জীবনে এর আগে কোনদিন এমন ফ্রি সময় পেয়েছি বলে মনে পরেনা। সেই '৯২ থেকে যে আমার কাজের জীবনের শুরু, তার যেন আর শেষ ছিলনা। কোন দিনও ঘুমাতে গেছি রাত ১১ টায় বলে মনে পরে না। স্পেশালি সিংগাপুরে আসার পরে রোজ কাজের চাপে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ২/৩টা বেজে গেছে। শনি রবি বার শুধু ঘুমাতে ইচ্ছে করত। এই ছোট্ট একমুঠো শহরের কিছুই চিনতাম না প্রথম ৩.৫ বছর
আমার সোশাল জীবন বলে কিছু ছিলনা। বন্ধু বান্ধব ও তেমন জমে ওঠেনি কারো সাথে শুধু কাজে ব্যস্ত থাকবার কারনে। যখন চাকরি ছেড়ে নিজের কম্পানি শুরু করলাম - ভেবেছিলাম জীবনটা এখন হাল্কা কাটবে

। কিন্তু সেগুড়ে বালি

একটার পর একটা প্রজেক্টের কাজে যেন আমার কুপোকাত দশা

।
২০০৯ এ যখন ঢাকা গেলাম। কালপুরুষ দাদা কে অনেক কষ্টে সময় বের করে দেখতে গেছি ও ব্লগ আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। কারন ওবারও এক প্রজেক্টের মাঝখানে ঢাকা গেছিলাম ও ঢাকা থেকেই কাজ করছিলাম।
দেখা হয়নি নাজনীন আপাকে, রোদেলা, পারভীন আপা আর আমার অনেক আত্বীয় স্বজনকেও। দেখা না হবার মন খারাপ নিয়েই ফিরে এসেছিলাম
অস্ট্রেলিয়া মুভ করে যাওয়া উপলক্ষে এখানে কাজ গুটিয়ে ফেলতে হলো গত মাসে। শেষ কাজটা গত মাসে করে অন্য কোন কাজ আর নেইনি। ১০০% সব কিছু বন্ধ করলাম আইগত ভাবে। আর সাথে সাথেই আমার যেন অফুরন্ত সময়!!!
সারা জীবন কাজ করে যেমন ব্যস্ত থেকেছি তেমন আনন্দও পেয়েছি অনেক

!! তবে আজ যখন কোন কাজ নেই, আজ যেন অন্য রকম ভাললাগা

। জীবনে প্রথম কিছু না করে সময় পার করার স্বাদ পাচ্ছি। প্রথম ক'দিন দেরিতে ঘুম থেেক ওঠা, নিয়মিত জিমে যাওয়া, মাজার মজার রান্না করা, ব্লগিং করা

, ফেসবুকিং করা, চ্যানেল আই দেখা

, শহরে গিয়ে হেটে বেড়ানো

....খুব খুব এনজয় করলাম। যেন আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে
ক'দিন পরেই যেন জীবনে অতিরিক্ত সময় পেয়ে অস্থির ও টায়ার্ড হয়ে পরলাম

। মনে মনে ভাবি আহা সুখে থাকতে ভুতে কোলোচ্ছে এখন আমাকে

। তবু কাজ ছাড়া জীবন যেন দূর্বিসহ হয়ে উঠল।
সময় কাটাতে তাই এখন আমি জিমে যাওয়া ছারাও কোন না কোন কিছু রোজ করার চেষ্টা করি। কখনও বন্ধু নিপা বা জলির সাথে বাইরে যাই বা ছবি আঁকি বা মাইল ৬/৭ হেটে আসি

। নভেম্বর পর্যন্ত এই চলতে থাকবে

। নিপা আমাকে বলে "আরে জীবনের প্রথম ফ্রি টাইমটা এনজয় কর অন্য কিছু না করে, একবার কাজ শুরু করলে আবার কবে এমন সময় পাবে কে জানে

" কথাটা কিন্তু সত্যি

।
আজ তেমনই একটা দিন তার উপরে ক্লিফ অফিসের কাজে সাউথ আফরিকা। বন্ধু আনিসের জন্য আই ফোন৪ এর দামের ইনফো জোগার করতে শহরে গেলাম। হঠাৎ জলির ফোন। "কই তুমি?" বলি "অর্চাডে" ও বলে "কি কর ওখানে?" বললাম কি করি। ও বলল সেও আসতে চায়। যেই কথা সেই কাজ। মেয়ে ঘন্টা দেড়েকের মাঝেই শহরের আরেক মাথা থেকে এসে হাজির।
শুর হলো দুজনের এ'দোকান ও'দোকান ঘুড়ে ঘুড়ে এটা সেটা দেখা ও কেনা

। লাঞ্চের পরে জলির মাথায় আসলো ও ট্যাটু করবে ওর হাতে। আমার তো আঙ্কেল গুরুম

। আমিতো ব্যথা পাবার ভয়ে কোন দিন ঐ পথে পা দেইনি যদিও মনে মনে খুবই একটা ট্যাটু করার ইচ্ছে। যাই হোক দুজনে গেলাম ওর ট্যাটু করাতে। করার সময় ব্যথায় জলি আমার হাত এমন করে চেপে ধরলো যে আমার আঙুল গুলো ভাঙ্গার যোগার

। ওর এই অবস্থা দেখে আমার মনে যে সামান্য আশা ছিল ট্যাটু করার তা কর্পূরের মতন হাওয়ায় উড়ে গেল

।
তবে ট্যাটু টা আঁকা শেষ হলে খুবই চমৎকার দাড়াল নীল রং এর প্রজাপতিটা ওর ডানার উপর

দেখেই যেন আবারও আমার মনে একটা ছোট খাট ইচ্ছে মাথা তুলে দাড়াবার চেষ্টা করল। ওটাকে গলা টিপে মেরে আমারা এ্যারাব স্ট্রিটে ঢু'মারতে গেলাম

। এ্যারাব স্ট্রিটে চমৎকার এক ইজিপ্সিয়ান খাবারের দোকান আছে। ওখানে মাটিতে কার্পেট আর তাকিয়া দিয়ে বসবার আয়োজন। চাইলে শিশা ট্রায় করতে পারবেন

তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে আরাম করে রাজকীয় ভাবে বসে।

। ওদের খাবারটা ও খুব মজা। আমরা হামুজ আর ইজিপ্সিয়ান ব্রেড নিলাম গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে দাতে কিছু কাটবার জন্য আর কোল্ড ড্রিংক। প্রায় ঘন্ট চারেক বসে আড্ডা মারার পরে বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করলাম। এর মাঝে ওয়েটার এসে আমাদের টেবিলটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেল খাবারের পাত্র গুলো সরিয়ে নিয়ে।
দু'জনে উঠলাম। দু'জনে দু'পথে যাব। দু'জন শহরের উল্টো দিকের দু'প্রান্তে থাকি। আমি থাকি "উলু পানডান" আর ও থাকে "বেডক", তো দু'জনে দু'পথে রওনা দিলাম। বাড়ি পৌছে ঘরে পা দিয়েই মনে পরল আহা খাবারের দাম তো দেয়া হয়নি

। উফ মেজাজটাই গরম হয়ে গেল

। কেমন করে এই কাজটা করলাম? লজ্জায় মাথা কাটা যাবার মত অবস্থা আমার। আর আমরাও দোকানের ওয়েটার গুলোর সামনে দিয়ে আরাম আয়েশ করে শ্লো মোশানে যে বেরিয়ে আসলাম, ওরা আমাদের চলে যেতে দেখেও বিলটা চাইলো না

? হায়রে আবার ও আমাকে ওখানে যেতে হবে বিল দিতা

। মাথার চুলের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে জলিকে দিলাম ফোন। ও বলে "আরে আমারও তো মনে পরে নাই"।

কেমন করে এত গুলো মানুষ এক সাথে ব্যাপারটা ভুলে গেল?
যাই হোক আমার কর্মহীন জীবনে একটা কাজের যোগার তো করলেন গড

। মন্দ কি

? নাহয় কাল আবার যাওয়া হবে ঐ ওছিলায়

....সময়টাও কাটবে চমৎকার এ্যারাব স্ট্রিটের পথে পথে ঘুড়ে

......যাস্ট এনজয় - জীবন যেখানে যেমন
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১১:৪৬