এ ঘটনার পরপরই আম্মা পইপই করে নিষেধ করে দিল, স্কুলে যাবার পথে রাস্তায় কোন ছেলে কিছু বললে, সাবধান! কোন জবাব দিবি না, মাথা নিচু করে চুপচাপ হেঁটে চলে যাবি। কোন কথাই গায়ে মাখার দরকার নেই।
আমিও সুবোধ বালিকার মতো এরপর থেকে সবসময়েই রাস্তায় চুপচাপ হেঁটে যেতাম, কেউ এসে গায়ে পড়ে প্রেম নিবেদন করলেও দুই এক কথায় শান্ত-কঠিন নির্বিকার স্বরে "না" বলে দিয়ে তারপর মুখে কলুপ এঁটে দিতাম। এরপর যতই আমার পাশ দিয়ে স্কুল পর্যন্ত হেঁটে যাক্ না কেন, ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলেও, অস্বস্তি লাগলেও কিছু বলতাম না, দেখি কয়দিন অধ্যাবসায় করতে পারে?
স্কুল জীবনটা এভাবেই পার করলাম।
২। কলেজে কো-এডুকেশনে পড়তাম। প্রথম একমাসের ভিতরেই ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের মাঝে মোটামুটি পরিচয় হয়ে যাবার পর ক্লাসমেট ছেলেরাই মেয়েদের গার্ড দিতো, যাতে অন্য ফ্যাকাল্টির ছেলেরা আমাদের বিল্ডিং-এ ঢুকতে না পারে। কলেজে আবার একটা ভাগাভাগি ছিল, এক ফ্যাকাল্টির ছেলেরা অন্য ফ্যাকাল্টির মেয়েদের সাথে ফাইজলামি করতো, নিজের ফ্যাকাল্টির মেয়েদেরকে বান্ধবী- বোনের মতো দেখতো। তেমন কোন সমস্যায় পড়ি নাই আমরা সায়েন্স ফ্যাকাল্টির মেয়েরা, শুধু মাঝে মাঝে সকালে এসে দেখতাম কে যেন বেঞ্চে রোমান্টিক কবিতা লিখে রেখে যেত,
তবে আর্টস ফ্যাকাল্টির দুই/তিনজন মেয়েকে একটু ভাল রকমের বিপদেই পড়তে হয়েছিল, সেই একই কারণ টিজিং-এর প্রতিবাদ করেছিল বলে। ভাবখানা এমন আমরা ছেলেরা একটু টিজ করবোই, তোমরা কেন প্রতিবাদ করবে??!! কেবল সহ্য করে যাও। নাহ্, এখানেও কলেজের পোশাক ছিল, ইচ্ছামত কোন পোশাক পরে যাবার কোন অপশন ছিল না, আবার আমরাও তেমন কেউ হিজাবধারী ছিলাম না। বিপদে পড়া মেয়েগুলো আমারই স্কুলমেট ছিল। তারা স্কুলে থাকতেও ভীষণ দুষ্ট ছিল, কলেজে গিয়েও একটু বেশিই হয়তো হৈ চৈ করতো, যা কিছু ছেলেকে সাহস যুগিয়েছিল টিজ করার, সাথে সাথে তারা পাল্টা অপমানজনক কথা বলে প্রতিবাদ করেছে, ফলাফল এসিড ছোঁড়া, ভাগ্যিস যে ঠিক মুখে মারেনি, পিছন থেকে মেরেছে, চুলে পড়েছে কিছু, বাকীটা জামার উপর, এসিডও লঘু ছিল। ভয়ানক কিছুও ঘটতে পারতো! আবার ঐ ছেলেগুলো সায়েন্স ফ্যাকাল্টিরই কিছু বখাটে ছেলে ছিল, আমাদের সাথে অবশ্য তাদের তেমন কোনদিন কথা হয়নি। আমরা যাদের সাথে মিশতাম, সেই ছেলেগুলো ভালই ছিল। তাদের সাথে মাঝে মাঝে সীমিত আড্ডা ছাড়াও কিছু কথা কাটাকাটিও হতো, কিন্তু কখনো বাড়াবাড়ি পর্যায়ের কিছু হয়নি।
--- একটু কৌশলী আর কথাবার্তায় রাশ টেনে ধরলে হয়তো অনেক ঝামেলাই এড়ানো যায়।
৩। ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর একদিন আমার স্কুলফ্রেন্ড দুইজন আসলো আমার হলে বেড়াতে। তাদের মধ্যে একজন ঢাবির কলাভবনে পড়তো, আরেকজন জাবিতে। তিনজনে মিলে বের হলাম ডাসে যাব, কিছু খাওয়ার পাশাপাশি একটু গল্প-গুজব করার জন্য। গেট দিয়ে বের হওয়া মাত্রই কিছু ছেলে হৈ হৈ করে উঠলো কলাভবনের বান্ধবীটাকে দেখে। এর আগে হলের গেটের সামনে কখনো কোন ছেলেকে টিজ করতে দেখিনি। একটু অবাকই হলাম। কারণ আর কিছু না, কলাভবনের বান্ধবীটি লং স্কার্ট পরা ছিল, আমরা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ। ঐ ছেলেগুলো অন্য মেয়েদের দেখেও কোন টিজ করেনি, আমাদের দিকেও তাকায়নি, লং-স্কার্টটি মোটেই অশালীন ছিল না, শুধুমাত্র ঐ পরিবেশে বেমানান ছিল। বান্ধবীটি তো ভীষণ এম্ব্যারেস্ড ফিল করলো, আর গজগজ করতে থাকলো কি এক ক্ষ্যাত ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, পোলাপান সব ক্ষ্যাত্। আমি নর্থ-সাউথ ইউনিতে যখন আমার সেখানকার ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরতে যাই, কই কেউ তো কিছু বলে না! ওখানকার পোলাপান অনেক স্মার্ট!
আমি আর জাবির বান্ধবীটি মুখ টিপে হাসি। আর তাকে সান্তনা দেই। কি আর করবা! পোলাপান সব ফাজিল, থাক্ তুমি স্কার্ট ঐ নর্থ-সাউথে যাওয়ার সময়েই পইরো, ঢাবিতে আর পইরো না।এখন এই ছেলেদের কিছু বলতে গেলে কি না কি শুনিয়ে দেয়, আমরা তিনজন, ওরা সংখ্যায় বেশি। আবার তোমরা তো পরে থাকবে না, এ হলে থাকবো আমি, এ রাস্তা দিয়ে ডেইলী আমারই যেতে-আসতে হবে, পরে একলা কোন বিপদে পড়ি! থাক বাদ দেও, ঝামেলা না বাড়াই।
--- ঝামেলা এড়াতে যদিও ঐ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেদের কিছু বলি নাই, কিন্তু মনে মনে ক্ষোভ হয়েছিল ঠিকই, তোমরাও কি বড় হও নাই, ম্যাচিউরিটি এখনো আসে নাই? একটু পোশাক আলাদা হলেই তোমাদের চোখ তুলে দেখতে হবে আর দেখছ ভালো কথা, মুখ দিয়ে শব্দ না করলে চলে না?? যত্তসব!
৪। কার্জন হলে একটা ডিপার্টমেন্ট ছিল, কোনভাবে যদি হাঁটতে হাঁটতে ঐ ডিপার্টমেন্টের সামনে চলে যেতাম আমরা , কিছু না কিছু টিজিং হজম করতেই হতো আমাদের। সাথে সাথে ঐখান থেকে চলে আসতাম। সারা কার্জন হলের সব মেয়েদের ঐ ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের প্রতি অভিযোগ ছিল। কার্জন হলে মেয়েরা যে খুব একটা অশালীন পোশাক পরে তা কিন্তু নয়, বিশেষ করে আমিসহ আমার ফ্রেন্ডসার্কেল তো নয়ই। আবার আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের অনেক প্রশংসা করতো অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা, তোমাদের ভাইয়ারা অনেক ভাল, রৌদের কারণে অনেকেই আমাদের করিডোর দিয়ে নিশ্চিন্তে চলা-ফেরা করতো। তাহলে এখানে সমস্যা কাদের? কেন?
আসলে কিছু ছেলে ছিল ঐ তথাকথিত ডিপার্টমেন্টে যারা কোন কারণ ছাড়াই মেয়ে দেখামাত্রই টিজিং করতো। বদভ্যাস যাকে বলে। তারা যদি আমাদের ডিপার্টমেন্টের হতো নিশ্চিতভাবে স্যারদের দিয়ে তাদের শাস্তি খাওয়াতাম। কত গমে কত আটা ঠিকই টের পাইয়ে দিতাম। ঐ ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা কোন ব্যবস্থা নিয়েছিল কিনা ঠিক জানা নেই।
সাইবার মবিং:
আজকাল ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াতে এখানেও চলছে মেয়েদের নানা-রকম হয়রানি করা, হুমকি-ধমকি দেয়া, উল্টা-পাল্টা ছবি-ভিডিও আপলোড করে সামাজিকভাবে হয়রানি করা।
১। ম্যাসেঞ্জারে অনলাইন হলে দুই তিনবার এমন হয়েছে কিছু এড চ্যাট রিকোয়েস্ট পেয়েছি, প্রথমে আইডি দেখে ভেবেছি হয়তো পরিচিত কেউ, আমি হয়তো আইডি জানি না। অবশ্য অনলাইন হলেই যারা আমার ফ্রেন্ড লিস্টে নাই, তারা কিভাবে টের পায়, এটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি এখনো। সিকিউরিটি সেটিংগুলো চেক করে দেখেছি, কিন্তু কিভাবে লিস্টের বাইরের কারো কাছ থেকে হিডেন থাকবো এটা বুঝতে পারিনি। আমি অবশ্য কখনো চ্যাটরুমে ঢুকিনি। তো, প্রথম প্রথম দুই একজনের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর বুঝেছি, আমি আসলে তাদের চিনি না, তারাও আমাকে চিনে না, শুধু মেয়ের আইডি দেখেই কথা বলতে চাইলো! আমি তো হতভম্ব!
একজনের সাথে কথা বলে দেখলাম সে মাত্র ভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। বললাম, তুমি জানো আমি তোমার কত্ত সিনিয়র! মোটামুটি কবে আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়তাম সেটা তাকে বললাম। ওমা! তারপরও সে চ্যাট করতে আগ্রহী। জিজ্ঞ্যেস করলাম, থাকো কই? ধানমন্ডী। আচ্ছা তাহলে সময় কাটার মতো যদি কোন কাজ না পাও , ধানমন্ডী লেকটা একটু ঘুরে আসো, হাওয়া-বাতাস খাও। ছেলে দেখি তারপরও বিরক্ত করে। ধ্যাত্তেরি! দিলাম ব্লক করে।
আমার কোন ছবিও প্রোফাইলে দেয়া নেই। মাঝে মাঝে ফেইসবুকে কিছু অপরিচিত মানুষের এড রিকোয়েস্ট পাই। ফেইসবুকের প্রোফাইলেও আমার কোন ছবি দেয়া নেই, কোন নজর কাড়া স্ট্যাটাসও দেয়া নেই। তবুও কেন রিকোয়েস্টগুলো আসে? এর কোন লিগ্যাল কারণ আছে কি? আমার তো মনে হয় নাই। কিছু ছেলেদের শুধু মেয়ে নিক দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছে করে, আজাইরা। এদের থামানোর কি কোন উপায় আছে? কোন আইন দিয়ে কিছু হবে? কিছুই হবে না। সমাজ থেকে এ ধরণের সমস্যা দূর করা যেতে পারে কিভাবে? এক্ষেত্রে তো কেবল বাবা-মার দায়িত্বটুকুই আমি চোখের সামনে দেখতে পাই। ছেলে-মেয়েদের সুস্থ-সুন্দর মন-মানসিকতা গড়ে তোলাই এর একমাত্র সমাধান। এরপর ছেলে-মেয়েরা বাইরের পরিবেশ থেকে, বন্ধু-বান্ধবদের দেখে দেখেও অনেক কিছু শেখে, স্কুলের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হয়তো বাবা-মার সচেতন মনিটরিংই একমাত্র সমাধান। কিন্তু একটা বয়সে ছেলে-মেয়েদের স্বাধীনতায় সেভাবে হস্তক্ষেপ করা যায় না। বিশেষ করে যারা কলেজে পড়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। যদি তাদের মন-মানসিকতা সেভাবে গড়ে ওঠে, নানারকম কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখে তাহলে হয়তো এসব টিজিং-চ্যাটিং জাতীয় কাজে তাদের আগ্রহ নাও তৈরী হতে পারে। আমার ধারণা (সত্যি নাও হতে পারে) যারা একাকীত্বে ভোগে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তেমন আড্ডা জমাতে পারে না, আশপাশের পরিবেশের সাথে তেমন মিশতে পারে না, তারাই হয়তো সময় কাটাতে নানারকমভাবে অনলাইনে অন্যদের ডিস্টার্ব করে থাকতে পারে। যারা সাইবার মবিং করে তাদের মধ্যে হয়তো এদের সংখ্যাই বেশি। অন্যান্য আরো কারণ থাকতে পারে।
২। ব্লগেই যেহেতু লিখছি তাই এবার একটু ব্লগ নিয়ে বলি। এখানে বিভিন্ন রকমের বিভিন্ন মানসিকতার ব্লগারদের সাথে সরাসরি ইন্টারেকশান হয়। এখানে আসা বেশিরভাগ ব্লগারই অনেক ম্যাচিউর্ড, এমনকি বাংলাদেশের প্রথম সারির শিক্ষিত লোকজন এখানে ব্লগিং করে। তাই বলে কি এখানে মবিং বা টিজিং বন্ধ আছে? না, বরং দেখি বাস্তব জগতে যেসব কথাবার্তা কখনোই শুনিনি, সেসব মারাত্মক রকমের অশ্লীল কথা দিয়ে আক্রমণ করা হয় কিছু নারী ব্লগারকে। এমনকি ই-মেইলেও চরম অশ্লীল কথা বলে হুমকি দেয়া হয়। যারা এসব করেন তারা কি আসলেই পরিবারে কোন শিক্ষা পাননি? বুকে হাত দিয়ে কেউ কি এ কথা দাবী করতে পারবেন যে না, আপনার বাবা-মা আপনাকে কোন শালীনতা শেখায়নি, নৈতিকতা শেখায়নি? তাহলে এই যে আমরা টিজিং-এর প্রতিকারস্বরূপ পারিবারিক সুশিক্ষা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কথা বলি, এটা কতটা তাত্ত্বিক, আর কতটা বাস্তবিক? আসলেই কি বাবা-মা ছোটবেলায় হাজার শেখানোর পরেও সবাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? একটা সময় পরে কি নিজের বিবেককে কাজে লাগাতে হয় না? যদি নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহিতার চর্চা আমরা করতে না পারি, তবে আসলে সব শিক্ষাই বৃথা।
এতোক্ষণ যা কিছু বললাম, এতো ঘটনা বললাম, সেগুলোকে সারাংশ করলে খুব অল্প কিছু কথাই আমরা পাই, শুধুমাত্র পোশাকের শালীনতার অভাব ইভ টিজিং-এর একমাত্র কারণ এটা মারাত্মক ভুল কথা, এটা অনেকগুলো কারণের মধ্যে মাত্র একটি। অনেক সময়ে না দেখেও, না চিনেও মানুষজন নানাভাবে বিরক্ত করতে পারে। অনেকে প্রতিকার হিসেবে বিভিন্ন আইন-কানুন ও তার প্রয়োগের কথা বলতে পারেন। হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে জরুরী প্রয়োজনে আইন দরকার হতে পারে। তবে সবসময়ে কথায় কথায় আইনের ঘরে দৌড়ানো মোটেই কার্যকর পন্থা নয়। আর সবার পক্ষে দিনের পর দিন একটা মামলা চালানো, নিয়মিত কোর্টে যাওয়া, সময় দেয়া এসব হয়ে ওঠে না। আবার ওইটাই তো শেষ ঘটনা নয়। একজন নারীকে তো একজীবনে নানা জায়গায় যেতে হতে পারে, নানান পরিবেশে থাকতে হতে পারে। কত জায়গায় কতবার মামলা করবে? তাই সামাজিক সমস্যা সামাজিকভাবে মোকাবেলা করাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পন্থা।
তাই আমার মতে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সাবধানী হওয়া, কৌশলী হওয়া, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া। তাহলে হয়তো অনেক উটকো ঝামেলা শুরুতেই এড়ানো যায়। আত্মীয়-স্বজনের বাইরে মানুষদের সাথে মেলামেশাতে, পথ চলাতে কিছুটা রাশ টেনে চলা। সবকথা যে সবসময়ে বলতেই হবে, সব অনুভূতি যে সবসময়ে প্রকাশ করাই লাগবে, এমন নয়।
ছেলেদেরও উচিত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া, পথে-ঘাটে মেয়েদের বিরক্ত করে কখনোই কারো পছন্দের কেউ হওয়া যায় না, প্রিয় তালিকায় যাওয়া যায় না। রাস্তায় আশেপাশে যারা ঐ ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে সবাই সেই টিজিংকারীদের মনে মনে ঘৃণাই করে, সবসময়ে হয়তো সরাসরি প্রতিবাদ করে না বা বাধা দেয় না। তাহলে ঘৃণা অর্জন কি কারো কাম্য হতে পারে?
আর বাবা-মার দায়িত্ব একেবারেই শুরুতে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদেরকে মেয়েদের প্রতি বা মেয়েদেরকে ছেলেদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। ভাল আচরণ শেখানো দরকার। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাগুলো ধীরে ধীরে বাচ্চাদের ভিতরে দিয়ে দেয়া। ছেলে-মেয়েরা বড় হতে থাকলে কাদের সাথে মিশছে, কী কী শিখছে এসবের প্রতি খেয়াল রাখা। বাচ্চারা যখন কৈশোর পর্যায়ে থাকে, তখন তাদের সাথে নানারকম গল্পচ্ছলে জেনে নেয়া যে বন্ধুমহলে, পথে-ঘাটে তারা কি কি করছে, সে সাথে তাদের গল্পের মাঝেই বুঝিয়ে দেয়া কোন কাজটা ভাল না, কোনটা ভাল। আর বাচ্চারা কোন অসুবিধায় পড়ছে কিনা, সেটা বাবা-মার সাথে কোনরকম সংকোচ ছাড়া শেয়ার করতে পারছে কিনা, এদিকেও খেয়াল রাখা দরকার।
মোটকথা বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব কমানো প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ৯:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


