ইদানীং পত্রিকা খুললেই যে খবরটা হররোজ চোখে পড়ে তা হলো ইভটিজিং-এর ফলে শিক্ষক আহত, পরে নিহত, টিজিং-এর প্রতিবাদ করায় মা নিহত, ভিকটিম আত্মহত্যা করেছে.........
আরো নানারকম নেতিবাচক খবর পত্রিকার প্রথম পাতায় থাকে বলে আজকাল আর সকালে পত্রিকা পড়ি না, একেবারে সব কাজ সেরে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে চোখ বুলাই। তা না হলে সারাদিন মনের উপর এক ধরণের ভার অনুভব করি, যেটা লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায়।
যেসময়টায় সারা দেশে ইভ টিজিং-এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরীর একটা অভিযান চলছে, ঠিক তখনই এধরণের হতাশার চিত্র আরো বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে। বেশি বেশি বলছি এ কারণে টিজিং-এর কারণে আগে কেবল আমরা কিশোরীদের আত্মহত্যার কথা শুনতাম, এখন দেখি টিজাররা আরো বেপরোয়া, প্রতিবাদকারীদের উপর হামলে পড়তেও তাদের বিন্দুমাত্র হাঁটু কাঁপছে না। তার মানে তাদের মনের ভিতরে এখন আর অপরাধবোধের কোন চিহ্নই নাই!
ভাবখানা এমন যে, আর করবে প্রতিবাদ, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মিছিল, মিটিং, মানব বন্ধন???? আমরাও কম কিসে!!
তো, এখন আমরা কি করতে পারি? টিজারদের বুড়ো আঙ্গুল দেখানো দেখে হতাশ হয়ে দরজায় খিল এঁটে মেয়েদের ঘরে বসিয়ে রাখবো, স্কুলে পড়ুয়া মেয়েদের ধরে ধরে বিয়ে দিয়ে দিবো, টিজারদের সব ধরে ধরে চৌদ্দ শিকের ভিতরে ঢুকাবো?? কি হতে পারে আশু সমাধান?
কেন জানি "দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কঠিন কঠিন আইন এবং তার সুষ্ঠ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে" --- আমাদের শ্রদ্ধেয় মানবতাবাদীদের এ কথাটা শুনলে আমার হাসি পায়। দুঃখিত এভাবে বলার জন্য, এটা জাস্ট একটা তোতাপাখির মতো বুলি আওড়ানোর ব্যাপার মনে হয়, যা আসলে কোনদিনই বাস্তবে দেখা যাবে না, অন্ততঃ এই বাংলাদেশে, যেখানে পুলিশেরাই গাড়িতে সীটবেল্ট বাঁধে না, আবার অন্যের উপর ছড়ি ঘুরায়। যে দেশে আইনজীবিরাই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে সবচেয়ে বেশি এবং সেগুলো মোক্ষমভাবে কাজে লাগায় তাদের রোজগারের স্বার্থে। হা হা হা। আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা চাওয়াটা লাইভ কৌতুকই বটে!
এর চেয়ে বরং আমরা দেখি কোন কোন পদক্ষেপ বা কি কি ব্যাপার আমাদের জনমনে বা তরুণমনে সাড়া তোলে বেশি, প্রভাব ফেলে বেশি। এর জন্য প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, মানতে হবে
"ইভ টিজিং" একটি "সামাজিক সমস্যা"
এরপর কিছু সম্ভাব্য পদক্ষেপ ভেবে দেখি,
সম্ভাব্য করণীয় ১:
বিভিন্ন সময়ে আমাদের জাতীয় জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে সরকারের তরফ বিভিন্ন বিজ্ঞাপন তৈরী হয়। এই যেমন, যৌতুক নিয়ে, ডাইরিয়া নিয়ে, আর্সেনিক সমস্যা নিয়ে, পরিবার পরিকল্পনা, যক্ষা সহ আরো নানা বিষয়ে। এরকমভাবে টিজিং-এর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিজ্ঞাপন তৈরী করে সেটা বিটিভিসহ সব চ্যানেলে এবং সব রেডিও স্টেশন থেকে প্রচার করা দরকার। [আমি জানি না ইতিমধ্যে এটা হয়েছে কিনা, যেহেতু আমার টিভি দেখা হয় না, হয়ে থাকলে ভাল।]
থিমটা হতে পারে যে ছেলেটা টিজ করছে পাড়ার অভিভাবকরা তাকে ডেকে নিয়ে আন্তরিকভাবে বোঝালো যে এটা তার ভুল হচ্ছে, তার বাবা-মাকেও জানালো, মেয়েটিকেও বোঝানো যে কেউ টিজ করার মাত্রা ছাড়ালেই তাতে মেয়েদের কোন সম্মান যায় না, এমনকি ধর্ষণের স্বীকার হলেও।
[আমাদের সমাজের এই ট্যাবুটা খুব জরুরী ভিত্তিতে পা্লটানো উচিত যে ধর্ষণের স্বীকার একটা মেয়ের কোন সম্মানহানি হয় না, হওয়ার কোন যুক্তি নাই, বরং সেটা ধর্ষকেরই অপমান, তার পরিবারের অপমান।]
তাই টিজিং-এর স্বীকার হলে আত্মহত্যা করা মানে আদতে সেটা নিজের পরাজয় মেনে নেয়া, টিজারদের দুঃসাহস আরো বাড়িয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে মেয়ের পরিবারের একটা পজিটিভ ভূমিকা দেখানো যেতে পারে। এবং সবশেষে দুই তিনবার বুঝানোর পরও যদি সেই টিজার নিজেকে সংশোধন করতে না পারে, তাহলে আইনের হাতে সোপর্দ করা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। সবশেষে ইভ টিজিং রোধে আমাদের দেশে কি কি আইন আছে সেটা স্পষ্টভাবে বলে দেয়া।
এগুলো এক বা একাধিক বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে করা যেতে পারে।
সম্ভাব্য করণীয় ২:
আমাদের মোবাইল ফোনগুলোর বিজ্ঞাপনের থিমগুলো দারুণ হৃদয়গ্রাহী! মন ছুঁয়ে যায়, গ্রামীন ফোনের মায়ের অপেক্ষা দেখে বা দিঘীর ময়না পাখির কথা নিয়ে বা বাংলালিংকের ছোট্ট মেয়েটির মৃত মায়ের কাছে চিঠি লিখে আকাশে বেলুন উড়ানো দেখে কারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন?? ইভ টিজিং নিয়েও হতে পারে সেরকম একটি বিজ্ঞাপন, যা আমাদের কোটি কোটি তরুণদের মনে একটু হলেও ধাক্কা দেবে। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া তন্বী তরুণীটিকে কিছু কথামালা ছুড়ে দেবার আগে আরেকবার ভাববে অন্ততঃ।
সম্ভাব্য করণীয় ৩:
আমাদের চলচ্চিত্রে টিজিং টাইপ চিত্রায়ণের উপর সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন। অত্যন্ত দুঃখজনক যে আমাদের চলচ্চিত্রে নারীদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ভীষণ রকমের ব্যক্তিত্বহীন আর অসহায়ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় নারীচিত্রগুলো। তাই পজিটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণে আমাদের চলচ্চিত্রকারদের এগিয়ে আসা দরকার যেখানে নারীদেরও মুখ্য ভূমিকা থাকবে, কেবল কোমলমতি আর প্রেম নিবেদন আর প্রেম করার সাবজেক্ট হিসেবে নয়। নারীদের চরিত্রগুলো আরো বলিষ্ঠ হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে হুমায়ন আহমেদের নাটক বা চলচ্চিত্রে নারীদের অবস্থা অনেক ভাল, তারা অনেক জ্ঞানী, দার্শনিক, প্রচন্ড মানসিক শক্তি সম্পন্ন, বাস্তববাদী এবং দায়িত্বশীল হয়। এখান থেকে অন্যরা শিখতে পারেন।
সম্ভাব্য করণীয় ৪:
আমাদের ফারুকীরা এ নিয়ে সমাজের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে সম্ভাব্য প্রতিকারের দিকে ইংগিত দিয়ে বানাতে পারেন কোন চলচ্চিত্র, যেটা টিভিতেও এক যোগে মুক্তি পাবে, যাতে করে দেশের অধিকাংশ দর্শক সে ছবি দেখার সুযোগ পায়। রাইসুল ইসলাম আসাদরা যেমন "হিল্লা বিয়ে" নিয়ে ইসলামের নানারকম আইনে কি আছে সেগুলো তুলে ধরে আর্ট ফিল্ম তৈরী করেছেন, সেরকমভাবে ইভটিজিং বিরুদ্ধেও জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারেন।
কারণ, আমাদের দেশে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে কেবল মেয়েরা পর্দা করলেই বা বোরকা পরলেই সব ইভ টিজিং বন্ধ হয়ে যাবে। আসলে এটা যে কেবল আংশিক সমাধান, পূর্ণ নয়, সেটা সবাইকে বোঝাতে হবে। এক্ষেত্রে একটা ছেলের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন আর মেয়েদের ব্যক্তিত্বেরও ব্যাপার থাকে, সেটা সবাইকে আরো বেশি বেশি জানাতে হবে। হ্যাঁ, শালীনতার প্রয়োজনীয়তার কথা আমি এড়িয়ে যাচ্ছি না। নারী-পুরুষের পোশাকের যেমন শালীনতার প্রয়োজন, তেমনি দরকার আলোকিত মন, মনের শালীনতা, এগুলো কেবল টিজিং-এর জন্য নয়, সব ধরণের অশ্লীলতা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই দরকার।
সম্ভাব্য করণীয় ৫:
গণিত অলিম্পিয়াড আমাদের দেশে স্কুলের বাচ্চাদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় একটি প্রতিযোগিতা। প্রায় সারাদেশেই বিভিন্ন স্কুলে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়। সেখানে আমাদের ছেলে-মেয়েদের গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। এ আয়োজনের সাথে যারা জড়িত তাদের প্রায় প্রতিটি কথা শিশুরা গোগ্রাসে গিলে। তাই এই প্রতিযোগিতা আয়োজনে মাধ্যমে শিশুদের গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি ইভ-টিজিং-এর বিরুদ্ধে সচেতন করেও তোলা যেতে পারে। ওই বয়সেই তারা যদি এ ব্যাপারে সঠিক শিক্ষা পায়, সে শিক্ষা অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে তাদের উপর। এছাড়া স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বিভিন্ন খেলা-ধূলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সময়েও এ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। দেখা যায় ওই সময়েও অনেক প্রতিযোগী মেয়েরা টিজিং-এর স্বীকার হয়।
সম্ভাব্য করণীয় ৬:
আজকের আধুনিক যুগে আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। পাশের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা দূরে থাক, নিজের ছেলে-মেয়েরা কি করছে সেটাও অনেক সময়ে আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। এজন্যে আমাদের পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। আমরা অনেক সময়ে একই পাড়ার মধ্যে এমনকি একই বিল্ডিং-এর কার ছেলে মেয়ে কে, কোন ছেলের বা মেয়ের বাবা-মা কারা, এটাও পর্যন্ত জানি না, চিনি না। ছেলে-মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কেউ বিপদে পড়ছে কি, কেউ বিপথে যাচ্ছে কি, এসবও জানি না। আবার কখনো কখনো জানলেও ঝামেলা এড়াতে চাই, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি সবাই। এর থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।
এজন্য এলাকার অভিভাবকেরা মিলে একটা সাপ্তাহিক বা মাসিক আড্ডার ব্যবস্থা করতে পারেন, যেখানে তাদের ছেলে-মেয়েরাও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করবে, নিজেরাই বাসা থেকে ভাগাভাগি করে নিজেদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে করে সবার সবাইকে চেনা-জানা হবে, হৃদ্যতা বাড়বে। এলাকার স্কুলগুলোতে মাঝে মাঝে এমন অভিভাবকের মিলনমেলা হলেও সেটার উদ্দেশ্য ভিন্ন থাকে। আবার সেখানে নিজ এলাকা ভিন্ন অন্য এলাকার অভিভাবকরা থাকেন বলে সবসময়ে সবার সাথে পরিচয়ও হয় না। এলাকার সবার সাথে একটা পরিচিতি থাকলে সে এলাকায় মাস্তানি, টিজিং, জুয়ার আড্ডা অনেকাংশেই কমে যায়। এক্ষেত্রে পাড়ার মসজিদগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। শুক্রবারে বিকেলে এলাকার সবাইকে (কেবল পুরুষদেরই নয়, নারীদেরও) মসজিদে আসতে বলতে পারেন, বিভিন্নজনের সুবিধা-অসুবিধা আলোচনার, সবার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ইমামসাহেব এক্ষেত্রে একটা ভাল সামাজিক ভূমিকা রাখতে পারেন। আফটারঅল একজন ইমাম কেবল নামাজের ইমামতিই করবেন না, তিনি একটা সমাজকেও নেতৃত্ব দিবেন, এটাই আশা করা হয় ইমাম তথা নেতাদের কাছে।
সম্ভাব্য করণীয় ৭:
গ্রাম বা এলাকাভিত্তিক যে পঞ্চায়েত বা স্থানীয় সালিশী ব্যবস্থা আছে, সেটাকে স্থানীয় প্রশাসনের বা ইউনিয়ন পরিষদের বা পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকারের সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালার ভিতরে রেখে চালু রাখলে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সমস্যা সমাধানে কার্যকর ও তড়িৎ ভূমিকা রাখে। এ ব্যাপারে আমি আর বিস্তারিত বলছি না। নীচের এই পোস্টে পঞ্চায়েতের ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা দেয়া আছে।
আমাদের গ্রাম পঞ্চায়েত
আরো কোন সম্ভাব্য করণীয় থাকলে সেগুলো পাঠক আপনারা শেয়ার করতে পারেন।
আর সবশেষে আমি আমাদের প্রিন্ট মিডিয়া আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার লেখক, কর্মী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিব ইভ টিজিং-এর বিরুদ্ধে তাদের সচেতনতা আর বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য। অনেক অনেক লেখা বা কর্মশালা বা উদ্যোগ আমরা দেখেছি এ নিয়ে সাংবাদিকদের এবং লেখকদের।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


