যদিও এই ট্রিলজির তিনটি ছবিই সম্পূর্ণ আলাদা, এবং প্রতিটি ছবিই একেকটি স্বয়ং সম্পূর্ণ ছবি, তবে মূল থিম তিনটি ছবিরই এক, ‘প্রতিশোধ’। এই ত্রয়ীর প্রথম ছবি মুক্তি পায় ২০০২ সালে, ‘সিমপ্যাথি ফর মিস্টার ভেনজেন্স’। এরপর ২০০৩-এ ‘ওল্ড বয়’ ও ২০০৫-এ ‘সিমপ্যাথি ফর লেডি ভেনজেন্স।’ সবগুলো ছবিই বিশ্ব-সিনেমা মহলে ভূয়সী প্রশংসাসহ জিতে নিয়েছে অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
তিনটি ছবিই আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু ‘সিমপ্যাথী ফর মিস্টার ভেনজেন্স’ নিয়ে লেখার মূল কারণ, ছবিটি প্রতিশোধ প্রবণতার সাথে সাথে তুলে ধরেছে সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের নিদারুণ বাস্তবতা। বিশেষ করে একদল অসদ অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ ব্যবসায়ীর উপস্থিতি ও তার ফলে একটি পরিবারে নেমে আসা করুণ পরিণতি, যা আমাকে কিছুদিন আগে আমাদের দেশের শত শত পরিবারের নির্মম বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, যেখানে খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ত অসহায় দরিদ্র মানুষ ও পরিবারের করুণ কাহিনী, যারা রক্তচোষাদের খপ্পরে পড়ে বাজারের পণ্যর মতো বিক্রি করে চলেছে নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ। যদিও এই ছবিতে রিও তার বোনকে বাঁচানোর স্বার্থেই নিজের কিডনী দিতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু সমাজের এই যে শ্রেণী, যারা জীবন যুদ্ধে অনন্যেপায়, তাদের সাথে এই ঘটনাও ব্যতিক্রমী কিছু নয়। যখন রিও নিজের কিডনী দিতে একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং-এর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছিল আর ক্লোজ-শর্ট থেকে ক্রমশঃ লং-শর্টের মাধ্যমে ছোট্ট একটি রূদ্ধ ফ্রেমের মধ্যে দৃশ্যটি শেষ হয়, এবং অন্ধকার থেকে পরবর্তী দৃশ্য শুরু হয়, যা আমার কাছে রূপক হিসেবে ধরা দিয়েছে। রিও ও তার সামাজিক অবস্থান, তথা কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থাকে যেন অধিক সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে রিও যখন পৌঁছে যায় অবৈধ ব্যবসায়ীর প্রধান বৃদ্ধা রমণীর কাছে, তখনই হয়ত সমাজের আরেকটি নিদারুণ নির্মমতা সংঘটিত হয়ে যায়, যেখানে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা রিও-কে বাধ্য করে সেখানে পৌঁছে যেতে।
কোনো এক সাক্ষাতকারে চান-অক পার্ক ছবিটি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এই ছবিতে আমি দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রেণীগত টানাপোড়ের দিকে আলোকপাত করেছি। আমি চেয়েছি সমাজের শ্রেণীগত বৈষম্য তুলে ধরতে। সবুজ-জামার শ্রমিকরা ভাবে যে, মালিক পক্ষরা সবসময়ই তাদের অবস্থার সুযোগ নেয়, কিন্তু তারা খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু, পূঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভাল মানুষ, এবং ভাল ব্যবসায়ীর মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়ে যায়। যখন একটি কোম্পানী ভাল ব্যবসা করছে না, তখন ভাল মানুষটি কাজ ছাড়া অধিক শ্রমিক রাখার পরিবর্তে চেষ্টা করবে কিছু লোককে ছাটাই করতে। এই ছবিতে সেটাই মূখ্য অনুষঙ্গ। একজন ছাটাইকৃত শ্রমিক আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করে, এবং পরে সপরিবারে নিজেদের হত্যা করে। এটা কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থায় ঘটে থাকে, এবং আমাদের উচিত সে সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।’ হয়ত এই বলাটাই আরও চমৎকারভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে ছবিটির শেষে এসে, যখন রিও-কে লেকের পানির মধ্যে নির্মম ও নির্বিকারভাবে হত্যা করা হয়, তখন শর্টটি এমনভাবে নেয়া হয় যেখানে লং শর্টে দেখানো হয় রিও-র বাঁচার প্রচন্ড আকুতি যা ঝাপসা, অস্পষ্ট, আর ক্লোজ শর্টে গোড়ালির কাটা অংশ থেকে গলগলিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের স্রোত ও পেছনে ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি তার হত্যাকারীর নির্বিকার ও সহানুভূতিহীন মুখ। অথচ রিও-র মুখ বা তার বোবা-বোধির আকুতি অথবা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আসা অভিব্যক্তি দেখানো হয়নি, যেনবা এটাই চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত স্বরুপ, নির্মম ও করুণ।
বলা যায় গতানুগতিক রক্তময় সংঘর্ষ বা তথাকথিত থ্রিলার মুভির বিপরীতে পরিচালক চান-অক পার্ক এমন এক ভাষা ও শৈলী তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন যে, এই ছবি বা ট্রিলজির দিকে সচেতন দর্শকমাত্রই আরেকবার ফিরে তাকাতে বাধ্য হয়, ভাবতে হয় তাকে, এবং বলতে হয়, একটি মুভি নির্মাণের যতগুলো দিক থেকে তা বিচার করা যায়, তার সবগুলো ক্ষেত্রেই চান-অক পার্ক শুধু উতরেই যাননি, বরং আমাদের চির পরিচিত মুভি জেনরি-কে ভেঙে নতুন এক জেনরি উপহার দিয়েছেন, যা নতুন অথচ আমাদের চেনা জেনরির বাইরেরও নয়। মূলতঃ এখানেই তিনি অনন্য। যারা হলিউডি থ্রিলার বা ব্লাড শেডিং মুভি দেখে অভ্যস্ত, তারা কখনোই যেন এই ছবি বা ট্রিলজি দেখতে না বসেন, কেন না রক্তের যে চিরন্তন লাল রং এবং মানুষের স্বভাবজাত প্রতিশোধ প্রবণতা, তা এই ছবি বা ছবিগুলোয় টুকরো টুকরো করে ভেঙে দেখানো হয়েছে, যার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অসম্ভব, কিন্তু অনুধাবনে এমন এক অনুরণন তৈরী করে যে, পরিণতির শেষে পৌঁছেই কেবল উত্তর খোঁজা যেতে পারে সম্পূর্ণ উত্তরহীন হয়ে।
চান-অক পার্কের এই ট্রিলজির মধ্যে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ এই ছবিটি। রিও নামের একজন বোবা ও বধির যুবকের নির্মম জীবন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে ছবিটির শুরু, যে একটি ফ্যাক্টরীতে কাজ করে, এবং তার বোনের কিডনী ট্রান্সপ্লান্টের জন্য সব রকম চেষ্টা করে। সে নিজের একটা কিডনী দিতে চায়, কিন্তু ডাক্তার জানায় রক্তের গ্রুপ ভিন্ন বলে তা সম্ভব নয়। হঠাৎ করেই কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট তাকে বরখাস্ত করে, ফলে সে কোনো পথ না পেয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীর শরণাপন্ন হয়। সে নিজের কিডনী ও অর্থের বিনিময়ে বোনের জন্য কিডনীর জন্য তাদের সাথে সমঝোতা করে, যারা প্রতারণা করে, এবং ওর কিডনী নিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং-এ ফেলে রেখে যায়। বোনকে বাঁচাতে অর্থ যোগাড় করা ছাড়া তার কাছে কোনো উপায় থাকে না, ফলে তার মেয়ে বন্ধু তাকে পরামর্শ দেয় কোম্পানীর মালিকের মেয়েকে কিডন্যাপ করার। ঠিক এখান থেকেই চান-অক পার্ক তার মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে শুরু করেন, এবং ঠিক এখান থেকেই যেন ছবিটি গভীর থেকে গভীরে ঢুকতে থাকে, যেখানে তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহার বিপরীতে সহানুভূতি প্রবল ও প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। যদিও রিও ও তার বোন, এমন কী মেয়ে বন্ধুটিও কিডন্যাপ করার পর মেয়েটির যথেষ্ট যত্ন নেয়, এবং তাকে সুন্দরভাবেই নিজেদের হেফাজতে রাখে, কিন্তু ঘটনাক্রমে রিও-র বোন যখন জানতে পারে যে তার জন্যই তার ভাই এসব করছে, তখন সে আত্মহত্যা করে। পুরো ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু এখানেই, যেখানে বোনের লাশ আকড়ে রিও-র হৃদয়বিদারী বোবা কান্নায় দর্শক বাধ্য হয় নিজের অজান্তেই প্রচন্ড সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে, অথচ চরম সিদ্ধান্তহীনতার মাঝে কাহিনীর সাথে এগিয়ে যেতে একসময় বিবশ হয়ে পড়ে। এরপর রিও তার বোনের ইচ্ছানুযায়ী তাকে নদীর পাড়ে কবরস্থ করতে গেলে কিডন্যাপ করা মেয়েটিকে সাথে নিয়ে যায়, যেখানে সে নিতান্তই দূর্ঘটনা বশতঃ জলে ডুবে মারা যায়, এবং ফলস্বরুপ রিও পরবর্তীতে নির্মমভাবে খুন হয় মেয়েটির বাবার হাতে। এই হলো ছবির কাহিনী সংক্ষেপ।
১২৯ মিনিটের এই কোরিয়ান চলচ্চিত্রটি অবশ্যই বিশ্ব-সিনেমায় দারুন সংযোজন, তথা নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে উল্লেখযোগ্য পথিকৃত। বিশ্বের অনেক পরিচালকই হয়ত ঈর্ষায় নীল হয়ে যাবে এর মেকিং, ফ্রেম টু ফ্রেম প্রোগ্রেস, প্রতিটি শর্টের শৈল্পীক চিত্রায়ন, নিখুঁত এডিটিং, রং এর ব্যবহার, যা অবশ্যই চান-অক পার্কের সিনেমার বিশেষতম দিক, চরিত্রের সংলাপ, কাহিনীর বিকাশ, এবং সর্বোপরি খুব চমতকৃত ব্যাপার এই, এমন একটি চলচ্চিত্রের মাঝেও কমেডির উপস্থিতি, যা আমাকে বিস্ময়াভূত করেছে। এত পরিপাটি ও দক্ষতার সাথে এমন একটি কাহিনীর মাঝেও যে কমেডি ব্যবহার করা যায়, তা চান-পাক অর্ক-ই প্রথম দেখালেন। খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পরিচালক যেন গভীরভাবে ক্যামেরার চোখ দিয়ে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে জীবন ও মানুষের মানসিকতার গভীরে ক্রমশঃ ঢুকে পড়েছেন। ছবি যত এগিয়েছে ততই যেন সেই দৃষ্টি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। এই যে দেখা বা দেখানোর এই বিশেষ ও ব্যতিক্রমী প্রয়াস, সম্ভবত সেখানেই চান-অক পার্ক হয়ে উঠেছেন অদ্বিতীয়।
এই ছবিটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক, এর অভিনয় শৈলী, যা এত বেশি শক্তিশালী যে আমি পুরো ছবিজুড়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থেকেছি। বিশেষ করে বোবা ও বধির চরিত্রে হা-কিয়ুন শিন-এর অভিনয় নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। এছাড়াও রিও-র মেয়ে বন্ধুর চরিত্রে ডোনা বি অথবা মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি চরিত্রে কাং-হো সং-এর অভিনয় আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে, পরিচালক ষোলআনাই পেরেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে তাদের সেরাটুকু বের করে আনতে। প্রতিটি চরিত্রই এখানে সাবলীল, এবং মুহূর্তের জন্যও বেরিয়ে যায়নি কাহিনী থেকে। যদিও চিত্রনাট্যকারদ্বয় মু-ইয়ং লি ও চান-অক পার্ক দু’জনের কেউ-ই শেষ অব্দি আমাদের কোনো উত্তর বা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেননি, বরং সমগ্র কাহিনী জুড়ে আমাদের সহজাত প্রবণতা ও সহানুভূতির আড়ালে দারুণ এক বিপরীতধর্মী মানসিক খেলায় লিপ্ত করেছেন। রিও, যে কিনা সেই অবৈধ ব্যবসায়ী রমণী ও তার সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করল, যারা তাকে ঠকিয়েছিল; কোম্পানীর মালিক, যে এ জানার পরও যে তার মেয়েটিকে রিও বা তার বোন সুন্দরভাবেই তাদের কাছে রেখেছিল, অথচ কন্যার মৃত্যু প্রতিশোধ নিতে রিওকে নির্মমভাবে হত্যা করল; কিংবা শেষে কোম্পানীর মালিক নিজে বর্বরোচিতভাবে খুন হলো, তখন প্রতিশোধ নয় কেবল সহানূভুতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না কোথাও। এত যে রক্ত, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, এমন কী প্রতিশোধ পরায়ণতার যথাযথ সমর্থন থাকার পরও, কোথাও কোনো স্বস্তি পরিলক্ষিত হয় না, কেবল সহানুভূতি আর অসহায়তা। সমস্ত ঘটনা আর পরিণতি শেষে একটিমাত্র অবস্থানে গিয়ে থমকে দাঁড়ানো যায়, তা হলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় সহানুভূতির চরমতম অসহায়তা। এই যে নির্মাণ ও কাহিনীর উৎকর্ষতা, এবং তাকে এমন পরিণতি সহকারে তুলে ধরা, যা নিশ্চিতরূপেই অন্যান্যদের মতো আমাকেও বলতে বাধ্য করে, চান-অক পার্ক বর্তমান সময়ে জীবিত সৃষ্টিশীল পরিচালকের অন্যতম, যিনি বিশ্ব সিনেমাকে নতুন সিনেমাটিক ভাষা ও শৈলী দিতে পেরেছেন, এবং আমাদের গতানুগতিক থ্রিলার, ক্রাইম কিংবা ড্রামা জেনরি-কে সম্পূর্ণ নতুন পরিণতি দিতে সক্ষম হয়েছেন, যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চাই, ‘চান-পাক জেনরি’। কোরিয়ান সিনেমার ক্রমবর্ধমান বিকাশ ও শৈল্পিক সমৃদ্ধি অবশ্যই আমাদের দৃষ্টি ও মনোযোগ ফিরিয়ে এনেছে নতুন এক সিনেমা ঘরানার দিকে, তা হলো ‘কোরিয়ান সিনেমা’।
পরিশেষে বলব, যারা নিতান্তই হলিউডি ক্রাইম বা থ্রিলার দেখে অভ্যস্ত, এবং যারা নিপাট-নিভাঁজ বিনোদন শেষে উঠে আসতে চান স্ক্রিনের সামনে থেকে, তারা যেন অসংখ্যবার ভেবে তারপর বসেন এই ছবি বা ট্রিলজি দেখতে, কেন না দেখা শেষ হবার পর ভাবনার বলয়ে এমন কিছু তৈরী হবে, যা আপনাকে কেবল সহানুভূতির প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে চরম অসহায়তার মাঝে নিজেকে আবিস্কার করাবে, যেখানে আপনি কোনোভাবেই নির্দিষ্ট করতে পারবেন না, আপনার প্রতিশোধ স্পৃহা ও সহানুভূতি কোনটা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
অরণ্য
২ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
কেশবপুর, যশোর
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৪:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



