১।
ইউনিভার্সিটিতে হটাত করেই পার্টটাইম টিউটর হিসাবে একটা ক্লাস পেয়ে গেলাম। থার্মোডিনামিক্স পড়াতে হবে। আমার বুয়েট লাইফে যেই সাবজেক্টাতে আমি সবচেয়ে খারাপ করছিলাম, আর যে সাবজেক্টাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, সেটা হল থার্মোডিনামিক্স।
তাও টাকা বলে কথা, ক্লাস নিলেই টাকা, কোনমতে ঘন্টা পার করতে পারলেই টাকা। তাই ভাবলাম পড়ি না হয় একটু থার্মোডিনামিক্স। বইপত্র জোগাড় করলাম। রেনল্ড-পার্কিনসনের থার্মোডিনামিক্স বইটা পুরা ভাজা ভাজা করে ফেললাম। কিন্তু প্রবলেমগুলো সলভ করতে গিয়ে দেখলাম, বেশ কঠিন আর কোন এনসার দেওয়া নাই। তাই প্রবলেমগুলা সলভ করার পর, আমার কেমন জানি সন্দেহ লাগতে থাকে। অবশেষে গেলাম আমার নিয়োগদাতা প্রফেসরের সাথে দেখা করতে। খুবই অমায়িক মানুষ। কিন্তু প্রবলেমগুলার কথা বলতেই উনি কেমন যেনো কাচুমাচু হয়ে গেলেন। বললেন, “ব্যাপার না আরাফাত, আসল কথা কি, সব প্রবলেমগুলার সলভ আমার কাছে আছে, কিন্তু আমি তো সেগুলো ইন্দোনেশীয় ভাষাতে করেছি(উল্লেখ্য যে, তিনি ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক)। তাই আমার করা সলভগুলো তোমার কোন কাজে আসবেনা। বেটার তুমি নিজেই সলভ করার চেষ্টা কর।”
এই কথা বলার পরে তো আর কথা চলে না। তাই রুমে ফেরত এসে আবার প্রবলেম সলভ করাতে মনোযোগ দিলাম। কিন্তু একদিন পরে আমার মন আবার খুঁতখুঁত করতে থাকে। শেষে আর সহ্য করতে না পেরে আবার গেলাম প্রফেসরের কাছে। এবার উনাকে বললাম, ইন্দোনেশীয় সলভগুলো আমাকে দিতে। কারণ নিশ্চয়ই উনি নিউমেরিক ডিজিটগুলো ইন্দোনেশীয় ভাষাতে লিখেন নাই, ইংরেজীতে লিখেছেন। আর আমার তো শুধু এনসারটাই দরকার। ভিতরের অংশটুকু তো আমি নিজেই সলভ করতে পারব।
এই কথা শুনার পরে উনি বেশ হতাশ বোধ করতে থাকেন, ছটফট করতে থাকেন। আর আমিও নাছোড়বান্দার মত উনার সাথে লেগে থাকি। অবশেষে উনি বলেন, “দাঁড়াও আমি খুঁজে দেখি সলভগুলো।”
অবশেষে তিনি সলভগুলো খোঁজা শুরু করলেন। আধাঘন্টা খোঁজাখুঁজির পরে তিনি বেশ প্রসন্ন গলায় বললেন, “স্যরি আরাফাত, আমি মনে করতে পারছিনা, সলভগুলো কোথায় রেখেছি। মনেহয়, বাসাতে আছে। বেটার তুমি নিজেই সলভ করার চেষ্টা কর।”
এই কথার পরে আমিও বুঝে গেলাম, আসলে উনার কাছে কোন সলভ নাই। থার্মোডিনামিক্সে উনার অবস্থা আমার মতই। উনি আমাকে দিয়ে সলভগুলো করিয়ে নেবার তালে আছেন। নেহায়ত উনি ভদ্র মানুষ, এবং অবশ্যই আমিও, তাই আর কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম।
এবার আরো ভালোমত চ্যাপ্টারগুলা পড়লাম। অন্যসব বই বেশ ঘাঁটাঘাটি করলাম। এবং শেষ পর্যন্ত আমার পড়ানোর বিষয়গুলার উপর মোটামুটি একটা ভালো আইডিয়া এসে গেল।
২।
প্রেজেন্টেশানে আমি বরাবরই মোটামুটি ভাল। যাইহোক, প্রথমদিন ক্লাশে গেলাম। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের উপর বেশ কনফিডেন্স বোধ করছি।
“শুভ সকাল” বলে ক্লাশে প্রবেশ।
আমার নব্য শিষ্যদের দিকে তাকাই। শুরুতেই যে জিনিসটা আমাকে আনন্দ দিল, তা হল, ক্লাশে বালিকার আধিক্য। জাতীয়তার বিবেচনায় চাইনিজ বেশি। তার পরে মালয়শিয়ান। বেশ কিছু মধ্যপ্রাচ্যের আর আফ্রিকান। টুকটাক অন্য দেশের আছে। একদম প্রথম সারির একটা মেয়ে উত্তর ভারতীয় বলে মনে হল।
যাইহোক, আমি এখন শিক্ষক, ছ্যাবলামি করলে তো চলবেনা।
পড়ানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরে আবিস্কার করলাম, সবাই কেমন যেন, ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু প্রশ্ন করলে এনসার দেয়না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাদের সুধালাম, “তোমরা কি আমার কথা বুঝতে পারছো?”
তবুও তারা ফ্যালফ্যাল। আমি ভাবি, আরে মহা মুছিবত তো দেখি। চামে নিজের জিপারের দিকে তাকালাম। নাহ, ঠিকই তো আছে। তাহলে? মন কেমন যেন উসখুস করতে থাকে। মনে হতে থাকে কি যেন ঠিক নাই। কি করা যায় তাহলে? মন বলল, বাদ দাও, আরো পড়াও, থার্মোডিনামিক্সের কত রহস্য এখনো ওদের জানতে বাকি।
মনের কথায় সায় দিয়ে, আবার পড়ানো শুরু করলাম। বোর্ডে কিছু সুত্র মার্কার দিয়ে লিখলাম। সেগুলো নিয়ে আলোচনা-সমলোচনা করলাম। অবশেষে একটা প্রবলেম লিখলাম, আর একটা সূত্র বাদে বাকি সব সূত্র বোর্ড থেকে মুছে দিলাম। এই সূত্রটা দিয়ে এখন, এই প্রবলেমটা সলভ করব।
কিন্তু এখনো তারা ফ্যালফ্যাল। আর আমি থার্মোডিনামিক্স আর এনট্রপির রহস্যময় জগতে হাবুডুবু খেতে থাকি। ক্লাশে পিনপতন নিরবতা, খালি বোর্ডে মার্কার দিয়ে লিখার শব্দ।
অবশেষে নিরবতার অবসান। জনৈক চাইনিজ ছাত্রের উত্থান এবং আমার দৃষ্টি আকর্ষণ। ক্লাসের সবার পক্ষ থেকে সে আমাকে অনুনয় করে, “স্যার, আমাদেরকে পাঠ্য বই থেকে পড়ান।”
“মানে, বল কি? আমি তো এতক্ষণ পুরোটাই বই থেকে পড়াচ্ছিলাম। তোমরা বুঝ নাই? আর এখন যে প্রবলেমটা সলভ করাচ্ছি, সেটাও তো বইয়ের সাত নম্বর প্রবলেম।”
হায়রে, আমি এ কি শিক্ষকতা করাচ্ছি।
৩।
রাতে বাসায় এসে, সুইমিং পুলে হাবুডুবু খেতে থাকি, আর ক্লাশের কথা ভাবতে থাকি।
পানিতে থাকা অবস্থায় হটাত কোন এক বালিকা সুধাল, “হাই স্যার।”
প্রতি উত্তর দিয়ে বালিকাকে ভাল করে দেখি। সে নিজেই পরিচয় দেয়, আমার চাইনিজ ছাত্রী, নাম লিলেন।
শিক্ষক মানুষ, তাই তাকে সুধাই, “ক্লাশে থার্মোডিনামিক্স বুঝতে সমস্যা হয়নি তো।”
সে বেশ লাস্যময়ী হাসি দিয়ে প্রতি উত্তর দেয়, “নাহ, অন্তত আমার দিক থেকে হয়নি। একেবারেই জলবত-তরলং।”
পানিতেই আমাদের কথোপকথন চলতে থাকে। খোলা আকাশের নীচে, সুইমিং পুলে নিজের ছাত্রীকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখে বেশ শিহরিত হই। মাথার ভিতর খালি থার্মোডিনামিক্সের একটা সূত্র ঘুরতে থাকে, “জগতের সকল সিস্টেম যা বাহ্যিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়না, তা এক সুনির্দিষ্ট ও অমোঘ পরিণতির দিকে এগুতে থাকে।”
হায়, আমার কোন পরিণতি নাই, স্যাম্যাবস্থা নাই।
দূর, থার্মোডিনামিক্সের কোন সূত্রই বাস্তব জীবনে কাজে লাগেনা। সব ভুল।
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।