ইফতারের পরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে গিয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। চা খাবার ডাক এলে উঠে পড়তে হলো। রাজুর হাতে বানানো চা খেয়ে সোজা হয়ে বসেই ইউটিউবে ছাড়লাম, "ঐ রমযানের ওই রোযার শেষে এলো খুশীর ঈদ..."। এ গানটা চাঁদরাতে না শুনলে কেমন যেন ঈদ ঈদ লাগে না সেই ছোটবেলা থেকেই। ভলিউম বাড়িয়ে দিলাম, পাশের রুম থেকে সামীর ভাইও সমর্থন দিলেন বার বার চলতে থাকুক এ গান, আরো সাউন্ড বাড়াও। না হলে কি রোযার ঈদ হয়?
এ গান শুনে দুই জুনিয়র সবুজ আর মঈনুল হৈ হৈ করে উঠলো। আপু প্লীজ প্লীজ গানটা বন্ধ করেন। এখনই কান্নাকাটি শুরু হয়ে যাবে কিন্তু। ওদের এবারই প্রথম বাবা-মা ছাড়া দেশের বাইরে ঈদ। আবেগে আক্রান্ত হয়ে উঠলো। আমরা যারা আরো দুই তিনটা রোযার ঈদ পার করেছি এখানে শয়তানি মার্কা হাসি দিয়ে উঠলাম, আরে! কাঁদো কাঁদো। দেখি কে কেমন কাঁদতে পারো?
সবুজ, তুমি নাকি প্রথম এসে ফোনে তোমার মায়ের সাথে হাউমাউ করে কেঁদেছিলে? আহা! আমি তো সেটা দেখিনি, কেবল শুনেছি। একটু কাঁদো তো, দেখি কেমন লাগে? বিদেশে এসে মায়ের জন্য কাঁদবে না, দেশের জন্য কাঁদবে না, তা কি হয়?
বেচারারা মুখ কালো করে কাজ করছে, সবুজ পেঁয়াজ কাটছে, মঈনুল আদা ছিলছে, রুমি রসূন কুচি করছে, আমি পায়েস রাঁধছি, সামীর ভাই মুরগী কাটছে......কালকের দুপুরে ঘরে খাবার জন্য, আর সন্ধ্যায় ইনহা মুসলিম ঈদ পার্টির জন্য রান্নার এন্তেজাম চলছে।
এর মাঝে আরো দুই জুনিয়র মাসুদ আর অসীম আসলো একটু আড্ডা মারতে। আরে! আপু জানেন না, ওই বাংলা রেষ্টুরেন্টে প্রতি বেলায় মুরগী খেতে খেতে আমাদের গায়ে পালক গজিয়ে যাবার দশা। ওরা এ সেমিষ্টারেই এসেছে। কাল রেষ্টুরেন্টে ভাল খাবার দেয়ার কথা, নতুনত্বের আশা করা হচ্ছে। দেশে তো জেলখানার কয়েদীদেরও ভাল খাবার দেয়া হয়, আমাদের আর না দিবে কেমন করে?
না হয় দুপুরে আমাদের সাথে খেও।
আচ্ছা, দেখা যাক্। ঐ খাবার পছন্দ না হলে চলে আসা যাবে। সন্ধ্যায় তো পার্টিতে দেখা হচ্ছেই।
রমযানের গানটা বেশ কয়েকবার প্লে করছিলাম। একটু পরে খেয়াল হলো। আড় চোখে পিচ্চিগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি না পারে কাঁদতে, নির্ঘাৎ আমরা হো হো করে হেসে দিবো, না পারে হাসতে। তাই আস্তে গিয়ে আমি গানটা পাল্টে দিলাম, "ঐ নীলাঞ্জনা, ঐ নীল নীল চোখে চেয়ে থেকো না..."
সামীর ভাই জিজ্ঞ্যেস করলেন, কি ব্যাপার, গান পাল্টালে কেন? ঐ গানই তো আজ সারারাত শুনবো।
আমি বলি না থাক্। অবস্থা বেগতিক হয়ে যেতে পারে একটু পরে। কারো কারো চোখ ফেটে কান্না এসে যেতে পারে। অবশ্য আজকে আমি সবাইকেই কাঁদাবো বলে ঠিক করেছি, সাথে বিতলা হাসি।
এরপর দিলাম "কতদূর আর কতদূর বলো মা? পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা কোলে তব মাগো বলো কবে শীতল হবো......"
সবারই একচ্ছত্র দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো, মা গো, মা।
সেটা শেষ হলে দিলাম, "আয় খুকু আয়......"। সাথে সাথে রুমি প্রতিবাদ করে উঠলো। না, আজ এ গান কিছুতেই চলতে পারে না। এতোক্ষণ ছোটদেরকে নিয়ে হাসতেছিলাম। এখন আমি আর সইতে পারবো না। এ গান অবশ্যই বদলাতে হবে। আমি নির্বিকার চিত্তে চুপচাপ পায়েস নাড়ছি। সামীর ভাই আর নাদিম ভাইয়ের মতো সিনিয়র ভাইরা বলতে লাগলো, আশ্চর্য রুমি, তুমি এতোদিন ধরে বাইরে আছো, তুমি কেন কাঁদবে?
রুমি চুপ হয়ে গেল, একটু পরে তাকিয়ে দেখি সত্যিই ওর চোখ লাল হয়ে এলো, সেটা দেখে আমাদের হাসাহাসি, রুমি তুমিও শেষপর্যন্ত! একি অবস্থা সবার!
রুমি গিয়ে গান পাল্টে দিলো, "সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে, সে আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম... "
ধীরে ধীরে মিউজিক কড়া হচ্ছে, মেলোডি থেকে ব্যান্ড, ব্যান্ড থেকে রক, এরপর হেভি মেটাল...জুনিয়রদের পছন্দ।
হেভিমেটালের কড়া কান ঝালাপালা সুরে কষ্ট চাপা দেয়ার ব্যর্থ প্রয়াস করে যাচ্ছে সবাই চুপচাপ, নীরবে হাতের কাজ চলছে, আদা পেস্টিং, রসূন পেস্টিং, চপের আলু ভর্তা, আমি কাস্টার্ডের দুধ চুলায় চাপিয়ে দিলাম...
এর মাঝে আমাদের একাডেমিক্যালী মোস্ট সিনিয়র বায়োকেমিস্ট ভাই ফাহিম । আরে! হেভভি আয়োজন চলছে তো। মনে হচ্ছে আজ ইনহার ঘরে ঘরে ঈদের খুশি লেগেছে। একটু পর আমার দিকে তাকিয়ে, এই মেয়ে, তুমি কি রাঁধছো?
কাস্টার্ড।
পিএইচডি করো আবার এটা সেটা কত কিছু রাঁধতে জানো, ব্যাপারখানা কি তোমার?
কেন, পিএইচডি আর রান্না মিউচুয়েলী এক্সক্লুসীভ নাকি?
হ্যাঁ তো, সেরকমই তো হবার কথা। আজকালকার মেয়েরা যারা লেখাপড়া করে তারা আবার রাঁধতে জানে নাকি?
উনি ঘুরে ঘুরে সবার কাজ দেখছেন, আর একেক কমেন্ট করছেন যে যাকে করছেন সে তো ফুলে ফেঁপে শেষ, বিশাল উৎসাহদাতা!!
আরে! সবুজ তো হেভভি পেঁয়াজ কুচি করছে, কি অভিনব টেকনিক! উল্লেখ্য ফাহিম ভাইয়ের আবার পশ্চিমে অনেক বছর পেঁয়াজ কাটার অভিজ্ঞতা আছে।
সবুজ জিজ্ঞ্যেস করছে, আপু পেঁয়াজ আর কতটুকু কাটবো? আর কি কি কাজ করতে হবে?
রুমিঐদিকে, আপু, আদা পেস্ট কি হয়েছে, নাকি আরেকটু করতে হবে?
ফাহিম ভাইর জিজ্ঞাসা, নাজনীন কি মেইন শেফ নাকি? আরিব্বাস! আবার তুমি কিসব ব্লগ টগ লিখো, সেগুলো নাকি মানুষে পড়েও, এতোকিছু একসাথে পারতে হয় নাকি?
এই হলো আমাদের মহান উৎসাহদাতা ফাহিম ভাই। বিশাল চাপা তার। উনার ভাষায় এ চাপা দিয়েই তো এ পর্যন্ত এলাম। পিএইচডি শেষ করলাম, পোস্ট ডক করতে এসে চাকুরী জুটালাম, চাপা না থাকলে কি হয়?
এরপর নিজের ল্যাপটপ খুলে শুরু করলেন মমতাজের গান শোনা, আজকের দিনে এটাই রক!
কিছুক্ষণ পর আবার ডাইনিং-এ এসে, রুমি কি চপ বানাচ্ছে? ওরে সব্বোনাশ! কি প্রতিভা একেকজনের!
আপনারা আবার ভাইবেন না আমি বিশাল রাঁধুনী। আমাদের নাদিম ভাইয়ের বিরিয়ানী, রনি ভাইয়ের পেটেন্টকৃত সালাদ, সামীর ভাইয়ের ঝড়ের গতিতে সব কাজ করা, শিপনের দৌড়-ঝাঁপ টাইপ কাজ করার দক্ষতা, আপুদের সুবিধা-অসুবিধার, খাওয়া-দাওয়ার দিকে বিশেষ দেখভাল করা, সাকীবের হাতের চা, ভাবীদের যথারীতি ভাল রান্নার পাশাপাশি আমার রান্না আসলে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু না। তবে অকেশনালী বেশ অনেকজনের জন্য মোটামুটি বাহারী পদের ঝুটঝামেলা টাইপ রান্না আর ওভারঅল ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে কিঞ্চিত সুনাম আছে। আসলে মা-খালারা এখানে নেই তো, চামে দাপট দেখানো আর কি!
বেশ অনেকক্ষণ মেটাল চলার পর নাদিম ভাই বলে উঠলেন, এই তোমাদের এই ঘেউ ঘেউ গান আর কতো? এবার কিছু সফট গান দাও। কান ব্যাথা হয়ে গেল তো! আবার সফট শুরু হলো।
এদিকে আবার রনি ভাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, ভাবী উনার সাথে, কাল রিলিজ হবার কথা, আশা করছি ঈদের আনন্দে আমাদের সাথে সামিল হতে পারবে।
চন্দনেরও কিছুটা ল্যাবের কাজে ব্যস্ততা থাকায় আমাদের আপাতত যোগ দিতে পারলো না, কাল উপস্থিত থাকবে বলে বলেছে। অতন্দ্রাও থাকবে।
রাকিব, রুপাও থাকবে, আজ তারা ব্যস্ত।
মোটামুটি আগামী কালের রান্নার পূর্বেকার আয়োজনের কাজ শেষ করে নিজের ডেরায় ফিরে এলাম। এতোক্ষণ তো সবাইকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কাঁদিয়েছি, এবার তো নিজের পালা।
প্রথমেই চট্টগ্রামে ফোন লাগালাম, বাচ্চারা বাবাসহ দিদুর সাথে ঈদ করতে গিয়েছে, যদিও আমার ছেলের নানুবাসায় ঈদ করতে চেয়েছিল, ওখানে তার বন্ধু-বান্ধব আছে। নানুকে বলে রেখেছে চটপটি রান্না করে রেখে দিবে, কাউকে খেতে দিবে না। আমি ফিরে এসে বন্ধুদের খাওয়াবো। নানু বললেন, আচ্ছা ঠিকাছে। কোন হেরফের হবে না।
আম্মুজী, আব্বুজী ঈদ মুবারক!! কেমন আছো তোমরা?
তোমার ওখানে কি ঈদ হয়ে গেছে, আম্মু?
না , হয়নি এখনো। কালকে হবে।
তুমি এখন কি করছো?
অনেক অনেক রান্না-বান্না করেছি, এখন ঘুমাবো। তোমরা কি করছো?
খেলছি লাবিবার সাথে।
বাচ্চাদের বাবার সাথে কথা হলো, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হলো তার সাথে, শ্বাশুড়ীর সাথেও।
এরপর ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভিওআইপি ঘুরে দুই ভাইয়ের সাথে গল্প হলো কিছুক্ষণ। আমরা দুই ভাই-বোন দেশের বাইরে থাকায় ছোট ভাইটাই কেবল বাবা-মার সাথে ঈদ করছে, তারই এখন একলা ঘরে রাজত্ব! অনেক রাত হয়ে যাওয়াতে বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে, কাল সকালে কথা হবে।
নাহ্, আবেগ সামলাতে পেরেছি শেষ পর্যন্ত। নো কান্নাকাটি। ভেতরটাও ফুরফুরে লাগছে।
যদিও মিস করছি স্বদেশ আর দেশের সাধারণ কিছু মানুষদের যাদের সাথে রোযা আর ঈদের সময় যোগাযোগটা কিছুটা বেড়ে যায় কিছু উপহার দেয়ার বিনিময়ে। এদেশে গরিব লোক নেই, তাই কাউকে কিছু দেবার মতো সুযোগও নেই। দেশের দরিদ্র মানুষদের সাথে সরাসরি কথা বলার বা সামর্থ অনুযায়ী কিছু দেবার সুযোগ ভীষণভাবে মিস করি। দূর থেকে ফিতরা আর যাকাত দিয়ে তেমন কিছু টের পাওয়া যায় না। হায় স্বদেশ!
সবাইকে ঈদ মুবারক!
[ডিস্ক্লেইমারঃ ইনহাবাসী কারো যদি এই টাটকা স্মৃতিমূলক পোস্টে কোন আপত্তি থাকে, আমাকে যেন তা জানানো হয়, তাহলে সাথে সাথে পোস্ট ড্রাফটে নিয়ে যাওয়া হবে। আশা করি কারো আপত্তি থাকবে না।]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


