দেশে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা বাড়ছেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবাসিক শিক্ষকের (হাউস টিউটর) পদ ছাড়ার হুমকি দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ছাত্রলীগের দু’ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিন্দুরা গ্রামে একদল সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুট, গৌরনদীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭ জন। সিলেটে নির্বাচনের সহিংসতায় আহত হয়েছেন একজন। পিরোজপুরে জিয়ানগরে চারদলীয় জোট কর্মীকে পিটিয়েছে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। সিরাজগঞ্জ পশ্চিম গাড়দহে বিএনপির কর্মীদের হামলা, অগ্নিসংযোগে আহত হয়েছে কমপক্ষে ৭ জন। কলারোয়ায় যুবদলের ওপর হামলা চালিয়েছে মহাজোটের নেতাকর্মীরা। এতে আহত হয়েছে ৫ জন। মুক্তাগাছায় নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে ৭ জন আহত হয়েছে। ধামরাইয়ে বংশী নদীর বালুমহল দখলের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। এ সময় তারা বালু মহালের অফিসে তালা দিয়ে বালু ভর্তি একটি ট্রাক লুট করে পালিয়ে যায়। কুমিল্লার বরুড়ার হরিপুর গ্রামে হামলায় আহত হয়েছে কমপক্ষে ৭ জন। অন্যদিকে পটুয়াখালীতে ছাত্রলীগের ছুরিকাঘাতে ছাত্রদল কর্মী আহত হয়েছে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সারা দেশে ১৩টি স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ। এতে আহত হয়েছেন অর্ধশত। সহিংসতায় জড়িত থাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৮ জন। সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের ওপর হামলা চলাকালে কর্তব্য অবহেলার দায়ে সাসপেন্ড হয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ার চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। গতকাল বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত দু’দিনে সারা দেশে ছোট-বড় ১৩টি স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সকল সংঘর্ষে অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সকলেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য। তিনি বলেন, নির্বাচনের পরের দিন ঝিনাইদহ জেলায় নিজ দায়িত্ব পালনকালে প্রতিপক্ষের হামলায় পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টর আহত হন। ওই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি পুলিশ সদস্যদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার সঙ্গে কোন পুলিশ সদস্য জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা গত দু’বছরের অভিজ্ঞতায় প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাবো। তিনি সব ধরনের আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, নির্বাচন পরবর্তী ছোটখাট সহিংসতা হয়েছে। তবে ভয়ের কিছু দেখি না। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ার চর থানার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে নির্বাচনের পরের দিন সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সময় মতো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে তাকে বুধবার রাতে সাসপেন্ড করা হয়। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আগের চেয়েও কর্তব্য কাজে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অন্যায় করলে, রাজনৈতিক বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী হিসেবে গণ্য করবো। আমাদের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ফায়দা লুটতে পারবে না। অপরাধী যে রাজনৈতিক দলের হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আমাদের কোন দল নেই। আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যাবো। নির্বাচনের পর সারা দেশের কয়েকটি এলাকাকে স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বাড়তি পুলিশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এতদিন নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গোলমাল হয়েছে। সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এ বছর সে তুলনায় অনেক কম হয়েছে। এর প্রধান কারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কারণে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাউজ টিউটরকে পদ ছাড়ার হুমকি
মঙ্গলবার গভীর রাত ও বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের ২০-২৫ জন নেতাকর্মী হলের আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের বাসায় গিয়ে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে বলে। তারা তার কাছে ব্যাডমিন্টন খেলার প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের অর্থ ও দাবি করে। জবাবে অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম তাদের বলেন, এসব কিনতে প্রভোস্টের অনুমতি লাগবে। প্রভোস্ট আদেশ দিলেই আমি তা কিনে দিতে পারব। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে বলেন, ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশা আমাদের পাঠিয়েছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলার সরঞ্জাম কিনে না দিলে আপনাকে পদত্যাগ করতে হবে। এ বিষয়ে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমি বিষয়টি হল প্রভোস্টকে জানিয়েছি। শিক্ষক সমিতিকেও লিখিতভাবে জানাবো। হুমকিদাতাদের মধ্যে একজন বহিষ্কৃত ছাত্রও রয়েছে। বিষয়টিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি আশঙ্কা করছি অন্য শিক্ষকদেরও এ ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এদিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ছাত্রলীগের দু’ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দু’ গ্রুপের কমপক্ষে পাঁচজন গুরুতর আহত হয়। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হল শাখার নেতা ইউসুফ গ্রুপের কর্মী ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সালমান হলে ঢোকার সময় জিকু গ্রুপের নেতাকর্মীরা তাকে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। এ সময় সালমানের আর্তচিৎকারে অপর গ্রুপের নেতাকর্মীরা জিকু গ্রুপকে ধাওয়া করে। দু’গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে জসীম, তৌহিদসহ চারজন আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে দুপুরে হলের ছাদের ওপর থেকে ১০টি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। শাহবাগ থানা সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জানানোর পর তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ১০টি ককটেল ও বোমা বানানোর সরঞ্জামও উদ্ধার করে। পরে পুলিশের একটি বোমা বিশেষজ্ঞ দল ককটেলগুলো নিষ্ক্রিয় করে। এদিকে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনেই এ ধরনের ঘটনার আতঙ্কে গতকালই জিয়াউর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, কবি জসীমউদ্দীন হল ও সূর্যসেন হলের বেশির ভাগ সাধারণ ছাত্র হল ছেড়ে চলে গেছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আকা ফিরোজ আহমেদ বলেন, বিষয়টি উদ্বেগের। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে অনুরোধ করা হয়েছে। ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকদের আবাসিক কক্ষে ভাংচুর, লুটপাট, তালা ঝুলানো এবং ফোনে হুমকি দেয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সমিতির নেতারা এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একইসঙ্গে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ২৯শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মুহসীন হলে দৈনিক সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার আশরাফুল ইসলাম কচির কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এরপর জসীমউদ্দীন হলে দৈনিক জনকণ্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার রিয়াদুল করিম, বিডিনিউজের রিপোর্টার গোলাম মর্তুজা অন্তু, দৈনিক ডেসটিনির রিপোর্টার কামরুল হাসানের রুমে ভাঙচুর করে। দৈনিক যায়যায়দিনের রিপোর্টার জাহিদুল ইসলাম শামীমকে হল ছাড়তে হুমকি দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এছাড়া এসএম হলের ছাত্র দৈনিক নয়াদিগন্তের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার দিদারুল ইসলাম মানিক এবং আমাদের সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার মহিউদ্দিন মাহির কক্ষ ভাঙচুর এবং মূল্যবান কাগজপত্র লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একই হলের দৈনিক সংগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার আরিফ হোসাইনের কক্ষ থেকে কম্পিউটারসহ মূল্যবান মালামাল লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান শুভ গতকাল এক বিবৃতিতে এসব কথা জানান। বিবৃতিতে তারা গণতান্ত্রিক সরকারের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে অধিকতর সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ বিরাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নানা স্থানে দখল, মারপিট, লুট, অগ্নিসংযোগ
সিলেট অফিস জানান, সিলেটে নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় আরও এক যুবক আহত হয়েছে। আহত যুবকের নাম স্বপন বর্মণ। সে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চান্দপুরের সুভাষ বর্মণের পুত্র। বর্তমান সিলেট নগরীর আখালিয়ার বাসিন্দা। অভিযোগে জানা যায়, স্বপন বর্মণের পরিবার সুনামগঞ্জ-২ আসনে মহাজোট মনোনীত আওয়ামী লীগ প্রার্থী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পক্ষে কাজ না করায় মহাজোট সমর্থক সিলেট জেলা যুবলীগের কয়েকজন ক্যাডার তাদেরকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। এরই জের ধরে গত বুধবার রাতে স্বপন বর্মণের মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে দু’দফায় তার ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে টাকা ও স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৯নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় স্বপন বর্মণের ভাই সুরঞ্জিত বর্মণ বৃহস্পতিবার সিলেট কোতোয়ালি থানায় ৬ জনকে আসামি করে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। থানার এসআই বাদল অভিযোগের তদন্ত করছেন। এর আগে গত সোমবার রাতে সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের সতেরগ্রামে চারদলীয় জোট সমর্থকদের হামলায় রাশিদ আলীর পরিবারের মহিলা শিশুসহ ৬ জন আহত হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ পশ্চিম গাড়দহ গ্রামে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, গত বুধবার নির্বাচন পরবর্তী জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে পশ্চিম গাড়দহ গ্রামে স্থানীয় বিএনপি ক্যাডার গোলাম মণ্ডলের নেতৃত্বে ১০-১৫ জন জেলে পল্লীতে হামলা করে ৫-৭ জনকে আহত করে। ঘটনাটি জেলেরা স্থানীয় চেয়ারম্যান ও বিজয়ী সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়কে জানায়। এরই জের ধরে বুধবার রাতে তারা হামলা চালায়। তারা প্রতিমায় অগ্নিসংযোগ করে। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবীর, পুলিশ সুপার আলমগীর রহমান সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসক জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ এ ঘটনার তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
গৌরনদী প্রতিনিধি জানান, গৌরনদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীরা হামলা চালিয়ে ৭ জনকে আহত করেছে। গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের ২ কর্মীকে গৌরনদী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী হামলা চালিয়ে বুধবার রাতে বিএনপির কর্মী গৌরনদী নাহার সিনেমা হলের কর্মচারী রেজাউল (৩০), মাগুরামাদারীপুর গ্রামের মুরাদ মিয়া (২৫) ও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কমলাপুর গ্রামের দোকানদার সুমন মিয়া (২৯), বিএনপি সমর্থক নয়ন মিয়া (২৫), মজিবর রহমান (৪৫)-কে মারধর করেছে। অপরদিকে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের কাছের জমিতে ভোটার স্লিপ প্রদানের জন্য বিএনপির কর্মীদের ক্যাম্প বসতে না দেয়ায় ওইদিন রাতে সরিফাবাদ গ্রামের বিএনপির রিপন হাওলাদার (৩০)সহ ৩-৪ জন কর্মী হামলা চালিয়ে একই গ্রামের হরিদাশ (৪২) ও তার সহোদর নারায়ণ দাশ (৪০)-কে পিটিয়ে আহত করে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। থানার ওসি আমিরুজ্জামান আমির জানান, আহতরা মামলা দিলে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জিয়ানগর (পিরোজপুর) থেকে সংবাদদাতা জানান, জিয়ানগরের পত্তাশী গ্রামে চার দলের সমর্থক আফজাল কাজীকে পিটিয়ে আহত করেছে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। গতকাল দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া, উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের ফলকে সাবেক এমপি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামফলক বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভেঙে ফেলেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জানান, মঙ্গলবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সিন্দুরা গ্রামে বেশ কয়েকটি বাড়িতে সন্ত্রাসীরা হানা দেয়। এ সময় তারা প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তখন ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানায়, সিন্দুরা গ্রামের আবদুল আহাদ-এর বাড়িতে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ৩০-৩৫ জনের একটি সশস্ত্র দুর্বৃত্ত দল মুখোশ পরে হানা দেয়। তারা বাড়ির বারান্দার গ্রিলের গেইট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নগদ প্রায় ৫০ হাজার টাকা, ৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ৩টি খাট, একটি আলনা, বেকারির ৮টি মোটরসহ মেশিনের বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তারা বিভিন্ন ঘরের আসবাবপত্র, কাঁচের জিনিসপত্রসহ দরজা ভাঙচুর ও তছনছ করে। রাতে আবদুল আহাদের বাড়ির পুকুরে জাল ফেলে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মাছ ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগকারীরা দাবি করেছে, নৌকা সমর্থন করায় তাদের বাড়িতে এ হামলা চালানো হয়, কয়েক জনকে তারা চিনে ফেলে। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, কলারোয়ায় মহাজোটের নেতাকর্মীরা চারদলীয় জোট নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। হামলায় কলারোয়া উপজেলা যুবদলের সেক্রেটারিসহ ৫ জন আহত হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় এসব ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কলারোয়া সদরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে কলারোয়া উপজেলার বাটরা গ্রামে বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলার ভয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনেকে এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, বুধবার রাতে কলারোয়ার গরুহাটের মোড়ে যুবলীগ কর্মী সাহাজাদা ও কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে যুবদলের সেক্রেটারি কাদের বাচ্চু ও কাজী সিরাজের ওপর হামলা চালায়। একইভাবে মহাজোট সমর্থকরা যুবদল নেতা চেড়াঘাট গ্রামের আনোয়ার হোসেন, পাটুলিয়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম ও বাটরা গ্রামের মুনছুর আলীর ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে। আহতদের মধ্যে ৩ জনকে কলারোয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অপরদিকে কলারোয়া সদর দমদম, বাউরাসহ কয়েকটি এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। হামলার ভয়ে অনেকে এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।
মুক্তাগাছা প্রতিনিধি জানান, মুক্তাগাছায় নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে ৭ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জনকে মুক্তাগাছা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় ১ জনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, উপজেলার পোড়াবাড়ী গ্রামে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থকদের বুধবার বিকালে কথা কাটাকাটি হয়। এ ঘটনাটি পরে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে মীমাংসা হয়ে যায়। কিন্তু পরদিন আওয়ামী লীগ সমর্থক আজগর আলী (৫০) ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় বিএনপি সমর্থিত রমজান আলী ও তার ভাই শরিফ আলীসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালায়। আজগর আলীর চিৎকারে লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে। ওই সময় উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে আজগর আলী (৫০), শরিফুল ইসলাম (২৬), আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং বিএনপি সমর্থিত রমজান আলী (৫০), আশরাফ আলী (৪০), মমতাজ বেগম (৪৫), আফছর আলী (৭৫) আহত হয়। এদেরকে মুক্তাগাছা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপরদিকে মিলনগঞ্জ বাজারে নির্বাচনের দিন রাতে আবদুল আজিজ (৫৫) নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে বিএনপি সমর্থকরা কুপিয়ে জখম করেছে। তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে।
ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, আশুলিয়ার বংশী নদীর বালু মহাল গত দু’দিনে দু’ দফায় দখলের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। এক পর্যায়ে তারা বালু মহালের একটি অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে এক ট্রাক বালু লুট করে পালিয়ে যায়। এলাকাবাসী জানায়, ধামরাই আশুলিয়ার ইসলামপুর-নয়ারহাট বংশী নদীর পারে বিএনপি নেতা দেওয়ান হানিফ ও ফারুক হোসেনের বালু মহাল দখল করতে যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী হাত কাটা মালেকের নেতৃত্বে ১০-১২ জন। এ সময় তারা দেওয়ান হানিফের একটি অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে এক ট্রাক বালু লুট করে এবং খুঁটি গেড়ে দখল করার চেষ্টা করে। দেওয়ান হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ কর্মী হাতকাটা মালেকের নেতৃত্বে ১০-১২ জন নেতা আমাদের বালু মহালে এসে হুমকি দিয়ে বলে, এখন আমরা ক্ষমতায় এসেছি, বালুর ব্যবসা করবো আমরা। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে ধামরাইয়ের ইসলামপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতা জব্বারের বালু মহাল দখল করতে যায়। এ সময় পাশের সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা বাধা দিলে তারা পালিয়ে যায়। বর্তমানে বালু মহাল দখল নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বরুড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, বরুড়ার হরিপুর গ্রামে বুধবার রাত সাড়ে বারোটায় আওয়ামী লীগ কর্মী ফরহাদ, রিয়াদ কাউছারের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী আবুল হাসেমের বাড়িতে হামলা চালায়। পিটিয়ে আহত করে তানিয়া (৩০), ফাহমিদা (২৫), ফাইমা (২৩), ফারহানা (২০), কনা (১৮), রিফাতজাহান (২৮) ও মাহবুবা আক্তার (৪৫) কে। এরপর আলমারি ভেঙে সন্ত্রাসীরা ওই বাড়ি থেকে নগদ ৪৫ হাজার টাকা এবং ২০ ভরি ¯¦র্ণালঙ্কার ও ২টি মোবাইল সেট নিয়ে যায়। বাড়িতে থাকা দারুস সালাম একাডেমীর একটি টেম্পো ভাঙচুর করে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে জেলা বিএনপি কার্যালয় থেকে যাওয়ার পথে ছাত্রলীগ কর্মীদের অস্ত্রের আঘাতে ৩ ছাত্রদল কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হচ্ছেন আল-আমিন (১৮), শামীম (২০) ও মনোয়ার হোসেন (২৩)। আহতদের পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদল সভাপতি তৌফিক আলী খান কবির জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় জেলা বিএনপি কার্যালয়ে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন শেষে যাওয়ার পথে শহরের জুবিলী স্কুল সড়কে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হামলা চালায়। এ সময় কুপিয়ে তিন ছাত্রদল কর্মীকে গুরুতর জখম করে। ঘটনার পর পরই পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শহরে টহল জোরদার করে। এদিকে নির্বাচনের পরদিন মঙ্গলবার সদর থানার বদরপুর এলাকায় শিবির কর্মী সোহেল (২২)-কে আওয়ামী লীগ কর্মীরা বেদম প্রহার করে পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে ফেলে রাখে। পরে স্থানীয় লোকজন সোহেলকে অচেতন অবস্থায় পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসে। এলাকাবাসী জানান, নির্বাচনের জের ধরেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, খুলনায় অব্যাহতভাবে চলছে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা। হল দখল, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, কুপিয়ে ও বেদম মারধর করে আহত করা, গরু ও ধান লুট, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আর এ হামলায় শিকার হচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নগরীতে একজন মসজিদের ইমামকে বেদম মারধর করে আহত করে সন্ত্রাসীরা। চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এসব ঘটনায় পুলিশ এক যুবলীগ ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল নতুন বছরের প্রথম প্রহরে সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের কবি নজরুল ইসলাম হল দখল করে নিয়েছে ছাত্রলীগ। হলের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রুমগুলো তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। ছাত্রদলের বার্ষিকীর কর্মসূচিতে যোগ দিতে আযম খান কমার্স কলেজ শাখার সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও কর্মী পান্থ কলেজের সামনে পৌঁছলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে।
সকাল ১১টার দিকে নগরীর রূপসা শ্মশানঘাট এলাকার হাসিনা বেগমের রুটির দোকান দখল করে নেয় আওয়ামী লীগের ৩০নং ওয়ার্ড নেতা হাসান এবং পিন্টু।
তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা নীতিশ ও তার পুত্র অলোক গতকাল সকালে চারদলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বাড়িতে যায় এবং আগামীকালের মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘের ও গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ফেলে রেখে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে। বর্তমানে এলাকার লোকজন চরম আতঙ্কে রয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যশোরে দলীয় কর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। গতকাল স্থানীয় প্রেস ক্লাব যশোরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এ দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অত্যাচার-নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, শার্শার ডিহি ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুল আজিজের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। উপজেলার পাকশিয়া, সাড়াতলা, গোগা ও জামতলা বাজারে জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ আশ্রিত সন্ত্রাসীরা। বাগআঁচড়ার এক নম্বর কলোনিতে তারা ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। লক্ষ্মণপুর ও ডিহিতে জামায়াত সমর্থকদের ধানক্ষেতে পানি সেচ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শার্শার গোগায় বিডিআর ভারতীয় পণ্য আটক করেছিল মাস চারেক আগে। এখন সেই মালের ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে এক জামায়াত কর্মীকে।
http://www.manabzamin.net/page1.htm
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


