somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছবি তুলে সংসার চালান রত্না

২৫ শে জুলাই, ২০১১ রাত ৩:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোকিলা ফটোগ্রার্ফাসে একদল তরুণী ছবি তুলছেন। তাদের ছবি ক্যামরা বন্দি করছেন একজন মহিলা। তিনি ক্যামরায় ছবি ধারণ করার আগে তরুণীদের পোষাক পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে মেকআপ সবকিছুই ঠিক করে দিয়েছেন। একেকজন তরুণী ক্যামেরার সামনে বসছেন, আর মহিলাটি ক্লিক ক্লিক করে ক্যামেরার সাটার ফেলছেন। না, অন্যান্য স্টুডিওর মতো সেই চিরায়ত নির্দেশনাগুলো নেই। মাথাটা একটু কাত করুন, মুখটা একটু উপরে তুলুন, একটা হাসি দিন। কোকিলা ফটোগ্রাফর্সের কর্ণধার রত্না দে কেবল নিজের অবস্থান একটু এদিক সেদিক করে ছবি তুলেন। আর সে ছবি অনন্য মহিমায় জীবন্ত হয়ে উঠে।

রত্না বলেন, ছবি উঠবে তার আপন ভঙ্গিতে। ছবির উপর নিজেদের ইচ্ছের জোর কাটাতে গেলে ছবির নিজস্বতা নষ্ট হয়ে যায়। এখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ। একটি সাটার ফেলেই ছবি তোলার কাজ শেষ করার কোন মানে নেই। বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে কয়েকটি ছবির পোজ নিয়ে সেখান থেকে সবচেয়ে ভালোটি তুলে আনা যায়। সব ছবি ভালো আসবে এমন কোন কথা নেই। ৩০টি ছবির মধ্যে যার কেবল একটি ভালো ছবি আসবে তিনি একজন ভালো ফটোগ্রাফার।

ছবির রাণী রত্না। অনেক কষ্টের নদী পেরিয়ে তিনি আজ রাঙ্গুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। এক সময় স্টুডিও মানেই ছিল বাজারের এককোণার একটি ছোট্ট দোকান। মাঝের কয়েক বছর স্কুল-কলেজকে ঘিরে স্টুডিও’র মর্যাদা যৎকিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু উঠতি বয়সী তরুণদের হাতে গড়া এসব স্টুডিওকে ঘিরে অনৈতিক ও ইভটিজিং-এর মতো অপরাধের কারণে নারীরা হয়ে উঠে অনিরাপদ। ঠিক এমন সময়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র লিচুবাগানে স্বামীর গড়ে তোলা কোকিলা স্টুডিওতে এসে বসেন রত্না। কাজ করার তুমুল আগ্রহ আর দক্ষতা তাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা দেয়। আর এমন একটি পেশায় নারীকে পেয়ে নারীরাও ছুটে আসে বানের জলের মতো।

এখন রাঙ্গুনিয়া ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উপজাতীয় তরুণীরা ছুটে আসে তাদের বিশ্বস্ত ফটোর দোকান রত্নার কোকিলা ফটোগ্রাফার্সে। পাহাড়ি ছাড়াও উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন বয়সের তরুণী আর গৃহিনীদের কাছে রত্না প্রিয় ও অতি আপনজন ফটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিদিনই রত্নার ফটোর দোকানে পাহাড়ি বাঙ্গালি মেয়েদের ছবি তোলার জন্য ভীড় লেগে থাকে। মহিলা দিয়ে মহিলার ছবি তোলা এলাকায় রত্নার বিকল্প রত্না নিজেই। রত্না সারাদিন সারারাত তার ফটোর দোকানে বিভিন্ন জনের ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তরুণী মহিলাদের ছবি আকর্ষণীয় করার ক্ষেত্রে মেকাপ ও ড্রেস সিলেকশনেও সক্রিয় সহযোগিতা করে থাকেন। ডিজিটাল যুগে ছবি তোলার সময়েও রত্নার ফটোর দোকানে তরুণীদের আগ্রহের কমতি নেই। রত্নাকে এতদূর আসতে করতে হয়েছে অনেক সংগ্রাম।

স্বামীর অসচ্ছল পরিবারে ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়েছিল রত্না রাণী। শেষ পর্যন্ত স্বামীর পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সন্ধান পেয়েছেন তিনি। সেই দুঃখের দিন রত্নার জন্য আজ অতীত। তিনি জীবন যুদ্ধে আজ সফল, আরো উপরে ওঠার স্বপ্নে এখন বিভোর। হরিপদ দে’র মেয়ে রত্না রাণী দে। চট্টগ্রামের রাউজান থানার গচ্ছি নোয়াহাট স্কুলের পাশে ছয় বোন, তিন ভাই ও পিতা-মাতা মিলে ১১ জনের সংসারে দুবেলা ঠিকভাবে খাবার জুটত না রত্নার।

পিতা বাম রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত ছিলেন। পরিবারের তেমন খোঁজখবর নিতেন না। অভাবের সংসারে অন্ধকার নেমে আসে যখন রত্নার তিন ভাই একে একে মারা পড়ে। পরিবারে রত্না সবার বড় হওয়ায় রত্নার মুখের দিকে সবাই চেয়ে থাকত। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সংসারের অন্ন-বস্ত্র জোগান দিতে তাকে স্কুল ছেড়ে গ্রামে গ্রামে টিউশনি করে সংসার চালানোর দায়িত্ব নিতে হয়। ক্লান্তিহীন সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে কখন যে নিজের বিয়ের বয়স অতিবাহিত হচ্ছে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময়ও হয় নি রত্নার। তার ওপর ছয়টি পিঠেপিঠি বোন।

অবশেষে ১৯৭৪ সালে বিয়ে হয় রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা হিন্দুপাড়ার অধিবাসী ফটোগ্রাফার তারাপদ দের সঙ্গে। স্বামীর সংসারেও রত্না সুখের ঠিকানা পেলেন না। একান্নবর্তী এই বড় সংসারে রত্না আবার মুখোমুখি হয় দরিদ্রের। অনেক প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাদের। শ্বশুর ননী গোপাল দের বিশাল সংসারের ভার সামলাতে স্বামীর ক্লান্তিহীন পরিশ্রম দেখে রত্না বেদিশা হয়ে পড়েন। রত্না ধরেই নিয়েছিল তার জন্ম হয়েছে দুঃখের সঙ্গে সন্ধি করতে।

সংসার জীবনে পর পর তিনটি মেয়ের মুখ দেখেন রত্না। বিশাল সংসারে অভাব-অনটন প্রতিদিন বাড়তে থাকে। স্বামীর একার আয়ে মেয়েদের কীভাবে গড়ে তুলবে এই ভেবে চিন্তায় আকুল হয় রত্না। রত্নার স্বামীর ‘কোকিলা স্টুডিও’ নামে নিজস্ব স্টুডিও রয়েছে চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র রাঙ্গুনিয়ার লিচুবাগানে। অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করতে এক সময় রত্না হাতে নেন ক্যামেরা। স্বামী তারাপদের সার্বিক সহযোগিতায় রত্না হয়ে ওঠেন পেশাদার দক্ষ নান্দনিক ফটোগ্রাফার। বর্তমানে একজন কমার্শিয়াল ফটোগ্রাফার হিসেবে এলাকায় প্রতিষ্ঠিত তিনি। স্বামী তারাপদ ও রত্না মিলে লিচুবাগানে কোকিলা ফটোগ্রাফার্সের সব কিছু সামলায়। কোন কর্মচারী ছাড়াই দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে পেশাদার ফটোগ্রাফির এই প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলছেন। ধীরে ধীরে রত্নাই হয়ে ওঠে এই দোকানের মূল চালিকাশক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে ফটোগ্রাফির পেশায় তারা অর্থনৈতিক সফলতা পেয়েছে। রত্নার অভাবের সংসারে দুঃখ অনেকটা মুছে গেছে। ৩ মেয়ের মধ্যে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্য ২ মেয়ে এখন লেখাপড়া করছে। রত্না এখন একজন সফল ও সুখী মানুষ।
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×