মাত্র পাশ করে বেরিয়েছি তখন, সিংগাপুরে। পাশ করবার আগেই চাকরি একটা জুটে গিয়েছিল কপালের জোরে। তবে রেজাল্ট বেরয়নি বলে সেই চাকরিতে টিকতে পারলামনা ইমিগ্রেশনের কারনে
স্যাক্সন ও টেরেসা'র সাথে আমি আর আমার কলিগ আভান্তি
যাই হোক তেনারা তিন জনই এক সময় আমাকে নিয়ে মাথায় তুলল আর তার সাথে চমৎকার সব কলিগ আমার পাশে। অফিস তো না জীবনটা তখন যেন আড্ডা বাজি আর পার্টি প্রতিদিন। আমরা সবাই কাজ করতাম পাগলের মতন, শহরের সেরা কাজ গুলো বের করতাম আমরা।
আমাদের চিনতনা কম মানুষই ছিল সেই মিডিয়াতে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৩/৪ পর্যন্ত কাজ করতাম সবাই মিলে। তবু রোজ সকালে গান গেয়ে নাচতে নাচতে অফিস যেতাম আবার নাচতে নাচতে গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম খুব কম দিনই বিকেলের আলো দেখে বাড়ি ফেরার সুযোগ হয়েছে তখন।
স্টানলির বাসায় ডিনার, টেবিলে শেষ মাথায় কালো শার্ট পরে স্টানলি বসে।
মনের সুখে ৩/৪ ঘন্টা ঘুমিয়েও কোন কমপ্লেইন ছিল না জীবনে। সারাদিন গান শুনে শুনে আমরা কাজ করতাম, আর অফিসের ডিজে ছিলাম আমি
প্রেম নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা ভুলেও মনে আসতো না। অফিসই ছিল ঘড়বাড়ি অফিসই ছিল আমাদের ছোট পরিবার। প্রেম করতে হলে যে সুন্দর করে সাজতে হয় সুন্দর করে তাকাতে জানতে হয় সেটাও তখন ভুলে গেছিলাম
দেশে গেলেই বাবা বিবাহের কথা বলেন নানান ইশারা ইংগিতে, আর মা'কে ফোন করলে মা'র ঘ্যানর ঘ্যান - বিবাহ কেমনে হবে এই জীবনে। কথায় বার্তায় জিঙ্গেস করে নতুন কারো সাথে পরিচয় হলো কিনা। আমি বলি, "সময় কই বাইরে যাবার"। মা আমার মিন মিন করে বলে, "উইক এন্ড এ গান বাজনা শুতে গেলেও তো পারো মনটা ভাল লাগবে। মনের ও তো একটা এন্টারটেইনমেন্ট লাগে"। আমি ভাবি উমমম দেখি যাবো একসময়। এই একসময় করতে করতে কখন তিনটা বছর পেরিয়ে গেল টের পাইনি
এর পর থেকে শুরু হলো আমার মন খারাপ করা রোগ
একদিন স্যাক্সন ডাকল আমাকে তার অফিসে। বলল, " আমি শুনলাম তুমি বাইরে কোথাও যাওনা, কেন যাও না?" বললাম, "সময় কই"। সে বলে, "সময় বের করলেই সময় হয় না করলে না, আমি চাই তুমি বাইরে যাও, মানুষের সাথে মেশ"। আমি বলি, "স্যাক্সন আমি কোন ভাল মানুষ দেখিনা আমার অফিসের বাইরে, আই থিং আই এম লিটল স্কেয়ার্ড টো গো আউট"। স্যক্সন ব্যপারটা জেনেই বলল, "Believe me, loads of good people out there, You just haven't tried yet......i really want you to go out and mix with people and find someone special, I don't want to see you in the office after 8pm and over the weekend".
তো আস্তে আস্তে বের হওয়া শুরু করলাম। যাই হোক তখন আমার গাড়ি নেই আমি সকাল সন্ধ্যা ঠেলাঠেলি করে ট্রেনে চেপে অফিস যাই। আমার বাড়ি থেকে ট্রেন স্টেশন ৫/৭ মিনিটের হাঁটা পথ। ট্রেনে এত ভীর থাকে এই দু'টো সময় যে কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটা চ্যালেঞ্জ আর কি। ট্রেন এত ফাস্ট চলে যে হুরমুর করে কারো গায়ে পরাটা নিত্যদিনের কাহিনী। ট্রেনে আমার একটা প্রিয় জায়গা ছিল যেখানে আমি প্রতিদিন দাঁড়াতাম, জায়গাটা আমার পারমানেন্ট হয়ে গেছিল। সেটা হলো দরজার পাশে জানালার পাশে শেষ সিটটার ধারে হেলান দিয়ে দঁাড়াতাম। বলাই বাহুল্য বসবার জায়গা কখনই পেতাম না আর কখনও পেলেও তা বুড়োদের জন্য ছেরে দিতাম। রোজই একই সব যাত্রাসঙ্গিদের সাথে দেখা হত কারন সবাই একই সময়ের ট্রেন ধরত একই লাইনের, মাঝে মাঝে কেউ কোন কারনে ট্রেন মিস করলেই শুধু দেখা হয় না। আমি রোজ এক হ্যান্ডসাম বুড়োর হুইসেল শোনার অপেক্ষায় থাকতাম। উনি চমৎকার করে হুইসেল দিতেন! ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত একটার পর একটা গান হুইসেল দিয়ে গেয়ে চলতেন, বয়স তার ৬০/৬৫ হবে
সেদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে স্টেশনের পথ ধরতে যাব দেখি রাস্তার ওপার থেকে এক ছেলে বয়স ৩৬/৩৭ হবে, রাস্তা পেরিয়ে এসে আমার একটু আগে আগে স্টেশনের পথা হাটা ধরল। তাকে সুদর্শনই বলব যদিও সে আমার টাইপ নয় তবু তাকে যদি সুদর্শন না বলি তাহলে এক ধরনের পুরুষ সৌন্দর্যকে অপমান করা হয়। সেই দৃস্টিতে সে একটু বারাবারি রকমের সুদর্শন। তাকে দেখে বোঝা যায় না সে ইটালিয়ান নাকি ইন্ডিয়ান (বম্বের)। কেউ যদি Alec Baldwin কে পছন্দ করেন তাহলে তিনি তাকে পছন্দ করবেন। কারন সে হুবহু Alec Baldwin এর মতন দেখতে। বাই দ্যা ওয়ে আমি Alec Baldwin কে পছন্দ করিনা পার্সোনালি
তো সেই লোক বা ছেলে স্টেশনে ঠিক আমার বগির দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। না না আমার তাতে কোন অসুবিধা নাই। সে কোন বগিতে উঠবে সেটা তার ব্যপার।
এভাবে এই জায়গাটা নিয়ে মারামারি করতে করতে রোজ দিন শুরু করি। কি যন্ত্রনা রে বাবা! এই ছাগলের জ্বালা থেকে বাঁচতে যদি কখনও অন্য বগিতে উঠেছি তো সে সেখানেও হাজির, বাপ, সারা ট্রেনে এত দরজা, তোর আমারটা নিয়ে টানাটানি কেন
তো সেদিন আমার জয় হয়েছিল। ছাগলটা একই দরজায় আমার উল্টাদিকের হেলান দেবার দেয়ালে দঁাড়িয়ে, আর আমি বই খুলেছি যথারীতি। এমন সময় ট্রেনের দুলুনিতে পেছন থেকে একজন হুরমুর আমার গায়ের উপর এসে পরল আর আমার হাত থেকে বইটা ছিটকে ছাগলের সামনে গিয়ে পরল। আমি ধাক্কা সামলে বই টা তুলতে গেছি, ছাগলও ভদ্রতা দেখিয়ে বইটা তুলতে গেছে আর যাবে কোথায় মাথা ঠুকে গেল এমন জোরে ছাগলের মাথার সাথে যে সাথে সাথে আমার কপালে আলু ফুটে গেল। আমি দুই হাতে আমার মাথা চেপে ধরে রাগের চোটে কি করব বুঝতে পারছিলাম না। ছাগল তো আপ্লুত হয়ে আমাকে ধরতে এল, জানতে চাইল কতটা ব্যথা পেয়েছি। আমি মনে মনে গালি দিয়ে বলি শালা তুমি সিনেমা সিনেমা খেলার জায়গা পাওনা
আমি ইমেল বা ফোন কোনটাই করিনি, করার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই ছিল না। পরের দিন সে আমাকে স্টেশনে ধরল। কেমন আছি, আমার আলুর অবস্থা কি, আবার মিট মিট করে হাসে
সেই সময় আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু আমাকে একটা হিন্দি গান শোনাল। আমি হিন্দি বুঝিনা তবে গানটার সুর চমৎকার! ক'দিন ধরে মাথার ভেতর গানটা ঢুকে আছে। বারবার গানটা শুনি। মাঝে মাঝে আমার এমন একেকটা গানের নেশা উঠে। সবারই হয়ত এমন হয়। গানটা শুনতে শুনতে পচে না যাওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। তো আমার তখন ঐ গানের সময় চলছে, গানের মানে একবর্ন বুঝিনা শুধু সুরটার জন্য গানটা শুনি। আসলে দু'টো গান তখন আমাকে গিলে গিলে খাচ্ছিল। একটা ছিল ইংলিশ, আমার খুবই প্রিয় একটা গান........
Save me a Saturday night
আর হিন্দি গানটা হলো ..........
Tuhi re
গান গুলোর সুরে কিছু একটা যাদু আছে যা ভাললাগায়, বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। শুনতে শুনতে হয়তো ভিকি'র - ভিকাশ - ছাগলটার নাম ছিল ভিকাশ বা সর্টকাট ভিকি, ওর জন্য ভেতরে ভেতরে কিছু একটা তৈরি হচ্ছিল। ওর ছাগল মার্কা চেহারাটাও হয়ত মনে হতে লাগল কোন ভাবে ঠিক ঠাক করে নেয়া গেলে যেতেও পারে
এই সময় কোন এক Saturday night এ He asked me out for dinner. আমি কি সেজেছিলাম সেদিন? মনে নেই ঠিক, সাজতে তখন জানতাম না তেমন, তবু ভিকির চোখে মুগ্ধতা ছিল!
আমার কোরিয়ান পছন্দ বলে আমরা কোরিয়ান দোকানে খেতে গিয়েছিলাম। ও নানান মজার মজার কথা বলে আমাকে হাসাচ্ছিল। আমি কেমন করে ঠোট সরু করে "সরি" বলি সেটা নিয়ে মজা করছিল। বলছিল কখন আমি তাকে আমার রান্না খেতে ডাকবো বাড়িতে.....এমন সব নানান রোম্যান্টিক কথাবার্তা আরকি
তো এর মধ্যে বাসার সামনে এসে গেলাম। সে হেসে আমাকে জিঙ্গেস করল আমি কি তাকে কফি খেতে বাড়িতে আসতে বলতে চাই কিনা তখন। আমার তখন মেজাজ টং এ উঠে গেছে........কফি কিসের রাত বারটায়?? যা শালা বাড়ি যা, বাড়ি গিয়ে নিজে নিজে কফি বানিয়ে খা গিয়ে
এর পর আমি অফিস যাওয়া শুরু করলাম খুব ভোরে। সকাল ৭টার ট্রেন ধরতাম ভিকি কে এড়ানোর জন্য, আর ভিকি যথারীতি সকাল ৮.৩০শের। ভিকি প্রায়ই ইমেইল করত, বলতাম কাজের খুব চাপ চলছে একটা ক্যম্পেইন নিয়ে তাই তাড়াতাড়ি অফিস আসতে হয়। অনেক বার সে কফি খেতে ডাকল, ডিনারে ডকাল। আমি ডেট ফিক্স করেও শেষ মুহুর্তে ক্যানসেল করেছি "সরি" বলে। মন সায় দেয়নি। ওকে পুরো অন্য গ্রহের মানুষ বলে মনে হয়েছিল যার সাথে কোন ভাবেই আমার চলবেনা
এই গল্পটা শ্রাবন কে বলেছিলাম সে হেসেই খুন হয়েছিল। আজও সে হাসে কথা প্রসংগে গান গুলোর কথা যদি আসে
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


