অনেকদিন ফায়ার ফক্স ৪ এর ঝামেলায় হাবুডুবু খেয়ে বাংলা লেখা বন্ধ ছিল।
এর মাঝে অনেক কিছু হয়ে গেল অনেক গল্প মাথার ভেতর এসে অসাহায় দাপাদাপি করে অক্কা পেল। বাংলা ব্লগ লেখার আশায় হাল যখন ছেড়ে দিয়ে বসে আছি হঠাৎই আজ সব ঠিক হয়ে গেল!!! আর সাথে সাথে ভাবলাম আমার রিসেন্ট এক্সপেরিয়েন্সটা সাবার সাথে শেয়ার করি ..... Sharing is Caring ....
কিছু দিন থেকে কাজ করছি রেডক্লিফ সিটি আর্ট গ্যলারিতে। সেখানেই পোর্ট্রেটে এর ক্লাসে যখন লাইভ মডেলের ছবি আঁকছি পরিচয় হলো ৬০ এর বেশি বয়সের এক অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রোলোকের সাথে। আমি বাংলাদেশের মেয়ে শুনে সে বলল ক্লোনর্টাফ চার্চে নাকি বাংলাদেশীদের কি একটা প্রগ্রাম হবে শনিবার বিকেল ৫টায়। $৫ যার ফি Followed by বাংগালী dinner. এর বেশি সে কিছুই বলতে পারল না। জিঙ্গেস করলাম ওখানে এই এলাকার বাংগালীরা থাকবেন কিনা। কিন্তু উনি সেটাও জানে না। তবে বললেন বাংগালী ডিনার যখন সার্ভ করা হবে তখন নিশ্চই বাংগলীরা থাকবেন।
বাড়ি ফিরে ক্লিফকে বললাম। ক্লিফ খুব উৎসাহিত হয়ে গেল খবরটা শুনে। আমাকে বলল, Let's go there...u never know...you may find some Bengali friends there! That would be so great to know the Bengalis live around here!!
তো আমরা ঠিক করলাম যাব। শনিবার ছিল আমার কার হান্টিং ডে। সকালে দুজন চলে গেলাম ইপ্সুইচ রোডে গাড়ির দোকান গুলোতে আমার জন্য একটা ভাংগা চোরা লক্কর ঝক্কর মার্কা গাড়ি খুজতে
ফিরতে ফিরতে ৩।৪৫ বাজে। ঠিকানা ধরে ক্লোনটার্ফ চার্চ খুজে বের করলাম। আমাদের বাড়ির কাছেই। তবে সেখানে কোন বাংগালীর নাম গন্ধ পাওয়া গেল না
তো এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে ৫টায় আবারও গেলাম ওখানে। মনে তবু ক্ষীন আশা দু'একজন বাংগালীর দেখা তো নিশ্চই পাবো। পৌছুতেই একজন হাসিখুশি সালোয়ার কামিজ পরা আস্ট্রেলিয়ান মহিলা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে রিসিভ করে বললেন "Thanks so much for coming down"
লিজ নামের এক মধ্যবয়স্ক মহিলা অদ্ভুৎ কায়দায় জড়িয়ে পল্টিয়ে শাড়ি পরে আমাকে একটা বিশাল Warm hug দিলেন। ওদের কাছে শুনলাম এক ভদ্রোলোক জিনি বাংলাদেশে একটা এন জি ও তে কাজ করেন উনি এখানে বাংলাদেশী গ্রামের বিয়ের অনুষ্ঠান পারফর্ম করে দেখাবেন তার সাথে সাথে শেয়ার করবেন বাংলাদেশী কালচার ও উনার এক্সপেরিয়েন্স উনার অস্ট্রেলিায়ন বন্ধুদের সাথে!!
আর না, ওখানে কোন বাংগালী আসবেন না। কারন উনারা কোন বাংগালীকে চেনেন না। অভিভুত হয়ে গেলাম উনাদের আয়োজনের কথা শুনে! আমি বাংগালী শুনে উনারা কিযে খুশি হয়ে গেলেন!! বললেন নাটকের মেয়েরা শাড়ি নিয়ে মহা ঝামেলায় আছে কারন কেউই শাড়ি পরতে জানে না ...... আমি যদি কোন ভাবে সাহায্য করতে পারি! আমি উৎসাহিত হয়ে বললা "Off course !! i will help them to wear sari and whatever else they need"
ভেতরে গিয়ে দেখি ৬/৭ জন মেয়ে শাড়ি নিয়ে পেচা পেচি করে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভুতুম প্যচা হয়ে বসে আছে
ওরাও শাড়ি পরে খুব খুশি হয়ে গেল, খুব পছন্দ হলো এদের এই নতুন পোশাক ও পরার কায়দা
বর সেজেছে লুঙি আর পাঞ্জাবীতে...মাথায় আবার পাগড়িও আছে
কি যে চমৎকার মানিয়েছে গ্রাম্য ছেলে গুলো কে !!!
যাহোক অনুষ্ঠান শুরু হলো। এর মাঝে মেঝেতে সারি দিয়ে আসন ফেলা হয়েছে গ্রামের ভোজের মতন। আর মান ুষ গুলো সারি দিয়ে মেঝেতে বসেছে খাবার খাওয়ার জন্য। তার মাঝে খাবার পরিবেশন শুরু হলো একেবারে গ্রাম্য কায়দাতেই।
যে মানুষ গুলোর মেঝেতে আসন পেতে বসার অভ্যাস নেই সেই মানুষ গুলোই এখন কষ্ট করে হলেও বসেছে।
উপস্থাপক বর্ননা করে যেতে থাকলেন একে একে গ্রামের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা গুলো চমৎকার ও নির্ভুল ভাবে। বললেন খাবার খেতে হবে হাত দিয়ে চামচ বা কাটা চামচ ছারাই। আর অভিনয় করে দেখালেন কি করে চার আঙুল দিয়ে খাবার ধরে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠেলে তা মুখে পুরে দিতে হয়।
খাবার পরিবেশন করা হলো বড় বড় সসপ্যান আর প্লাস্টিকের গামলায় করে। ঠিক যেন আমাদের গ্রামে বিয়ের ভোজের দৃশ্য!!
মানুষ গুলো সার বেধে মাটিতে বসে হাতের পাঁাচ আঙুল মাখিয়ে খাবার মুখে পোরা শুরু করলো। হাতে খাবার খাওয়া যে কতটা কষ্ট এদের জন্য তা দেখে সত্যি মায়া হলো
বেচারারা অজানা এক কালচার কে জানার ও শেখার জন্য সেই কষ্টও হাসি মুখে মেনে নিল!!
উপস্থাপক বললেন কনের বয়স ১২/১৩ আর বরের বয়স ৪৫, মেয়ের বাবাও বরের চাইতে বয়সে ছোট। বর্ননা করলেন এমন ধরনের বিয়েতে অনেক সময়ই মেয়ে পালিয়ে গিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্বহত্যাও করে বা পালিযায় কোথাও। আবার মেয়ের বাবা বিয়েতে দু'রকমের মিষ্টি কেনার প্রমিস করে এক রকমের মিষ্টির আয়োজন করায় ছেলের বাবা কি মহা গোল পাকিয়েছে তা অভিনয় করে দেখানো হলো।
খাওয়ার মাঝে উপস্থাপক আমার ও ক্লিফের সাথে কথা বলতে এলেন। পোশাক বদলে লুঙি ও পানঞ্জাবী পরে এলেন উনি। দেখতে উনাকে গ্রাম্য মোড়োলের মতনই দেখাচ্ছিলো!!
এই ভদ্রলোক আমাকে কোন রকম আগাম জানান ছাড়াই শুরু করলেন শুদ্ধ বাংলায় "আপনি কেমন আছেন? ভাল তো?" আমি তো হতভম্ব হয়ে টোটালি ফ্রিক্ড আউট!!!
বললাম " আমার বাড়ি ঢাকা" উনি বললেন "দেশের বাড়ি কোথায়?" আবারও বড় একটা ধাক্কা খেয়ে নিশ্বাস টেনে মনে মনে ভাবলাম ভালই বাংলা কালচার শিখেছেন উনি বটে, বললাম " আমার দেশের বাড়ি রাজশাহী"। আমার হাত মাখা ছিল খাবারে তাই সরি বললাম হ্যান্ডশেক করতে না পারার জন্য। উনি চমৎকার স্পষ্ট বাংলায় বললেন "বেয়াদবি মাফ করবেন, আমারই ভুল খাবার সময় বিরক্ত করলাম। আপনি খাওয়া শেষ করুন"। এর পরের কথা বার্তা হলো সব ইংরেজিতে কারন উনি ততক্ষনে বুঝে গেছেন আমার ফ্রিক্ড আউট অবস্থা।
এর মাঝে লিজকে ঠিক করে শাড়ি পড়িয়ে দিতেই সে খুশি হয়ে এখানে সেখানে নেচে বেড়াতে থাকলো
এই অচেনা মানুষ গুলোর ব্যবহারে আমি অভিভুত!! এদের অসাধারন ভালবাসা আমার চোখে পানি এনে দিল। একজন অবাংগালী হয়ে বাংলার কালচার কে নিজেদের মধ্যে শেয়ার করার মতন মানসিকতা আমাকে অবাক করেছে। নিজেরা যা জনেছে শিখেছে তা নিজেদের আর সবার সাথে শেয়ার করার মানসিকতা সত্যিই সন্মান করার মতন। আমরা বাংগালী হয়ে নিজেদের সন্মানিত করবার জন্য বা নিজের জাতিকে সবার কাছে পরিচিত করার জন্য যা করিনা এরা অন্য জাতি হয়ে তা করে দেখাল। আমারা বাংগালীরা যারা বিদেশে থাকি উনারা একসাথে হন খাওয়াদাওয়া, সমালোচনা আর কুটনামো করার জন্য। আমাদের দেশটাকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করবার জন্য বা আমাদের কালচার কে অন্য দেশের মানুষের কাছে পরিচিত করবার জন্য কজন ক'টা আয়েজোন করেছেন আমার জানা নাই। যদি কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন উনারা তবে তাতে ইনভাইট করা হয় শুধু মাত্র স্বজাতিকেই। বিদেশিদের জন্য কোন অনুষ্ঠান করে দেশ কে পরিচিত করার জন্য কোন অনুষ্ঠানের কথা খুব কমই শুনেছি। পারত পক্ষে উনারা বিজাতিকে বয়কট করে চলেন।
আমি যখন ৫/৬ বছরের....বাবা/মা'র সাথে হল্যান্ডে থাকতাম। দেখতাম আমার বাবা/মা সহ সব বাংগালী মিলে একসাথে জোট বেধে থাকতেন এক সাথে সব কিছু করতেন। একের সাহায্য অন্যে এগিয়ে আসতেন। সবাই মিলে ডাচদের জন্য বাংলাদেশী অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বিশাল হল ভারা করে। যেখানে ডাচরাই থাকত ইনভাইটেট গেষ্ট হিসেবে আর বাংগালীরা থাকতেন হোস্ট হয়ে বা কিছুনা কিছু উপস্থাপনায়।
আজকাল এমন দেখিনা বা শুনি নাই এখনও। অবশ্য আমার জানা শোনা খুবই কম বাংগালীর সাথে। আমার সঙ্গিটি নন বাংগালী হওয়ায় আর আমার বেড়ে ওঠা বিদেশিদের সাথে বলেও বাংগালীদের সাথে জানা শোনা কম। তবে বাংগালীরাই আমাদের এড়িয়ে চলেন বা পেছনে কটুক্তি করেন অনেক সময় এমন অভিঙ্গতাও হয়েছে তবু আমরা দু'জনি সুযোগ পেলেই সমমনা বাংগালী খুজি।
স্বজাতির কাছে যে ভালবাসা সন্মান পাই নাই তা সেদিন বিজাতির কাছে পেয়ে মন ভরে গেল, চোখে পানি চলে এলো....। তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। মনে রাখবেন SHARING IS CARING ........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

