তুহিন আরণ্য, মেহেরপুর
‘কুষ্টিয়া, নড়াইল, সাতক্ষীরায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করেছিলাম। যুদ্ধের কারণে হয়েছিলাম ভুমিহীন। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর মাথা গোঁজার জন্য পেয়েছিলাম সামান্য খাসজমি। কোনো মতে একটা ঘর তুলেছিলাম সেখানে। আওয়ামী লীগের নেতা তার লোকজন নিয়ে সেই ঘর ভেঙে জমি দখল করে নিল!’ এই খেদোক্তি মুক্তিযোদ্ধা রবিন দফাদারের।
শুধু রবিন দফাদার নন, তাঁর মতো একই পরিণতি হয়েছে হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা দাউদ আলী, ছমির উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম ও রওশন আলীর। মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় মুজিবনগর স্নৃতিসৌধের পাশে খাসজমিতে তাঁদের বসবাসের অনুমতি দিয়েছিল প্রশাসন।
উদ্বাস্তু মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মমিন চৌধুরী গত বুধবার তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে জমি দখল করে নিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের প্রায় ৪০ জন সদস্য খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। অন্যদিকে মমিন চৌধুরীর লোকজন দখলি জমির চারপাশে ঘের দেওয়ার কাজ করছে। মুক্তিযোদ্ধা দাউদ আলীর স্ত্রী রিকাতুন খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর থেকে তাঁদের রান্না-গোসল-ঘুম বন্ধ হয়ে গেছে। গৃহহারা মুক্তিযোদ্ধারা জানান, নয় মাস আগে মুজিবনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁদের পাঁচ পরিবারকে একই স্থানে চার শতক করে খাসজমি দেন। জমিতে ঘর তৈরির সময় ইউএনওর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা মমিন চৌধুরীও উপস্িথত ছিলেন। অথচ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মমিন চৌধুরী জমিটি তাঁর বলে প্রচার চালান।
মুক্তিযোদ্ধা দাউদ আলী বলেন, বুধবার সকালে নাশতা করার সময় মমিন চৌধুরী ও তাঁর ৮-১০ জন সহযোগী জমিটি তাঁদের বলে দাবি করেন। এ সময় মমিনের লোকজন ঘরবাড়ি ভেঙে আসবাব তছনছসহ তাঁদের মারধর করে জমি দখল করে নেয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনওকে জানানো হলে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা রবিন দফাদার বাদী হয়ে মমিন চৌধুরীকে আসামি করে মুজিবনগর থানায় অভিযোগ দেন।
মুজিবনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগটি মামলা হিসেবে না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, গতকাল দুপুরে মমিনের লোকজন দখলি জমিতে ঘের দেওয়ার কাজ করার সময় পুলিশ জাকারিয়া, চাঁদ আলী, তাহাজুদ্দিন ও বরুন নামের চারজনকে আটক করেছে।
মুজিবনগরের ইউএনও মফিজুর রহমান জানান, এসএ ও আরএস রেকর্ড অনুযায়ী জমিটি সরকারি। তাই পাঁচ ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের থাকার জন্য তিনি জমিটি দিয়েছিলেন। পরে মমিন চৌধুরী রেকর্ড সংশোধনের মামলা করে জমিটি তাঁর বলে দাবি করেন এবং সেখানে বসবাসরত পাঁচ মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি ভাঙচুর করে জমিটি দখল করে নেন।
দখলের ব্যাপারে মমিন চৌধুরী বলেন, ‘রেকর্ডপত্রে জমিটি সরকারি। তাই রেকর্ড সংশোধনের মামলা করে আমি জমিটি নিজের বলে দাবি করেছি। এ ব্যাপারে জয়নালকে (মেহেরপুর-১ সদর আসনের সাংসদ) নিয়ে ডিসির কাছে গিয়ে মামলা করার কথা জানিয়ে জমিটি আমার বলে জানাই। তখন ডিসি জানান, বিষয়টি আদালতের ব্যাপার; এ ব্যাপারে তাঁর কিছুই করার নেই। পরে জয়নালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ করে গত বুধবার জমিটি দখলে নিই।’
এ বিষয়ে জানতে সাংসদ জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
মুজিবনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল জলিল জানান, গতকাল সব ইউনিটের প্রধানকে নিয়ে সভা করে তাঁরা ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা আজ শুক্রবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি এম তাজুল ইসলামের মুজিবনগর সফরের সময় তাঁর গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি চাইবেন বলে জানান।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



