জরায়ুর বাইরে অস্বাভাবিক গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে। চিকিত্সা বিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনা বিরল হলেও ঢাকার হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ সপ্তাহের এই ভ্রূণশিশুকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন চিকিত্সকরা। শনিবার বেলা ১১টার দিকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন এবং অ্যানেস্থেশিওলজিস্টদের একটি দল মিলিতভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা মিথিলার (২১) দেহগহ্বর থেকে এই ভ্রূণশিশুকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন। অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ পর ভ্রূণশিশুটি মারা যায়। এদিকে অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন জটিলতা কাটিয়ে ভ্রূণশিশুর মা এখন ভালো আছেন বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটিই দেশে দেহগহ্বরে গর্ভধারণ এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জীবিত ভ্রূণ বের করে আনার প্রথম ঘটনা।
ঘটনা বিরল : হলিফ্যামিলি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কিশোয়ার সুলতানা বলেন, চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় ‘ইন্ট্রাঅ্যাবডোমিনাল প্রেগন্যান্সি’। টিউবাল অ্যাবরশনের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তিনি জানান, এ ধরনের রোগী সচরাচর দেখা যায় না; প্রতি এক লাখ গর্ভধারণের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জরায়ুর বাইরে সাধারণত যেসব গর্ভধারণ হয় সেগুলোকে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘একটোপিক প্রেগন্যান্সি’ বলা হয়। একটোপিক প্রেগন্যান্সি বা গর্ভধারণের স্থান হচ্ছে ডিম্বনালী বা ফেলোপিয়ান টিউব। টিউবের মধ্যে গর্ভধারণ হয় বলে একে টিউবাল প্রেগন্যান্সিও বলা হয়। ডিম্বনালীর মধ্যে গর্ভধারণ হলে গর্ভকালীন কোনো এক অবস্থায় টিউব ফেটে গিয়ে জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত অপারেশন করার দরকার পড়ে। কিন্তু দেহগহ্বরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে হঠাত্ সেরকম কোনো জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হয় না, এমনকি প্রথম দিকে রোগী নিজেই জানে না সে গর্ভবতী কিনা।
যেভাবে নির্ণয় করা হয় এই গর্ভধারণ
ঢাকার উত্তর শাহজাহানপুরের বাসিন্দা মিথিলা (২১) গাড়িচালক স্বামী হাসানুজ্জামানকে নিয়ে ঢাকার মালীবাগে মেডিনোভার চেম্বারে ডা. কিশোয়ার সুলতানার সঙ্গে দেখা করতে যান গত ১১ জানুয়ারি। তার সমস্যা ছিল ওপরের পেটে ডান দিকে ব্যথা। চিকিত্সক তার মাসিক বা পিরিয়ডের ইতিহাস জানতে চাইলে মিথিলা গত দু’মাস ধরে ‘স্পটিং’ বা সামান্য রক্তক্ষরণের কথা বলেন। এ অবস্থায় তার পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাম করার পর মিথিলার জরায়ুর বাইরে দেহগহ্বরে লিভার বা যকৃতের নিচে ১২ সপ্তাহ বয়সী ভ্রূণশিশুর উপস্থিতি ধরা পড়ে। টিউবাল অ্যাবরশনের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাত্ নিষিক্ত ভ্রূণ ডিম্বনালী বেয়ে জরায়ুতে না গিয়ে উল্টো দিকে দেহগহ্বরে চলে আসে। এরপর গত ১৪ জানুয়ারি মিথিলাকে শিক্ষার্থীদের জন্য একজন নমুনা রোগী হিসেবে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে নিজের অধীনে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন ডা. কিশোয়ার সুলতানা।
রাখে আল্লাহ মারে কে?
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভ্রূণশিশু পূর্ণতা লাভ করে স্বাভাবিক শিশু হিসেবে জন্ম নেবে, তা কোনোভাবেই আশা করা যায় না বলে আমার দেশকে জানালেন ডা. কিশোয়ার সুলতানা। কারণ এই ভ্রূণ বড় হয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং যত সময় যাবে তা মায়ের জীবনকে আশঙ্কাপূর্ণ করে তুলবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি মিথিলাকে ‘মেথোট্রেক্সেট’ উপাদানের ওষুধের ৪টি ডোজ প্রয়োগ করেন; উদ্দেশ্য ভ্রূণশিশুটির মৃত্যু। কারণ ভ্রূণশিশুটিকে জীবিত রেখে অস্ত্রোপচার করলে প্রচুর রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু মেথোট্রেক্সেট প্রয়োগের পরও ভ্রূণশিশুটির মৃত্যু হয়নি বরং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু প্রয়োজনীয় উপাদানের মাত্রা কমে যায়। এ অবস্থায় মিথিলাকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে গত শনিবার ১১টার দিকে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারে অংশ নেন হলিফ্যামিলি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম, সহযোগী অধ্যাপক ডা. কিশোয়ার সুলতানা, সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আহমেদ সাঈদ, অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট ডা. শামসুল আলম ও ডা. সিরাজীসহ অন্য চিকিত্সকরা। অস্ত্রোপচার সম্পর্কে অধ্যাপক রওশন আরা বেগম বলেন, ভ্রূণশিশুটি জীবিত থাকার জন্যই অস্ত্রোপচারে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। অপারেশনের সময় ৪ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে, পরে আরও ২ ব্যাগ রক্ত দেয়ার প্রস্তুতি ছিল। অস্ত্রোপচারের পর দেখা যায়, ভ্রূণশিশুটি তখনও জীবিত এবং নড়াচড়া করছে। গর্ভফুলটি লাগানো ছিল মায়ের পাকস্থলীর নিচের দিকে ডিওডেনামের ওপরের অংশে। ভ্রূণের গর্ভরজ্জু নাভি থেকে বের হয়ে এই গর্ভফুলের সঙ্গেই যুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে ভ্রূণশিশুটি গত ১৪ সপ্তাহ ধরে মায়ের শরীর থেকে পুষ্টিসহ অন্যান্য উপাদানের জোগান পাচ্ছিল। ভ্রূণশিশুটিকে মায়ের শরীর থেকে আলাদা করার পরই মৃত্যুবরণ করে। অস্ত্রোপচারের পর সার্জারির অধ্যাপক আহমেদ সাঈদ অস্ত্রোপচার সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রোগীর লিভারসহ দেহগহ্বরের অন্যান্য অঙ্গের কোনো ক্ষতি হয়নি। রক্তক্ষরণও নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আশা করা যায় রোগী দ্রুত সেরে উঠবে। এ ধরনের অপারেশন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানালেন ডা. শামসুল আলম। তিনি বলেন, অপারেশনের রক্তক্ষরণজনিত ধকল কাটিয়ে সবার চেষ্টা ও আল্লার ইচ্ছায় রোগী (মা) বেঁচে আছে, এটাই বড় ব্যাপার।
তারপরও পরিবারে স্বস্তি...
মিথিলা ও হাসানের প্রথম সন্তানের বয়স ২ বছর। এই ভ্রূণসন্তান সম্পর্কে প্রথম দিকে তারা জানতেন না। যখন জানলেন তখন তাদের ও পরিবারের সবার মধ্যে এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করছিল। দ্বিতীয় সন্তানকে কোনোভাবে বাঁচানো যাবে না, সেটা তারাও জানতেন; কিন্তু চিন্তা ছিল মাকে নিয়ে। অস্ত্রোপচারের পর মিথিলা যখন প্রথম চোখ মেলে তাকায় তখন শাশুড়ি ফরিদার চোখেমুখে এক ধরনের স্বস্তি মেলে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। কিন্তু প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরা ফরমালিনে ভেজানো ভ্রূণ বয়সের নাতিটিকে গভীর সোহাগে কোলে নিতেও ভোলেননি তিনি। আশা ছিল প্রথমটি নাতনী হওয়ায় এবার নাতির মুখ দেখবেন। তবে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে মিথিলার কোনো বাধা নেই, এমনটিই জানিয়েছেন চিকিত্সকরা।
গতকাল এই ভ্রূণশিশুটিকে শাহজাহানপুর গোরস্তানে দাফন করা হয় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


