গত কয়েক দিনের পত্রিকার দিকে তাকালে মনে হবে, একদল দানব শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে এই জনপদে ঢুকে পড়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি সংবাদপত্র ও টিভি মিডিয়া সবাই মিলে জিঘাংসায় মেতে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবুবকর নামে একজন নিরীহ ছাত্র নিহত হলেন। ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলার সময় তিনি তার রুমে থাকা অবস্খায় আহত হন এবং ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান। ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে মারা যান ফারুক নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে জঙ্গি অভিযানে নামলেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একটি ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করার নির্দেশ দিলেন। তার এই নির্দেশের কয়েক ঘন্টার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশ একজন শিবির নেতার ঘরে ঢুকে শরীরে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে গুলি করে তাকে হত্যা করে। একই সময়ে আরেকজন শিবিরকর্মীকে হত্যা করা হয় চট্টগ্রামে। দেশের আনাচে-কানাচে শুরু হয় জামায়াত-শিবির কর্মীদের ওপর পুলিশ ও শাসক দলের হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ। এর পাশাপাশি পুলিশ গ্রেফতার করতে থাকে শত শত লোককে। পাশাপাশি চলে সরকারবিরোধী সংবাদপত্রের মুখ বìধ করার বর্বর অপচেষ্টা। একটি পত্রিকার সম্পাদকের প্রাণনাশের পর্যন্ত চেষ্টা করা হয়, যে ব্যাপারে আজ পর্যন্ত সরকার কাউকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করেনি।
দেশজুড়ে চালানো এই তাণ্ডবকে অনেকে আওয়ামী লীগের জঙ্গিবাদী মানসিকতার হঠাৎ বহি:প্রকাশ বলে মনে করতে পারেন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এই দলটির নেতাকর্মীরা রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করেছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলের কয়েকজন সমর্থককে এবং তাদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করেছিল। এই দৃশ্য সারা দুনিয়ায় প্রচার হওয়ার পর শেখ হাসিনা একটি বিদেশী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকারে তাকে খোলামেলাভাবে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘ওরা তো সাপই, সাপকে তো পিটিয়েই মারতে হয়।’
তবে এই ঘটনাগুলোর আগের কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখলে বোঝা যাবে, এটি অপরিকল্পিত কোনো তাণ্ডব নয়। বরং একটি আশু লক্ষ্যকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফিল্ড টেস্ট হিসেবে ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আগে-পরের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে ক্ষমতাসীনদের স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে :
১. পঞ্চম সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্খায় ৪ জানুয়ারি আইনমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে। তার এই বক্তব্যের ফলে সপ্তাহখানেক ধরে এই নিয়ে রাজনীতির অঙ্গন উত্তপ্ত থাকে এবং এর নিচে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর ও সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি অনেকটাই চাপা পড়ে যায়।
২. প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ২০ জানুয়ারি বলেন, জিয়ার মাজারে বাক্স কবর দেয়া হয়, তাতে জিয়ার লাশ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা এ বিষয়ে আরো কুরুচিকর বক্তব্য দিতে থাকেন। এতে রাজনীতির মাঠ ও মিডিয়া এই ইস্যুটি নিয়ে গরম থাকে সপ্তাহখানেক। চাপা পড়ে যায় দিল্লি চুক্তি।
৩. বঙ্গবìধু হত্যা মামলার রায় ২৭ জানুয়ারি রাতে কার্যকর করা হয়। এর রেশ চলে কয়েক দিন।
৪. ৩০ জানুয়ারি গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সরকারকে উৎখাত করতেই বিডিআর বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছিল বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিডিআর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন? ওনার (খালেদা জিয়ার) বড় সন্তান কিভাবে বিদ্রোহের দিন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ফোন করে তার মাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন? এরপর টানা তিন দিন খালেদা জিয়া কোথায় কী করেছেন, তা উদঘাটন করা হবে।’
দেখা যাচ্ছে, সরকার নিজ থেকেই একের পর এক উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর জন্য। সরকার আসলে দুটো বিষয় ঢাকতে চাচ্ছে
এক. সম্প্রতি সম্পাদিত প্রকাশিত-অপ্রকাশিত দিল্লি চুক্তি, যাকে বিরোধী দল বলছে দেশ বিক্রির চুক্তি আর সরকার সমর্থকরাও শেখ হাসিনার পুরস্কার ছাড়া এর থেকে বাংলাদেশের জন্য লাভ খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন। চুক্তির পরপরই যে ব্যাপক আন্দোলনের ভয় সরকার করছিল তা থেকে আমাদের অতি ভদ্র বিরোধী দলগুলো সরকারকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তবে ধীরে ধীরে আন্দোলন গড়ে উঠছিল যা এক সময় বড় আকার ধারণ করতে পারত।
দুই. বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনা হত্যাযজ্ঞের বর্ষপূতি আর কয়েক দিন পরই। এই হত্যাযজ্ঞের সাথে আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনার একটা সম্পৃক্ততা মুছে ফেলা খুবই কষ্টকর। যারা মাত্র আধঘন্টা আগে অর্ধশতাধিক সেরা সেনা অফিসার হত্যা করেছে, তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী চা খেলেন, আলাপ-আলোচনা করলেন এটি ঠাণ্ডা মাথায় কারো পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ সব সময়ই বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
এই দুই আশু বিপদ থেকে বাঁচার জন্য সরকারের প্রয়োজন ছিল ইস্যু তৈরি করা এবং তা অনেকটাই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই সফলতা এবং এর ফলে যে রক্তের স্বাদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা পেয়ে গেছে, তা ব্যবহার করে সরকার এবং তাকে পরিচালনাকারী বিদেশী শক্তি তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের দিকে এগোবে। পরিকল্পনাটি গোপন কিছু নয়। নির্বাচনের আগে সারা পৃথিবীকে জানান দিয়েই তা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ক্ষমতাসীন দলটি বাংলাদেশকে ভারতের উপযোগী একটি সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বাকশালকে এখনো মন্ত্রীরা একটি আদর্শ রাজনৈতিক ব্যবস্খা হিসেবে মনে করেন এবং তা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রধান লক্ষ্যই যে ভারতের স্বার্থ রক্ষা তাও তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে দ্বিধা করছেন না।
এই তিন লক্ষ্য অর্জনে তাদের সামনে প্রধান বাধা বিএনপি-জামায়াত। বর্তমানে বিএনপি যেহেতু অনেকটাই ছত্রভঙ্গ এবং দুর্বল, তাই আগামী এক বছরের মধ্যে জামায়াতের কোমর ভেঙে দেয়াটা তাদের জন্য আবশ্যক। এ উদ্দেশ্যে যে যে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে; তা হচ্ছে
০১. মার্চের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গ্রেফতার করা। এ সময়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের হয়তো ধরা নাও হতে পারে।
০২. মার্চ মাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ও আন্দোলন তুঙ্গে উঠবে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠবে বেশ কিছু জঙ্গিবাদী গ্রুপ। তারা গ্রেফতারকৃত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে বোমা হামলা চালাবে এবং পরে পুলিশের কাছে এসে অকপটে জানিয়ে দেবে যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে তারা এসব কাজ করেছে।
০৩. মার্চের শেষ নাগাদ জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের ধরপাকড় শুরু হবে।
০৪. জামায়াত-শিবিরের নামে জঙ্গি হামলা চলবে আরো ছয়-সাত মাস এবং পরিস্খিতি বুঝে সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করবে।
এর পরে ধরা হবে বিএনপিকে। দলটিকে বশে রাখতে সরকারের হাতে রয়েছে তারেকের বিরুদ্ধে মামলার মতো অব্যর্থ অস্ত্র। তারেকের বিরুদ্ধে প্রচারণাও চলবে অব্যাহতভাবে। এর এক পর্যায়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার ওপর আঘাত এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মনে রাখা দরকার, ক্ষমতাসীন এবং তাদের বিদেশী পরিচালকরা এ বিষয়টি ভালো করে জানে যে, জিয়া পরিবার ছাড়া বিএনপি’র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটুকু সহজ হবে তা নির্ভর করছে বিরোধী দলের বর্তমান কর্মকাণ্ডের ওপর। তারা যদি মনে করে, ভয়ে চুপসে গিয়ে অথবা হিকমত খাটিয়ে রাজপথ থেকে দূরে থাকলে তারা বেঁচে যাবেন, তাহলে তারা তেমন ভুল করবে যেমনটি করেছে কেয়ারটেকার সরকারের আমলে। হিকমত খাটিয়ে, হিসাব-নিকাশ করে কখনো স্বাধীনতা বা অধিকার আদায় বা রক্ষা করা যায় না
লেখক----আহসান মোহাম্মদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


