নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দু’জন ইসরাইলি রাজনীতিক (বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু আর এহুদ বারাক, যারা ইসরাইলের নতুন সরকারের যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হবেন মনে করা হচ্ছে) ঘোষণা করেন, এ আক্রমণ হচ্ছে সভ্যতার যুদ্ধ, ইসলামি সন্ত্রাসবাদ জুডিয়ো-খ্রিষ্টান সভ্যতার বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছে। তারও কয়েক ঘন্টা পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও একই উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন এবং দিন দুই পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তার রাজনৈতিক গুরু বুশের মতো ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে রণহুঙ্কার ছাড়েন। গত দুই দশক, বিশেষ করে জর্জ বুশের সময় থেকে ইসরাইলি নেতারা যে দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন মার্কিন সরকার সে দিকে যায়। কিন্তু মুখের কথা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার পর বুশ-ব্লেয়ারের চৈতন্যোদয় হলো; হয়তো বা তাদের উপদেষ্টাদের মধ্যে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের বুঝিয়েছিলেন, ইসলাম আর সন্ত্রাসকে সমার্থক করে দেখিয়ে তারা বিশ্ব মুসলিমকে ক্রোধান্বিত করে তুলেছেন। এতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে তাদের কূটনৈতিক স্বার্থের ক্ষতি হতে বাধ্য।
হঠাৎ করে বুশ-ব্লেয়ারের রণতূর্য থেমে গেল। তারা ‘সভ্যতার সংগ্রামের এবং ইসলামি সন্ত্রাসের’ পরিবর্তে ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ আত্মনিয়োগ করলেন। জর্জ বুশ ঘোষণা করেছিলেন ‘পৃথিবীর সীমানার মধ্যে সব সন্ত্রাসী জোটকে খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা পর্যন্ত এ যুদ্ধ বìধ হবে না।’ বুশ তার যুদ্ধে সমর্থক সংগ্রহের অভিযান শুরু করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ১২০০ কোটি এবং পাকিস্তান সরকারকে ৩০০ কোটি ডলার সাহায্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘প্রথম কাতারের মিত্র’ নিয়োগ করা হলো।
তাতেও তাদের ফাঁড়া কাটেনি। বিশ্বের সর্বত্র যেসব দলিত-নির্যাতিত অমুসলিম নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল, তারাও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের টার্গেট হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যার্জন তাতে বিঘিíত হয়। সমস্যাটা ব্রিটিশরা আগে বুঝতে পেরেছিল। দু’বছর আগে টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। গর্ডন ব্রাউন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা ঢাকঢোল না পিটিয়ে বলতে গেলে নীরবে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে য্দ্ধু’ বাক্যাংশটি পরিত্যাগ করেন। ব্রিটেন এখন সন্ত্রাস দমনকে অনেকটা অপরাধ দমনের মতো মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ব্যাপারেই বোধোদয় হতে শুরু করেছে জানুয়ারি মাসে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে। গত ২৬ মার্চের খবর অনুযায়ী ওবামা সম্প্রতি প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে বলেছেন, “এই প্রশাসন ‘দীর্ঘ যুদ্ধ’ অথবা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বজোড়া যুদ্ধ’ কথাগুলো ব্যবহার করা পছন্দ করছে না। প্লিজ, আপনাদের বক্তৃতা লেখকদের মনোযোগ এ দিকে আকৃষ্ট করুন।”
ভেবেচিন্তে কথা বলেন কিংবা কাজ করেন বলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তেমন সুনাম নেই। তিনি আবার ক্ষমতা পেতে অস্খির হয়ে উঠেছিলেন এবং দিল্লি ছাড়াও ওয়াশিংটনের সমর্থন পেলে ক্ষমতাপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন। তাই গত বছর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি কয়েকবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর স্টেট ডিপার্টমেন্টে পদধূলি দিয়েছিলেন এবং দেশে ফেরার আগে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচারের সাথে দীর্ঘ গোপন বৈঠক করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে তখনো জর্জ বুশ কার্যকর প্রেসিডেন্ট। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তার গদিতে টিকে থাকতে পারেননি। বুশের যুদ্ধে শরিক হতে গিয়ে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান সীমান্তে অনুপ্রবেশ করতে দিয়েছেন, মার্কিন হেলিকপ্টার ও ড্রোন বিমানগুলো অহরহ পাকিস্তানের ভেতরে আক্রমণ চালিয়েছে মোট কথা, পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সব পাকিস্তানি তার ও মার্কিনিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, বলতে গেলে গোটা পাকিস্তানই তালেবানে পরিণত হয়েছে।
আসিফ আলি জারদারি নতুন প্রেসিডেন্ট হলেও দেশের ওপর তার কতখানি নিয়ন্ত্রণ আছে, সে সম্বìেধ মার্কিন সরকারের সন্দেহ আছে। জানা কথা যে বুশ প্রশাসন তার বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ায় আরেকটি মুসলিম দেশের সাথে মৈত্রী চাইছিল।
প্রতিবেশীর ভুল কোথায়
ধারণা করা অসঙ্গত হবে না যে, শেখ হাসিনা বাউচারকে কথা দিয়ে এসেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হলে ওয়াশিংটনকে তিনি সব রকম সহযোগিতা দেবেন। তাতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি, কেননা দিল্লিতে তার পৃষ্ঠপোষকরাও চান যে বাংলাদেশে ইসলামি শক্তিগুলো নিধন হোক। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্খা তাদের পুরনো বিদ্বেষবশত এখনো বাংলাদেশের সঠিক মূল্যায়ন করতে শেখেনি। গোল টুপি আর দাড়িকে তারা ভীষণ ভয় পান। বাংলাদেশের মুসলমানরা বরাবরই ধর্মভীরু। তারা টুপি মাথায় দেন, মসজিদে নামাজ পড়তে যান এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েকে মাদ্রাসায় পাঠান। কিন্তু তাদের ভোটদানের ইতিহাস বরাবরই সেক্যুলার। ভারতীয়দের হিসাবে এ দেশের মানুষ তালেবান কিংবা আলকায়েদা হয়ে গেছে। বুশ প্রশাসনের মতো ভারতীয়রাও বিশ্বাস করে এই টুপি-দাড়িওয়ালাদের নির্মূল করা দরকার। তারা মনে করে, টুপি-দাড়ির অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশীরা পাকিস্তানপন্থী, তারা ভারতের আধিপত্য মেনে নিতে, তাদের পোষ মানতে রাজি হচ্ছে না।
প্রতিবেশী দেশের ভুলটা কোথায় বলি এবার। এ দেশের ধর্মানুরাগ নতুন কথা নয়। ১৯৫৪ সালেও মুসলমানরা নামাজ পড়ত, টুপি মাথায় দিত এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েকে মাদ্রাসায় পাঠাত। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কোনো নির্বাচনে দু-চারটির বেশি আসন পায়নি, শুধু ২০০১ সালে ছাড়া। এ ক্ষেত্রেও বিএনপি কতগুলো নিরাপদ আসন তাদের ছেড়ে দিয়েছিল বলেই।
তারও কারণ ছিল। পূর্ববর্তী ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা ইন্দিরা রোডের বাড়িতে গিয়ে গোলাম আযমের দোয়া নিয়ে এসেছিলেন, সংসদে তার দলের নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা ছিল না বলে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন; কিন্তু সংরক্ষিত নারী আসনের জোরে গরিষ্ঠতা অর্জনের পর জামায়াতে ইসলামীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও যাতে সে রকম অপকৌশল তিনি অবলম্বন করতে না পারেন সে জন্যই বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট করেছিল।
এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েই শেখ হাসিনা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছেন। এমন একটা ধারণা তিনি দিতে চাইছেন যে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছরে সেটা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের সব মানুষের স্মৃতিভ্রষ্ট হয়নি। কারো কারো অন্তত মনে আছে যে ১৯৯৯ সালে জঙ্গিরা যখন যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবং ২০০১ সালে রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা ফাটিয়ে এত মানুষ খুন-জখম করল তখন চারদলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল না, ছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার।
শেখ হাসিনা সর্বত্র জঙ্গি আবিষ্কার করছেন। তিনি আশা করছেন ওয়াশিংটনের মুনিব এবং দিল্লির পৃষ্ঠপোষকরা এতে খুশি হবে। তারা মনে করবে হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের শায়েস্তা করছেন। আওয়ামী রাজনীতিকদের, বিশেষ করে হাসিনার সরকারের মন্ত্রীদের ধারণা, নেত্রী যখন ‘তিলের’ কথা বলেন তখন ‘তাল, তাল’ বলে চেঁচালে তিনি বেশি খুশি হবেন। সরকারের অন্য মন্ত্রীরা, বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব
উলুবনে মুক্তো ছড়ানো
সরকারকে একটা সদুপদেশ দেয়ার চেষ্টা করেছিল শিল্প-বাণিজ্য সংস্খাগুলো। এফবিসিসিআই’র প্রেসিডেন্ট আনিসুল হক গত ২৩ মার্চ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘কাল্পনিক’ জঙ্গিভীতি নিয়ে বেশি গলাবাজি করা হলে বিদেশে জঙ্গিরাষ্ট্র বলে বাংলাদেশের ‘ইমেজ’ সৃষ্টি হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্খিতি সম্বìেধ উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আজকাল আমরা (রাজনীতির) সবগুলো জঙ্গলে জঙ্গি দেখতে শুরু করেছি।’ আনিসুল হক আরো বলেন, দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সাম্প্রতিক কথাবার্তার পর কয়েকজন ব্যবসায়ীকে বিদেশের ভিসা দিতে অস্বীকার করা হয়েছে; আবার কেউ কেউ বিদেশে সফরের সময় সমস্যায় পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা যদি বিদেশে যেতে না পারেন তাহলে তারা আমদানি-রফতানি করবেন কী করে? এ দিকে হাসিনা ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, কথায় কথায় তিনি ‘ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র’ বলে ধুয়া তুলছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবং আওয়ামী সমর্থক মিডিয়া কখনো মস্তিষ্কের ব্যবহার শেখেননি, নেত্রী যদি ‘হুক্কা’ বলেন তাহলে ‘হুয়া, হুয়া’ বলে তারা তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে দেশের সর্বত্র ষড়যন্ত্র চলছে, তার মন্ত্রীরা এই বলে গলা ফাটাচ্ছেন যে দেশ জঙ্গিতে গিজ গিজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন নিজেই স্বীকার করছেন ‘এ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতির গুরুতর অবনতি হয়েছে, প্রায় ৬০০ মানুষ খুন হয়েছে, ডাকাতি-রাহাজানি এবং চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাস কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না।’ আহাম্মক ছাড়া এমন দেশে কেউ বিনিয়োগ করবে কি? এ দেশের সাথে বাণিজ্য করতে আসবে কেউ?
উপসাগরীয় দেশগুলোতে যারা গেছেন তারা অবশ্যই জানেন এ দেশগুলোর আরবরা, বিশেষ করে সৌদি আরব জঙ্গির ভয়ে সব সময় আতঙ্কিত থাকে। বাংলাদেশে ব্যাপক জঙ্গি আছে, এ খবর জানার পর কোনো দেশ বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ করতে চাইবে? মালয়েশিয়া ৫৫ হাজার শ্রমিকের ভিসা বাতিল করাতেই বাংলাদেশ সরকার বেকায়দায় পড়েছে, হালে পানি পাচ্ছে না তারা। কোরিয়াও বাংলাদেশী শ্রমিক ছাঁটাই করতে যাচ্ছে। তারপর উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশীর ভিসা বাতিল হলে উপায় কী হবে?
ব্লগের জগৎ থেকে একটা খবর দিই। অন্তত একজন ভারতীয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবকে লিখেছেন, সরকারের মন্ত্রীদের উক্তি অনুসারেই যখন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে জঙ্গিরা ঢুকে পড়েছে তখন জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কোনো বাংলাদেশীকে রাখা নিরাপদ নয়। এ অবস্খায় কোনো দেশ বাংলাদেশী শান্তিসেনা নিতে অস্বীকার করা বিচিত্র নয়।
একদলীয় পদ্ধতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঠিক এ মুহূর্তে জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের ইমেজের প্রতি হুমকি নয়, জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের একলার সমস্যা নয়।’ তার শেষ কথাটি হচ্ছে আসল কথা। জঙ্গিবাদ কমবেশি বহু দেশে আছে। পাশের দেশ ভারতের কথাই ধরুন, তিন যুগেরও বেশি ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সন্ত্রাস কেন্দ্রীয় সরকার দমন করতে পারেনি, ছত্তিশগড়ে প্রায়ই ডজন ডজন পুলিশ হত্যা করা হচ্ছে, প্রায়ই সন্ত্রাস দেখা দেয় বিহারে। পার্লামেন্ট, মুম্বাইয়ের দু’টি হোটেল এবং কাশ্মীরে পাকিস্তানি সন্ত্রাসের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। সরকারি হিসাবেই ভারতের নিজস্ব জঙ্গি গোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬০টির বেশি। কিন্তু মনমোহন সিংকে (কিংবা প্রণব মুখার্জিকে) ‘জঙ্গি জঙ্গি’ অথবা ‘ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র’ বলে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে শুনেছেন কখনো?
বাংলাদেশে এখন আসল সমস্যা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী হালে পানি পাচ্ছেন না। যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তার কোনোটিই তিনি পূরণ করতে পারছেন না। দশ টাকা কেজির চাল কাউকে তিনি দিতে পারছেন না। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য চালের রেশন হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও দাম ১৮ টাকা। পাঁচ বছরে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কথা হাসিনাও এখন আর বলেন না। বিজলির অভাব, এমনকি খাবার পানির অভাবও এখন গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে; যেকোনো দিন সেটা গণআন্দোলনে ফেটে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন পেটে পাথর বেঁধে, পানি না খেয়ে আর কাঠফাটা গরমে সিদ্ধ হয়ে কেউ ২০২১ সালের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখছে না।
এই ২০২১ সাল উল্লেখের মধ্যে শেখ হাসিনার চিন্তাভাবনার সঙ্কেত নিহিত আছে। তিনি দীর্ঘকাল, হয়তো আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চান। অন্তত বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর, ২০২১ সাল পর্যন্ত তো বটেই। পিতার মতো একদলীয় পদ্ধতি চালু করে আজীবন প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরিকল্পনা তিনি রাখেন।সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার মতো গরিষ্ঠতা বর্তমানে সংসদে তার আছে। প্রয়োজন শুধু কিছু অছিলা সৃষ্টির। শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা দেশ শাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ছেড়ে একদলীয় পদ্ধতি ও আজীবন সরকার-প্রধান পদ্ধতি চালু করার অছিলা সৃষ্টির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশে আসল এবং একমাত্র ষড়যন্ত্র।
লেখক :সিরাজুর রহমান
প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


