সমুদ্র সন্ধ্যায় কথোপকথন-০১
যখন দিবস সাঙ্গ হতে চলেছে। বিভিন্ন রঙ্গে আকাশ সেজেছে পিনপতন নীরবতায়। আমি যখন ডুবে গেছি ভাবনার অন্তরালে। লাটিম ঘুড়ি চিন্তায় আমার মনটা যখন মগ্ন; ঠিক তখনি সব নিরবতা ছাপিয়ে ফোনটা বেজে উঠেলো............
আমি হাতে নিয়ে ফোন জিজ্ঞেস করলাম,
-হ্যালো! কে?
ও প্রান্ত থেকে একটা মিষ্টি কন্ঠে বলে উঠলো; বলুন তো কে?
-কন্ঠ চেনা মনে হলেও বুঝতে পারছিনা। হয়তো আপনি আমার শুভাকাঙ্খি হবেন আর কি!
-কেন শুভাকাঙ্খি ছাড়া আপনাকে আর কেউ ফোন করেনা বুঝি?
-করে। তবে সেটা খুব কমের সংখ্যায়। বলেই ফেলুন না আপনি কে? আর নিত্যান্তই যদি বলতে না চান তাহলে থাক।
-পরিচয় না দিলে ফোন রেখে দেবেন বুঝি!
-না, না, আমি এতো সহজে হাল ছাড়বার পাত্র নই। পরিচয় না পেলেও কথা বলতে বাধে না আমার।
-শুনে খুশি হলাম। আমি সন্ধ্যা। চিনতে পেরেছেন কি? ওই যে সেদিন সন্ধ্যেয় বইমেলায় দেখা হলোনা। আমার বাহারি সবুজ শাড়ি দেখে বলেছিলেন, মহিলা কবিরা সাদা আর সবুজ খুব ভালোবাসে মনে হয়!
-হ্যা; এবার মনে পড়েছে। আপনি সন্ধ্যা। দুঃখিত। মেয়েদের কন্ঠ আমি আলাদা করে চিনতে পারিনা; সব মেয়ে কণ্ঠই যেন এক মনে হয়।
- আপনাকে অনেক মেয়েরা ফোন করে বুঝি;
-নাহ্ কি,যে;বলেন! অনেকের সময় কোথায়? কেউ কেউ হয়তো সময় করে খোজ খবর নেয়।
-তাই নাকি! আচ্ছা যাক সে কথা, ভালো আছেন আপনি?
- আমার ভালো থাকা আর আকাশ দেখা সমান কথা।
- ও তাই, রোদ বৃষ্টি’র মতো কি জীবন আপনার?
- হ্যা ওরকমই। আপনি কেমন আছেন?
- সন্ধ্যের আকাশে চাঁদ যেমন আছে; অনেকটা সেরকম।
- মেয়েরা নিজেদেরকে চাঁদ ভাবে তাইনা?
- চাঁদের মতো আলো ছড়াতে পারে যে; তাই হয়তোবা অনেকাংশে নিজেকে চাঁদের মতো মনে হয়।
- আপনি পারবেন কারো জীবনে চাঁদের মতো করে আলো ছড়াতে?
- পারবো যদি কিনা সে তার জীবনের পথে পা রাখবার অনুমতি দেয় আমায়;
- অনুমতির কথা বলছেন যে। জীবনের পথে সাথী হবার জন্য কাউকে অনুমতি দিতে হয়না; ওটা আপনা-আপনিই চলে আসে; মেঘ যেমন আপনা-আপনিই চাঁদকে ঢেকে ফেলে আবার আপনা-আপনিই চাঁদকে মুক্ত করে দেয় তাতে কি সে চাঁদের অনুমতি নেয়?
- তা নেয়না ঠিক। তাই বলে চাঁদ যদি আকাশে না উঠে তাতে মেঘ কিন্তু চাঁদকে উঠাতে পারেনা?
- বুঝতে পারলাম আপনি জীবন দিয়ে জীবনকে ভালোবাসতে জানেন। একটা কথা বলবেন আমায়?
- কি কথা?
- এত নাম থাকতে আপনার নাম সন্ধ্যা হলো কেন?
- আমি যে দিনের শেষে আচঁল পেতে রাতকে ঘরে তুলি। দিনের শেষে ঘরে ফেরা মানুষের মাঝে ভেসে যাই। আবার নীল আকাশের চাঁদকে ডাকি আকাশে জাগতে। শুকতারা আমার সঙ্গি। জোস্না আর জোনাকির সাথে আমার জন্মান্তরের মিতালী। আর এসব মিলিয়েই আমি দিন শেষের সন্ধ্যা। আমি আছি থাকবো এ ধরনীর ঘুর্ণনে আমার পরশ লেগে আছে। সন্ধ্যাকে তো জানলেন এবার বলুন তো আপনার না সমুদ্র কেন ?
-সমুদ্র! শব্দটার মাঝেই বিশালতা। এ জগতের কান্নার জল যে কতো ভারি তাবলে বোঝানো যাবে না। সেই ভার নিয়েছি এই আমি, বুক পেতে। আকাশ কাঁদে তাতে বর্ষণ হয়; স্রোতে ভাঙ্গে নদী’র কুল। প্লাবিত জলরাশি খুজে আশ্রয়! তাইতো পেতেছি এ বুক। আপনাদের চোখের জল মৃত্তিকা শুষে নেয় তারপর জমা রাখে আমার বুকে; পৃথিবীর সব জলের আশ্রয় সমুদ্র। আর ভার বইবার অরন্যে আমি উন্মুক্ত আমি বিশালতা নিয়ে বসে আছি। আমি সমুদ্র হয়ে আছি।
- খুব সুন্দর করে কথা বলেন তো আপনি! মনে হচ্ছিল কেউ যেন খুব আলতো করে আমায় কথার সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা সমুদ্র; যদি কোনদিন কোন তারায় ভরা কোন ডিঙ্গি নৌকা পেয়ে যান তাহলে কি তাতে করে আপনার বিশাল সমুদ্র জীবন পাড়ি দিতে পারবেন?
- কেন পারবোনা? ভালবাসা থাকলে নদীর বুকেও সমুদ্র আঁকা যায়। আর এ, তো তারায় ভরা ডিঙি নৌকা। তাতে করে ভাসতে ভাসতে ভেসে যাব অতলে নয়তো নতুন কোন দ্বীপে। যেখানে পরিচিত স্বপ্নরা থাকবেন।
-সত্যি ! ভেসে যাবেন তেমন কাউকে পেলে?
-হ্যা সত্যি!
- আশার সাগরে কাঙ্গাল সাজাবেন না তো আবার?
-সন্ধ্যা, এই হৃদয় দূয়ারে শ্যাওলা জমে আছে। যদি কারো স্পর্শে তা দূর হয়, তাতে আমিই বরং বেঁচে যাই। কিন্তু আবার ভয়ও হয় তাকে ভালবাসায় সাজাতে গিয়ে যদি না শেষে, আমিই কাঙ্গাল হয়ে যাই। কেমন হবে তাহালে?
- নাহ্ যে আপনার মাঝে আসবে, আপনাকে কাঙ্গাল হতে দেবে না সে। সে আপনার হাত ধরে এনে বসাবো তার হৃদয় মন্দিরে। শুধু কথা দিতে হবে, তাকে ভাসানো যাবেনা কখনো চোখের সমুদ্রকান্তায়।
- যদি সেরকম কেউ আসে তাহলে এই সমুদ্রে ভাসবে সুরের দোলায়। আর কথা দিলাম, ভাসতে হবেনা কখনো তাকে।
- তাই যেন হয়; সমুদ্র। নয়তো খুব অতলে ডুবে গিয়ে সে হারাবে সব।
-হারাবার কথা বলছেন? এই হারাবার ভয়েই তো সমুদ্র এতটাকাল একা হয়েই রইলো।
-তাই নাকি! দেখি অবসান করতে পারি কিনা সমুদ্রের একা থাকার। হয়তোবা দেখবেন একদিন সন্ধ্যার সন্ধ্যে তারায় আনবে খবর, পাওয়া গেছে সমুদ্রে বিসর্জন হতে চাওয়া কোন এক রাজকন্যেকে।
- রাজকন্যে.......হা ...হা....হা.......হাসালেন আমায়। না জানি বিসর্জন হতে গিয়ে রাজকন্যে আবার আমায় না বিসর্জন করে দেয়।
-এত ভয়!
-হ্যা, সবচে বেশি নিজেকে নিয়ে। যদি তাকে ধরে রাখতে না পারি?
-পাবার আগেই হারাবার ভয় করতে নেই তাতে বিশ্বাসটা কমে যায়।
-কি জানি, হবে হয়তো ! তবে আপনি অভয় দিলে একবার বিসর্জন হয়ে দেখতে পারি।
-সে দেখা যাবে। সমুদ্র , সন্ধ্যে হয়ে আসছে। মা ডাকছে। একটিবার ভেতরবাড়ি যেতে হবে। আজ তবে রাখি ; ভালো থাকবেন।
-হুম! আপনিও ভালো থাকবেন। সন্ধ্যে তারার মতো।
----------------------------০------------------------------
****************সমাপ্ত*****************

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

