দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল। সেই ২০০৮-এ যখন দেশ ছেড়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি দিলাম, চারপাশে ভিন্ন ভাষার দাপটে কেমন যেন অসহায় লাগতো। কি যেন নাই, কিসের যেন অভাব টের পেতাম। তখনই ল্যাবমেটের পাঠানো তার ব্লগের লিঙ্ক থেকে সামহোয়ারইনের কথা জানতে পারি। এর আগে দেশে থাকতে কলিগদের কাছে সচলায়তন ব্লগের কথা শুনলেও নিজের কখনো ব্লগ কি জিনিস, এটা জিজ্ঞ্যেস করারও আগ্রহ হয়নি, ঢু মেরে দেখা তো পরের কথা। আমি এটাকে অনেকটা ফোরামটাইপ কিছু ভেবে নিয়েছিলাম।
কিন্তু বাইরে আসার পর প্রতিদিনের বাংলায় কথা বলা বা বাংলা পত্রিকা দেখার অভ্যাসের ছেদ ঘটলো, সেখান থেকেই ব্লগের প্রতি আগ্রহ জন্মালো। তো, প্রথম ব্লগই পড়লাম মনে হয় কোন এক আস্তিক-নাস্তিক ক্যাঁচাল নিয়ে পোস্ট, আমার ল্যাবমেটেরই লেখা ছিল মনে হয় সেটা, ধুন্ধুমার তর্ক-বিতর্ক, তার চেয়ে ঝগড়াটাই বেশি মনে হলো। এরপর বিভিন্ন পোস্টে পোস্টেই কেমন যেন গালাগালিটা আর ঝগড়াটাই বেশি চোখে পড়লো আমার, তার উপর ঠিক ওই সময়টাতেই চলছিল আলেকজান্ডার ডেনড্রাইটের সেই ঐতিহাসিক পোস্টটাতে মাইনাস দেয়ার উৎসব, তখন মনে হয় দুইশটার কাছাকাছি। ওই পোস্টের সব কমেন্ট পড়তে পড়তে আমার কাহিল দশা। আর ব্লগ নিয়ে একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতাই প্রথমে হলো, কেবলি একটা গালাগালি বা ঝগড়া করার জায়গা মনে হচ্ছিল। তখন পর্যন্ত আমি ভিজিটর।
ধীরে ধীরে বিভিন্ন ব্লগারদের প্রিয় পোস্টের লিস্ট নজরে এলো, আর আমিও অনেক অনেক ভাল পোস্ট খুঁজে পেলাম, এমনকি ২০০৬ এরও অনেক পোস্ট পড়া হলো আমার এই করে করে। ধীরে ধীরে ব্লগের ব্যাপারে আমার ধারণা পাল্টাতে থাকে, এক সময়ে আইরিন সুলতানার বীরাঙ্গনাদের নিয়ে করা পোস্টটা আমার চোখে পড়ে। এরকম আরো কিছু ভাল পোস্ট দেখার পর রেজিষ্ট্রেশন করার সাহস সঞ্চয় করলাম, অবশেষে খুব সম্ভবত ফেব্রুয়ারী ২০০৯-এ সামহোয়ারইনের ব্লগারের লিস্টে নিজের নাম উঠালাম।
এর আগে আমি কখনো লিখিনি। ছোটবেলায় আপন মনে দুই একটা কবিতা লিখেছি কি, সেটা কাউকে দেখাইনি, কোথাও ছাপাতেও পাঠাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একবার দুটো আর্টিকেল অনুবাদ করেছি, আর ডিপার্টমেন্টের দেয়াল পত্রিকায় মুসলিম তিন চার বিজ্ঞানীর পরিচিতিমূলক ছোট্ট একটা লেখা লিখেছি, এই আমার লেখালিখির পরিধি। তাই প্রথম প্রথম বুঝতে পারতাম না কি লিখব, কোন বিষয়ে লিখবো। তবে মনে মনে সবসময়ই একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল নারীদের নিয়ে কিছু করার, সেই সুবাদে নারী বিষয়ক টপিকটাই আমার কাছে সহজ মনে হলো, যা নিয়ে আমি নিজের মতো করে কিছু কথা বলতে পারবো। মাঝে মাঝে টুকটাক অন্য বিষয়ে কথা বললেও আজ পর্যন্ত সেই টপিকেই আছি মূলত। গল্প-কবিতা লেখার মতো প্রতিভা আমার নেই।
তো এই ব্লগের কাছে আমার অনেক ঋণ। অনেক অনেক অনেক কিছু শিখেছি বিভিন্ন ব্লগারের বিভিন্ন পোস্ট থেকে। আমার মূলত প্রবন্ধজাতীয় ও ইতিহাসবিষয়ক লেখাগুলোই বেশি ভাল লাগে, মানে সিরিয়াসলী পড়ি। এছাড়া মোটামুটি সর্বভূক ব্লগপাঠক আমি। অবসর পেলে আড্ডা পোস্ট, ছবি ব্লগ, মাঝে মাঝে কিছু গল্প, কিছু কবিতা, ম্যুভি বিষয়ক, ক্যাঁচাল মার্কা পোস্ট, এমনকি ১৮+ পোস্টও বাদ যায় না। তবে খুব বেশি মাত্রায় কুরুচিশীল মনে হলে বেরিয়ে পড়ি। সবচেয়ে মজা পাই ক্যাঁচাল পোস্ট পড়ে, যদিও ওইসব পোস্টে আমি অংশ নেইনা সাধারণত, কিন্তু হাতে সময় থাকলে মাঝে মাঝেই ঢু মেরে দেখে আসি কত ঝগড়া আর তর্ক-বিতর্ক আমাদের ব্লগাররা করতে পারে।
এই দুই বছরে প্রথম সেইফ হবার পর থেকে একবারো জেনারেল বা ওয়াচে
থাকিনি। বড়ই নিরীহ ব্লগার!
প্লাস-মাইনাস বাটনগুলো খুব কমই ব্যবহার করেছি। ব্লগ জীবনের প্রথম দিকেই মানে ২৫ ফেব্রুয়ারীর ঘটনার পরপরই বিপ্লব কান্তিকে প্রথম মাইনাস দেই আমি তার এক পোস্টে "ভারতীয় বিডিআর" লেখার জন্য। এটা অবশ্য উনার অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল, পরে সংশোধন করে নিয়েছেন। এরপর আরেকটা মাইনাস দিয়েছি মনে হয় হিজাববিহীন নারীকে খোসাছাড়া কলার সাথে তুলনা করে একজন পোস্ট দিয়েছেন তাকে। ব্লগারের নাম মনে নেই। এছাড়া আর কোন মাইনাস দেয়ার ঘটনা মনে করতে পারছি না। তাদের মনে কোন কষ্ট দিয়ে থাকলে দুঃখিত। প্লাস বাটন কবে কোথায় ব্যবহার করেছি অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না।
এই দুই বছরের জীবনে নানা মতার্দশের ব্লগারদের সাথে ব্লগে বা ব্লগের বাইরে ফেইসবুকে বা ই-মেইলে পরিচয় হয়েছে, অনেক কথা শেয়ার করেছি, অনেক ইস্যু নিয়ে ব্লগের বাইরেও ই-মেইলে বা ফেইসবুক ম্যাসেজের মাধ্যমে আলোচনা করেছি, নিজের মতামত খোলাখুলিভাবে শেয়ার করেছি বিভিন্ন সময়ে। এসব পরিচিতদের মাঝে একেবারে ডানপন্থী আস্তিক ব্লগার থেকে শুরু করে মধ্যপন্থী আস্তিক, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীর ব্লগারসহ নাস্তিক ও বামপন্থী ব্লগাররাও আছেন। তাদের অনেকের সাথেই একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আবার এমন অনেক ব্লগারও আছেন যাদের লেখা আমি অনেক পছন্দ করি, অনেক লেখক এ ব্লগেরও নন, অন্য ব্লগে গিয়ে তাদের লেখাগুলো পড়ে আসি, কিন্তু তাদের সাথে পরিচয় করাটা হয়ে উঠেনি। আমার ব্লগের ডানপাশে আমি পছন্দের ব্লগারের কোন লিস্ট রাখিনি। কাদের লেখা আমি বেশি পছন্দ করছি, আমাকে বেশি অনুপ্রাণিত করছে, বা তাদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখছি, সেটা না হয় আমিই জানি।
ব্লগে যখন আমি হিজাব নিয়ে পোস্ট দেই, তার কিছুদিনের মাঝেই একজন ব্লগারের মেইল পাই, একটা ফোরামের লিঙ্কও ছিল একটা মেইলে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম কেমন করে তিনি আমার ই-মেইল এড্রেস পেয়েছিলেন, কারণ তখনো পর্যন্ত ব্লগে আমি আমার কোন ই-মেইল আইডি শেয়ার করিনি, তিনি আমার পরিচিত কেউও নন। এ রহস্যটা আমি আজো বুঝিনি। পরে এক সময়ে অবশ্য আমারই একটা পোস্টের একটা কমেন্টের জবাবে এড্রেস শেয়ার করেছি।
এরপর একসময়ে একজন ভিজিটরের মেইল পেয়েছি প্রশংসা সহকারে। বেশ অবাক হয়েছিলাম অপরিচিত কেউ এভাবে আমার মতো নবীন লেখককে মেইল করে উৎসাহ দিবে, অথচ যিনি নিজেই ব্লগার নন। অনেক কৃতজ্ঞতা উনার প্রতি।
সবসময়ই ব্লগীয় ক্যাঁচাল থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। তবুও না চাইলেও কিছু বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছি।
এই যেমন মঞ্চে নারীদের বক্তৃতা দেয়ার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে প্রথম বিতর্কে জড়িয়েছি। এর জন্য চরমোনাইয়ের পীরের অনুসারী ব্লগার দুর্ধর্ষ বেদুঈন (আগে অন্য কোন নাম ছিল) প্রথম আমাকে উৎসর্গ করে একটা পোস্ট দেয়, হিজাব-নেকাব নিয়ে। সেসময়ে একজন অপরিচিত নন-ব্লগার ভিজিটর ই-মেইলে কিছু ডকুমেন্ট পাঠিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন, যাতে আমি আমার বক্তব্য সহজেই রেফারেন্সসহ তুলে ধরতে পারি। উনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা রইলো।
এরপর ইতিহাসবিষয়ক এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লাম, সেসময়ে দাসত্বকর্তৃক অনাকাংখিত খুব বাজে আচরণের স্বীকার হলাম। সেসময়ে যেসব ব্লগারেরা এর প্রতিবাদ করেছেন বা আমার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন সবাইকেই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।
একদিন এখানকার এক ভাবীর সাথে কথা বলছিলাম। ব্লগ নিয়ে গল্প করতে করতে যখন উনি আমার নিকের কথা জানলেন, অবাক হয়ে গেলেন, তোমার ব্লগ তো রেগুলার পড়ি, আমার বুকমার্ক করা আছে, জানতাম না তো এটা তোমার ব্লগ ---- এক অদ্ভূত ভালো লাগায় মন ভরে উঠে। এভাবে ব্লগ এবং ব্লগের বাইরে চেনা-অচেনা অনেকের ভালোবাসা পাই, অবাক হই, অদ্ভূত অনুভূতি হয়। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসও বাড়ে, তাহলে আমিও কিছু একটা লিখতে পারছি!
খুব কাছাকাছি সময়ে দূরের পাখি অনেকটা গায়ে পড়েই আমাকে উৎসর্গ করে কয়েকটা পোস্ট দিলেন, কারণটা আমার ঠিক বোধগম্য নয়। তবে কয়েকদিন আগে নাস্তিকদের কোন এক কথা নিয়ে মাত্র এক প্যারার একটা সমালোচনা করেছি আমার এক পোস্টে, সেটাই হয়তো উনাদের গাত্রদাহের একটা কারণ হতে পারে। সন্যাসীর পোস্টেও আমার কমেন্টকে কপি পেস্ট করে এক ধরণের জল ঘোলা করে আমাকে ক্যাঁচালে নামানোর এক ধরণের অপচেষ্টাও দেখেছি। যাই হোক, দূরের পাখির পরের পর্বগুলো আমার দেখা হয়েছে অনেক পরে, কারণ ওই মুহূর্তে আমি দেশে ছিলাম। একজন ব্লগার আমাকে খবর দিয়েছিলেন, "আপনি তো সেলিব্রেটি হয়ে যাইতেছেন, মানুষে আপনারে উৎসর্গ কইরা সিরিজ পোস্ট নামায়"।
তবে ঐসব ক্যাঁচালীয় পোস্টে আহ্লাদী ব্লগার অপ্সরার (নিকের পিছনে যত বাস্তববাদী আর জটিল মানুষই থাকুক না কেন) দূরের পাখিকে ক্যাঁচাল বাদ দেয়ার কোন কথা না বলে বরঞ্চ ব্লগে নিয়মিত হতে আহবান জানানোতে আমি বেশ অবাকই হয়েছি। উনার যে দূরের পাখির ক্যাঁচাল এতো পছন্দ জানা ছিল না, উনাকে বরাবর আহলাদীই ভাবতাম আমি। যাই হোক, মজার ব্যাপার হলো আমার কোন এক নাস্তিক ব্লগার বন্ধুই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন দূরের পাখির সাথে বাহাসে না যেতে, কারণ তার মুখ প্রচন্ড খারাপ, কমেন্টের জবাবে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতে পারে। যেটা আমার জন্য অস্বস্তিকর। কিছুদিন পর দূরের পাখির ব্লগ ভিজিট করে পোস্টগুলোও পড়ে আসলাম, সেই সাথে সেগুলোতে করা কমেন্ট আর কমেন্টের জবাবগুলোও দেখে আসলাম। বুঝলাম আমার সেই বন্ধুটি সঠিক পরামর্শই দিয়েছেন।
এই তো আমার টক-ঝাল-মিষ্টি ব্লগীয় অর্জন গত দুই বছরে। এর মাঝে অনেক ব্লগারের সাথে গল্প হয়েছে, কারো সাথে সহমত, কারো সাথে দ্বিমত, কারো ব্যাপারে নো কমেন্টস, অনেক ব্লগারের ভালোবাসা, কারো কারো বিরক্তি --- সব মিলিয়ে ভালই লাগে ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি "সামহোয়ারইন ব্লগ"।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


