বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা শেষ পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণ করেছে। বিদ্রোহের অবসান হয়েছে। রক্তক্ষয়ী এ বিদ্রোহের অবসানে জাতি স্বস্তিবোধ করছে। রক্তাক্ত এ বিদ্রোহ দমনে সরকারের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। সঙ্কট উত্তরণে মন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্খিতি নিয়ন্ত্রণের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল। বিরোধী দলগুলোর অবস্খান ছিল স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক। অনৈতিক এ বিদ্রোহ সহমর্মিতা পেলেও সমর্থন পায়নি। সেনাবাহিনী ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সংঘর্ষ এড়িয়ে প্রশংসনীয় কাজ করেছে। তবে বিপুলসংখ্যক সেনাকর্মকর্তার মৃত্যুতে জাতি মর্মাহত, শোকাহত। এ ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। আশা করছি, এ রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ আমাদের সামনে অনেক শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।
এত কিছুর পর অপ্রত্যাশিত হলেও জাতি একটি অনাকাáিক্ষত বিব্রতকর পরিস্খিতি প্রত্যক্ষ করল। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক, নেতৃত্বহীন বিডিআর’র একাংশের এ বিদ্রোহ যে বঞ্চনা এবং বিদ্রোহী মনের অস্বাভাবিক প্রকাশ, তাতে সমূহ সন্দেহ না থাকলেও শুধু দাবি পূরণের জন্য এত বড় হত্যাকাণ্ড সংযোগহীন ঘটনা নয়। নেতৃত্বহীন এ বিদ্রোহ একটি আলাদা শ্রেণী-চরিত্র স্পষ্ট করেছে। বিডিআর আধাসামরিক বাহিনী। আমাদের সেনাবাহিনীর পরিপূরক। এই দুই বাহিনীর মাঝে সাধারণ চোখে স্বার্থের সঙ্ঘাত নেই। থাকার কথা নয়। কর্তৃত্ব নিয়েও কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকার কথা ছিল না। কারণ, বিডিআর জওয়ানরা প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি। বিদ্রোহ করেছে তাদের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর সদস্য। সেই বিবেচনায় তাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্রোহ ভাবটার দায় সেনাবাহিনীর ওপর বর্তিয়েছে। তবে ঠাণ্ডা মাথায় যেভাবে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হলো, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। এর নেপথ্য কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।
বিডিআর সদস্যরা তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেছে। তারা বলছে, সেনা সদস্য কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তারা উপরি কাঠামোয় বসে নেতৃত্ব দেয়। তাই কর্তৃত্ব করে। কিন্তু সুখ-দু:খের অংশীদার হয় না। বিডিআর সদস্যদের বেতনভাতা, ছুটিছাটা, সুযোগ-সুবিধা উপেক্ষিত থাকে। তা ছাড়া সেনাবাহিনী থেকে যারা প্রেষণে বিডিআর-এ যায় তারা সব সময় একাত্ম হতে পারে না। একধরনের কৌলীন্য লালন করে। এক দিকে আলাদা বাহিনীর লোক আবার কর্তৃত্বপরায়ণ। অধিকন্তু সহমর্মী নয়। এ ধরনের অবস্খায় একধরনের শ্রেণী সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিডিআর সদস্যদের ভেতর সেই ধরনের শ্রেণীস্বার্থের একটি মনোভাব সক্রিয় হতে কিছু ইস্যু কাজ করেছে বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। তবে বিএসএফ সদস্যদের অতি উৎসাহ, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বেশি ‘ঔদার্য’ প্রদর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনী সদস্যদের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত প্রচারণা সহজে নেয়া যাচ্ছে না। তাই বিদ্রোহের কারণের ভেতরের কারণ খুঁজে পেতে হবে।
দু’বছর আধাসামরিক সরকার দেশ পরিচালনায় প্রচুর বাড়াবাড়ি করেছে। সংবিধান উপেক্ষিত হয়েছে। জনমত পদদলিত হয়েছে। রাজনীতিবিদদের ওপর জুলুম-অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্য ছিল অস্বাভাবিক। জনমনে কষ্ট ছিল, প্রকাশের ভাষা ছিল না। রাজনীতিবিদরা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, প্রকাশ করতে পারেননি। সে সময়টিতে বিডিআর সেনাবাহিনীর নির্দেশিত কর্মসূচি পালন করেছে। মাঠপর্যায়ে সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমতাচর্চার ধরনও বিডিআর সদস্যরা প্রত্যক্ষ করেছে। ক্ষমতাচর্চায় সংশ্লিষ্ট হয়ে সেনা কর্মকর্তারা হয়তো অনেক মূল্যবোধকেও জলাঞ্জলি দিয়েছে। এর একটি নেতিবাচক ফল বিডিআর সদস্যদের মনের ওপর রেখাপাত করে থাকতে পারে। তা ছাড়া ডাল-ভাত কর্মসূচিসহ সিভিল প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা কোনো দিন ভালো হয় না। এর ফলাফল শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। নেতৃত্বহীন বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে হয়তো সেটিই প্রকাশ পেয়েছে। বিডিআর সদস্যদের বাড়াবাড়িতে সেটি সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং একধরনের হঠকারিতা সীমা অতিক্রম করেছে। এ ধরনের একটি বিশ্লেষণও অমূলক নয়। বিডিআর সদস্যরা সীমান্ত পাহারা দেয়। সীমানা রক্ষার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করে। বলা চলে একটি অঘোষিত যুদ্ধাবস্খা সব সময় বিএসএফ সদস্যরা জিইয়ে রাখে। সেই যুদ্ধাবস্খার ধকল সামাল দেয়ার মতো পরিস্খিতি বিডিআর সদস্যরা সব সময় মোকাবেলা করে। কিন্তু তারা তাদের মতো করে স্বীকৃতি পায় না। এ যুক্তিটি মানা যায়, কিন্তু ঐতিহ্য ও সেনাবাহিনীকে অস্বীকার করার বিষয়টি মানা যায় না। বিডিআর রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার মতো উচ্চাভিলাষ অতীতে লালন করেনি। এবার বিদ্রোহের সময় সেই ধরনের কোনো আভাস মেলেনি। কিন্তু তারা নিজেদের যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে সেটিকে উদ্দেশ্য ও ইìধনহীন ভাবা যাচ্ছে না। এ মুহূর্তে আমরা কার কত দোষ, গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা, কোনো মহলের বাড়াবাড়িকে আমলে নিয়ে সময় ক্ষেপণ করার পক্ষপাতী নই। আগুন লেগেছে, দেশের গর্বিত সন্তানরা পরম্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, আগে চাই সমস্যার পূর্বাপর সমাধান ও সঙ্কটের সফল উত্তরণ। তারপর ঘটনার খতিয়ান নিয়ে বসার কথা ভাবতে হবে।
এ কথা ঠিক যে, বিডিআর সদস্যদের সব ক্ষোভ-বিক্ষোভ কর্তৃত্বপরায়ণদের ওপর গিয়ে পড়ার কারণে সঙ্কট গভীর হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি মর্মান্তিকভাবে বেশি হয়েছে। কর্তৃত্বপরায়ণ কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের দাবিদাওয়া বিবেচনায় নেয়নি এটি খুবই সাদামাটা অভিযোগ। সাধারণ বিডিআর সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো কোনো মানসিকতা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ছিল না এটা মেনে নেয়া যায় না। তবে তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়া সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যন্ত পৌঁছেনি এ কথাটা মিথ্যা নয়। একে তো তাদের কর্মকর্তারা সেনা সদস্য আবার কর্তত্বপরায়ণ, একই সাথে সাধারণ বিডিআর সদস্যদের ভাবনা এই সেনা সদস্যরা তাদের স্বার্থের প্রতিপক্ষ। এ অভিযোগও মানা যায়, কিন্তু ধনুক ভাঙা পণ নিয়ে বিদ্রোহ অব্যাহত
রাখার মানসিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাদের আত্মঘাতী ও হঠকারিতা ছিল অনৈতিক ও অযৌক্তিক।
ঘটনা গৃহযুদ্ধ পর্যায় পৌঁছতে পারেনি, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অস্বাভাবিক ও হৃদয়বিদারক। এর ভবিষ্যৎ পরিণতি যেন আরো বেশি সুদূরপ্রসারী না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ কোনো পক্ষের মৌন সমর্থন নিয়েও সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ করুক তা যেমন চায়নি, তেমনি চায়নি হত্যা উৎসবের মতো অবস্খাও। কেউ আশা করেনি বিডিআর আরো বাড়াবাড়ি করে দেশের সীমান্ত অরক্ষিত রেখে দেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জের দিকে ঠেলে দিক। জনমনের কিছু ধূমায়িত ক্ষোভ, রাজনৈতিক কর্মীদের জমাট বাঁধা দু:খবোধের ফসলটা বিডিআর সদস্যরা তাৎক্ষণিক পেয়েছিল। সমপরিমাণ নৈতিক সমর্থন হারিয়েছিল বিডিআর’র কর্মরত সেনা সদস্যরা। কিন্তু বিডিআর বাড়াবাড়ির সীমা অতিক্রম করার পর জনগণ সংক্ষুব্ধ হয়েছে। বাড়াবাড়ির নিন্দা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হওয়ার ধমক যথার্থ ভেবেছে। ফলে জনগণ কোনো দিকে ঝুঁকে না পড়ে এ অসহনীয় পরিস্খিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করেছে।
দিনভর গোলাগুলি, রাতভর উদ্বিগ্ন প্রহর গোনা, ভয়াবহ পরিণতি ও গৃহযুদ্ধের শঙ্কা নিয়ে সাধারণ মানুষ চরম উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করেছে। আশা করেছে সর্বদলীয় বৈঠক করে সরকার স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত নেবে। আর কোনো রক্তক্ষরণ ও বিভীষিকাময় পরিস্খিতি যেন জাতির জন্য অনিশ্চয়তা ডেকে না আনে সেটাই তারা কামনা করছেন। জনগণের সমর্থন পরিস্খিতি উত্তরণে সহায়ক হয়েছে এ বিষয়টি সবার দৃষ্টিতে থাকতে হবে। জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো সবার কর্তব্য।
দেশের এমন পরিস্খিতিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখা খুবই জরুরি ছিল। বিরোধী দলগুলো দ্রুত সরকারকে সমর্থন দিয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। এ ধরনের বিব্রতকর সময় ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সরকার পরিস্খিতি উত্তরণে আন্তরিক থাকুক এটা সবার কামনা ছিল। সমস্যাটি কোনো দলের নয়। এ সঙ্কট জনগণসৃষ্ট নয়। এটি জাতীয় সমস্যা। জাতীয়ভাবে মোকাবেলা করার সদিচ্ছারই বেশি প্রয়োজন ছিল। এখনো সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি।
একটিমাত্র বিক্ষুব্ধ বাহিনীর ক্ষোভ-বিক্ষোভের বিষয়টি এতটা গভীর হয়েছে সেটা মনে রাখলেও সান্তবনার জন্য যথেষ্ট নয়। এর সাথে বাইরের যোগসাজশ ও ইìধন একেবারেই নেই সেটা বিশ্বাস করা কষ্টকর। কারণ, আমাদের মতো একটি কৌশলগত অবস্খানের দেশে সামরিক বাহিনী আধাসামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনী অন্যদের শ্যেনদৃষ্টিতে নেই তা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক বাহিনীকে বিতর্কিত ও পঙ্গু করার মতো শত্রুর অভাব নেই। দেশের ভেতরে যেমন আমাদের সার্বভৌমবিরোধী শক্তি আছে। চার পাশেও আছে। জনগণ ও সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি করার অন্তহীন চেষ্টা না দেখার ভান করে কোনো লাভ নেই। বিডিআর বিদ্রোহের সুযোগে আমাদের সামগ্রিক সামরিক বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কোনো অশুভ চক্রান্ত চলছে না, সেটা আমরা নিশ্চিত হবো কিভাবে।
কার্যত দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় বৈঠক করে জাতিকে ঐক্যের ডাক দেয়ার দায়বোধ করলে ভালো করতেন। দেশের সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী ও বিডিআর’র রক্তক্ষরণ জনগণ চেয়ে চেয়ে দেখবে, আর স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে কাতর হবে এটা হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষের দেশপ্রেম সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এ কথা স্বীকার করতেই হবে।
দেশ ভিন্নমাত্রিক সঙ্কটে, জাতি উদ্বিগ্ন। দেশ-জাতি সবার আগে। এখন যেকোনো বাড়াবাড়ি জনগণকে পীড়া দেবে। সেনাবাহিনী আমাদের, বিডিআর আমাদের। এদের রক্ষা করতে হবে। পরিস্খিতি নিয়ন্ত্রণে আজকের প্রেক্ষাপটে যত কম ক্ষতির মাধ্যমে চলমান পরিস্খিতির উত্তরণ সম্ভব হবে ততই মঙ্গল। এমন পরিস্খিতিতে নানা পথে বিদেশী হস্তক্ষেপ হতে পারে। সে ব্যাপারেও সতর্ক হতে হবে। সমস্যা সঙ্কট উত্তরণে দলীয় ভাবনা অনেক সময় সমস্যা বাড়ায়। তাই জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে ইস্পাতকঠিন জাতীয় সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সবাইকে নিয়ে একযোগে কাজ করার মধ্যেই অধিকতর কল্যাণ নিহিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





